তারপর আরও কতকগুলো অদ্ভুত ব্যাপার খুব অল্পসময়ের মধ্যেই ঘটল।
হঠাৎ আমার ঘরের দৃশ্যটা আমার চোখের সামনে থেকে মিলিয়ে গেল…দেখলাম, এক বিস্তীর্ণ স্থান, কত বাড়ি, শ্বেতপাথরে বাঁধানো কত চত্বর, কত গম্বুজ, দেউল…অনেক মুণ্ডিতমস্তক বৌদ্ধ ভিক্ষুর মতো পরিচ্ছদ-পরা লোকেরা এদিক-ওদিক যাতায়াত করছেন, অসংখ্য ছাত্র ঘরে ঘরে পাঠনিরত…একস্থানে অশোক-বৃক্ষের ছায়ায় শ্বেতপাথরের বেদীতে একদল তরুণ যুবক পরিবৃত হয়ে বসে আমার পরিচিত সেই বৌদ্ধ ভিক্ষু! দেখে মনে হল, তিনি অধ্যাপনায় নিরত এবং যুবক-মণ্ডলী তাঁর ছাত্র। অশোককুঞ্জের ঘন-পল্লবের প্রান্তস্থিত রক্ত পুষ্পগুচ্ছের পাপড়ি গুরু ও শিষ্যবর্গের মাথার ওপর বর্ষিত হতে লাগল।
দেখতে দেখতে সে দৃশ্য মিলিয়ে গেল…আমার তন্দ্রালস কানের মধ্যে নানা বাজনার একটা সম্মিলিত সুর বেজে উঠল…এক বিরাট উৎসবসভা! উৎসব-বেশে সজ্জিত নরনারীতে সভা ভরে ফেলেছে…সব যেন অজন্তার গুহার চিত্রিত নরনারীরা জীবন্ত হয়ে উঠে বেড়াচ্ছে। কোন প্রাচীন যুগের হাবভাব, পোশাক-পরিচ্ছদ…সভার চারিধারে বর্শাহাতে দীর্ঘদেহ সৈনিকরা দাঁড়িয়ে, তেজস্বী যুদ্ধের ঘোড়াগুলো মূল্যবান সাজ পরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পা ঠুকছে…সভার মাঝখানে রক্তাম্বর-পরণে চম্পক-গৌরী কে এক মেয়ে…মেয়েটিরে সামনে দাঁড়িয়ে উজ্জ্বল ইস্পাতের বর্ম আঁটা এক যুবক…তার কোমরে ঝকঝকে ইস্পাতের খাপে বাঁকা তলোয়ার দুলছে…গলায় ফুলের মালা…মুখে বালকের মতো সরল সুকুমার হাসির রেখা। মেয়েটির নিটোল সুন্দর হাতটি ধরে যুবকের দৃঢ় পেশিবহুল হস্তে যিনি স্থাপন করলেন—ভালো করে চেয়ে দেখলাম, তিনি আমার রাতের বিশ্রামের ব্যাঘাতকারী সেই বৌদ্ধ-ভিক্ষু।
বায়স্কোপের ছবির মতো বিবাহ-সভা মিলিয়ে গেল। হঠাৎ আমার হাত-পা যেন খুব ঠান্ডা হয়ে উঠল। শীতে দাঁতে দাঁত লাগতে লাগল…পায়ের আঙুল যেন আড়ষ্ট হয়ে উঠল। চোখের সামনে এক বিস্তীর্ণ সাদা বরফের রাজ্য…ওপর থেকে বরফ পড়ছে…তুষার-বাষ্পে চারিধার অস্পষ্ট…সামনে পেছনে সুউচ্চ পর্বতের চূড়া…সামনে এক সংকীর্ণ পথ এঁকেবেঁকে উচ্চ হতে উচ্চতর পার্বত্য প্রদেশে উঠে গিয়েছে। এক দীর্ঘদেহ ভিক্ষু সেই ভীষণ দুর্গমপথ বেয়ে ভীষণতর হিম-বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে মাতালের মতো টলতে টলতে পথ চলেছেন…তাঁর মাথা যেন ক্রমে নুয়ে বুকের ওপর এসে পড়ছে…কিন্তু তবু তিনি না-থেমে ক্রমাগত পথ চলেছেন…বহুদূরের এক উত্তুঙ্গ তুষারমণ্ডিত পর্বতচূড়া কীসের আলোয় রক্তাভ হয়ে দৈত্যের হাতের মশালের মতো সে বিশাল তুহিন-রাজ্যের দূর প্রান্ত আলোকিত করে ধক ধক করে জ্বলছে।…
তুষার-বাষ্প ঘন হতে ঘনতর হয়ে সমস্ত দৃশ্যটা ঢেকে ফেলল। তারপরই চোখের সামনে—এ যে আমারই চিরপরিচিত বাংলা দেশের পাড়াগাঁ…খড়ের ঘরের পেছনে ছায়াগহন বাঁশবনে বিকাল নেমে আসছে। বৈঁচি-ঝোপে শালিক দল কিচ কিচ করছে। কাঁঠালতলায় কোন গৃহস্থের গোরু বাঁধা। মাটির ঘরের দাওয়ায় বসে এক তরুণ যুবক! তার সামনে আমার খুঁড়ে-বার করা সেই দেবীমূর্তি।…দেখে মনে হল, যুবকের অনেক দিনের স্বপ্ন ওই পাথরের মূর্তিতে সফল হয়েছে…বর্ষা-সন্ধ্যার মেঘ-মেদুর আকাশের নীচে ঘনশ্যাম কেতকী-পল্লবের মতো কালো ভাবগম্ভীর চোখদুটি মেলে সে পাথরের মূর্তির মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।…
