গোপাল অমনি ধরিত—
নীলবরণী নবীনা রমণী নাগিনী জড়িত জটা সুশোভিনী
নীল নয়নী জিনি ত্রিনয়নী কিবা শোভে নিশানাথ নিভাননী—
তারপর গাহিত—
কী কর কী কর শ্যাম নটবর, ছাড় যাই নিজ কাজে—
গোপাল পাইক যাত্রাদলে অল্পবয়সে গাহিত, সাহেবের সংগীতপ্রিয়তার কথা শুনিয়া কিঞ্চিৎ পুরস্কার আশায় একদিন সে নীলগঞ্জের কুঠিতে গাহিতে আসে— গান শুনিয়া সাহেবের বড়ো ভালো লাগিল এবং সেই হইতে গোপাল সাহেবের এস্টেটের চাকুরিতে বহাল হইয়া গেল।
এক পয়সা খাজনা বাকি থাকিলেও যেমন সাহেবের এস্টেট হইতে নালিশ হইত, আবার ধরিয়া পড়িলে ক্ষমা করিতেও ফালমন সাহেব ছিলেন বিশেষ পটু। কতবার এরকম হইয়াছে। দুর্বুদ্ধি প্রজা ভবিষ্যৎ না-ভাবিয়া কিংবা উকিল মোক্তারদের উৎসাহে নীলগঞ্জ এস্টেটের বিরুদ্ধে মামলা লড়িয়াছে। একবার ফৌজদারি, তারপর স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী দেওয়ানি, মহকুমা হইতে সাব-জজ কোর্ট, সেখান হইতে আবার পুনর্বিচারের জন্য মহকুমায় মুনসেফ কোর্ট—এই করিতে করিতে প্রজা এস্টেটকে হয়রান করিয়া এবং নিজেও সর্বস্বান্ত হইয়া যখন জ্ঞানচক্ষু লাভ করিল, তখন হিতৈষী বন্ধুদের পরামর্শে কোর্টের বটতলাতেই একেবারে ফালমন সাহেবের পা জড়াইয়া উপুড় হইয়া পড়িল পায়ে।
—আরে কী কী, কে?
—আজ্ঞে আমি মুকুন্দ বিশ্বেস।
সাহেব পায়ের ঝটকা মারিয়া বলিলেন—বেরো হারামজাদা—বেরো—বেরো–
ফালমন হিন্দি কথাই জানিতেন না, খাঁটি বাংলা ইডিয়মযুক্ত ভাষা ব্যবহার করিতেন এবং সে শুধু এইজন্য যে নীলগঞ্জের কুঠিই তাঁহার জন্মস্থান, এই গ্রাম্য আম-জাম-নিকুঞ্জ ছায়ার শ্যামলতায় ও কৃষকদের সাহচর্যে তিনি আবাল্য লালিতপালিত ও বর্ধিত। ডরসেট শায়ারের ইংরাজরক্ত ধমনিতে থাকিলেও মনেপ্রাণে খাঁটি বাঙালি, ঊনবিংশ শতাব্দীর নিশ্চিন্ত শান্তি ও আলস্যের মধ্যে যাহার যৌবন কাটিয়াছে, সেই স্বচ্ছল বাঙালি জমিদার। মুকুন্দ বিশ্বাস ডুকরাইয়া কাঁদিয়া উঠিল। ব্যাপার দেখিতে লোক ছুটিয়া ভিড় বাধাইল। সকলেই ভাবিল সাহেব কি অত্যাচারী! গরিব প্রজাকে কি করিয়া পীড়ন করিতেছে দ্যাখো। একেবারে এইভাবেই সর্বস্বান্ত হয়? ছিঃ—
কেহ বুঝিল না কীরূপ ত্যাঁদড় ও উঁদে প্রজা মুকুন্দ কলু।
—কী চাই? কী?
—সায়েব মা-বাপ—ধরম বাপ—মোরে বাঁচাও ধরম বাপ—
—কেমন? মোকদ্দমা করবিনে? কর ছানি—শোনছেন ও হরিশবাবু, শোনেন ই দিকি।
চোগা-চাপকান পরনে বড়ো উকিল হরিশ্চন্দ্র গাঙ্গুলী ঘটনাস্থলের কিছু দূর দিয়া যাইতেছিলেন। সাহেবের আহ্বানে নিকটে আসিতে আসিতে বলিলেন—গুড মর্নিং মি. ফারমুর, বলি ব্যাপার কী?
—আরে দেখেন না কাণ্ডখানা। চেনেন না মুকুন্দ বিশ্বাসকে? পাঁচপোতার মুকুন্দ বিশ্বাস। বদমায়েশের নাজির, ওর বদমায়েশি দেখতে দেখতে মাথার চুল আমি পাকিয়ে ফ্যালোম হরিশবাবু, ওরে আর আমি চিনিনে? শুনুন তবে—আরে নায়েব। মশায়, বলুন দিকি সব খুলে–
সব শুনিয়া হরিশবাবু মুকুন্দ কলুকে ধমক দিয়া কিঞ্চিৎ সদুপদেশ দিলেন। সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা! তাহার মতো ট্যানাপরা লোকের পক্ষে? যাক, যাহা হইবার হইয়াছে, সাহেব নিজগুণে এবারটি গরিবকে মাপ করিয়া দিন।
সাহেবকে হরিশবাবু জিজ্ঞাসা করিলেন—আজ বুঝি ডিক্রির দিন?
—নিশ্চয়। ও এতদিন আমার সঙ্গে একটা কথা কইত না। আজ একেবারে পায়ে ধরেছে।
ষড়ানন বকসি বলিল—শুধু পায়ে ধরা নয়, একেবারে মড়াকান্না কেঁদে লোক জড়ো করে ফেলেছে–
সাহেব জনতার উদ্দেশ্যে বলিলেন—এই, যাও সব এখান থেকে। এখানে কী? চলে যাও সব—
হরিশবাবু উকিলও সেই সঙ্গে যোগ দিয়া কহিলেন—হ্যাঁ, তোমরা কেন এখানে বাপু? কাছারির সামনে ভিড় কোরো না—হাকিম চটবেন—যাও এখন—এখানে কি ঠাকুর উঠেছে?
হিসাব করিয়া ষড়ানন বকসি সাহেবকে জানাইল, এই মামলায় এ পর্যন্ত সাতশো সাড়ে-সাতশো টাকা খরচ হইয়া গিয়াছে।
সাহেব বলিলেন—আচ্ছা যা, মাপ করলাম। নায়েববাবু, মামলা মিটিয়ে নেবেন। ষড়ানন বকসি বলিল—খরচার টাকা?
–ওর সঙ্গে না-হয় ষড় করি নেবেন। তবে বলে দিন, আবার কুঠিতে গিয়ে নাকে খত দিতি হবে ওকে—নইলে আমি ওকে ছাড়ব না। ও নাকে খত দিতে রাজি কিনা?
মুকুন্দ বিশ্বাস খুব রাজি। সে এখনই নাকে খত দিতে প্রস্তুত আছে। সাহেবের আশ্বাস পাইয়া সে চলিয়া গেল।
সেবার শীতকালের মাঝামাঝি মিসেস ফালমন লিভারের অসুখে ভুগিয়া কলিকাতার হাসপাতালে মারা গেলেন। দিনসাতেক পরে নীলগঞ্জের চারিপাশের পাঁচ-ছয়খানি গ্রামের সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ গৃহস্থদিগের কাছে তাহাদের মত জিজ্ঞাসা করা হইল—মেমসাহেবের আত্মারমঙ্গলকামনায় যদি ব্রাহ্মণভোজনের ব্যবস্থা হয়, তাঁহারা খাইবেন কিনা। তখনকার দিনে এসব ধরনের খাওয়ায় সামাজিক কড়াকড়ি অনেক বেশি ছিল, কিন্তু ব্রাহ্মণদের রাজি না-হইয়া এক্ষেত্রে উপায় ছিল না। সাহেবকে চটাইতে কেহই রাজি নয়।
নীলগঞ্জের কাছারিঘরের সামনে তুততলায় দু-দিন ধরিয়া কালী ময়রা সন্দেশ, বোঁদে, পানতুয়া ভিয়ান করিল। কাছারিবাড়ির হলে ব্রাহ্মণভোজনের যে বিরাট ব্যবস্থা হইয়াছিল, ও অঞ্চলে সেরকম খাওয়ানো কখনো কেহ দেখে নাই।
ফালমন সাহেব কুঠির গেটে নিজে দাঁড়াইয়া প্রত্যেককে বলিতেছিলেন—পেট আপনাদের ভরেছে? কষ্ট দেলাম আপনাদের এনে, কিছু মনে করবেন না–
আমিও সে দলে ছিলাম, তখন স্কুলের বালক, ভূরিভোজন করিয়া বাহির হইয়া আসিতেছিলাম। দীর্ঘাকৃতি ফালমন সাহেবের সে বিনীত মুখভাব, সৌজন্যপূর্ণ সহৃদয় দৃষ্টি এখনো মনে আছে। মানবতার উদার গতিপথের পার্শ্বে অবস্থিত এই ছবিখানি আজিকার এই হিংসা দ্বেষ ও সাম্প্রতিক ধর্মমতের দ্বন্দ্বের দিনে বেশি করিয়া স্মরণে উদিত হয়।