হঠাৎ সে দৃশ্যও মিলিয়ে গেল। দেখি আমি আমার ঘরে খাটেই শুয়ে আছি, পাশে সেই বৌদ্ধ-ভিক্ষু। এবার তিনি কথা বললেন। তাঁর কথাগুলি আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে। তিনি বললেন—তুমি যে মূর্তিটি মাটি খুঁড়ে বার করেছ, তারই টানে অনেকদিন পরে আজ আবার পৃথিবীতে ফিরে এলাম। নয়শো বৎসর আগে আমি তোমার মতোই পৃথিবীর মানুষ ছিলাম। যে স্থান তোমরা খুঁড়েছ, ওই আমার বাস্তুভিটা ছিল। তুমি জ্ঞানচর্চায় সমস্ত জীবনযাপন করেছ, এই জন্যেই তোমার কাছে আসা আমার সম্ভব হয়েছে; এবং এই জন্যেই আমি অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে আমার জীবনের কতকগুলি প্রধান প্রধান ঘটনা তোমাকে দেখালাম। আমি দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান, –নয়পালদেবের সময়ে আমি নালন্দা মহাবিহারের সংঘস্থবির ছিলাম। ভগবান তথাগতের অমৃতময়ী বাণীতে আমার মন মুগ্ধ হয়েছিল; সে জন্য দেশের হিন্দুসমাজে আমার জনপ্রিয়তা নষ্ট হয়। দেশের টোলের অধ্যাপনা ছেড়ে আমি নালন্দা যাই। বুদ্ধের নির্মল ধর্ম যখন তিব্বতে অনাচারগ্রস্ত হয়ে উঠেছিল, তখন ভগবান শাক্যশ্রীর পরে আমি তিব্বত যাই সে-ধর্ম পুনরুদ্ধারের জন্যে। আমার সময়কার এক গৌরবময় দিনের কথা আজও আমার স্মরণ হয়। আজ অনেকদিন পরে পৃথিবীতে—বাংলায় ফিরে এসে সে-কথা বেশি করে মনে পড়েছে।…চেদীরাজ কর্ণ দিগবিজয়ে বার হয়ে দেশ জয় করতে করতে গৌড় মগধ-বঙ্গের রাজা নয়পালদেবের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে গিয়ে যে-দিন সন্ধি করলেন; আমি তখন নালন্দার অধ্যাপক। মনে আছে, উৎসাহে সে-দিন সারারাত্রি আমার নিদ্রা হয়নি। এই সন্ধির কিছুদিন পরেই কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীর সঙ্গে নয়পালদেবের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের যে-বিবাহ হয়, আমিই সে বিবাহের পুরোহিত ছিলাম।…অল্পবয়সে আমি একজন গ্রাম্য শিল্পীর কাছে পাথরের মূর্তি গড়তে শিখি এবং অবসর মতো আমি তার চর্চা রাখতাম। তারপর আমি যখন পিতামহের টোলে সারস্বত ব্যাকরণের ছাত্র,তখন সমস্ত শক্তি ও কল্পনা ব্যয় করে জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর এক মূর্তি গড়ি। মূর্তিটি আমার বড়ো প্রিয় ছিল। ওই মূর্তিটির টানেই অনেকদিন পরে আবার পৃথিবীতে ফিরে এলাম। দেশের লোকে আমায় নাস্তিক বলত; কারণ আমি একেই বৌদ্ধ ছিলাম, তার ওপর সাধারণভাবের ধর্মবিশ্বাস আমায় ছিল না। যে অরুণচ্ছটারক্ত হিমবান শৃঙ্গ জনহীন তুষার-রাজ্য আলোকিত করেছে—যা তোমায় দেখিয়েছি, তা সত্যের রূপ! সাধারণ লোকের পক্ষে সে-সত্য দুরধিগম্য। আমার কথা ধরি না, কারণ আমি নগণ্য। কিন্তু যে বিশাল সংঘারাম আমাদের সময়ে সমস্ত ভারতবর্ষে জ্ঞানের আলো জ্বালিয়ে রেখেছিল, তার সমস্ত অধ্যাপকই সে-উচ্চ দার্শনিক সত্যকে চিরদিন লক্ষ রেখে চলেছিলেন। আমিও অনেক বিপদ মাথা পেতে নিয়ে, সাধ্যমতো তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলাম। যেখানে এখন আছি, সেখানে সে-সব যুগপূজ্য জ্ঞান-তপস্বী আমার নিত্য সঙ্গী। তোমরাও অমৃতের পুত্র—সে-লোক তোমাদের জন্যেও নির্দিষ্ট আছে।…অজ্ঞানতার বিরুদ্ধে তোমাদের অভিযান জয়যুক্ত হোক।…
