আসিয়া বলিল—সেলাম সাহেব—
সাহেবের দোর্দণ্ডপ্রতাপ এ অঞ্চলে, কারণ অধিকাংশই তাহার প্রজা।
—যাচ্ছ কনে?
—যাব একবার পানচিতে। মেয়ের খবর পাইনি অনেক দিন। জামাইডা কেমন আছে দেখে আসি, পেট-জোড়া পিলে তার। গত অঘ্রান মাসে যায়-যায় হইছিল—
—ম্যালেরিয়া?
—তা আমরা কী বুঝি? তাই হবে।
—বেশ। একটা কৃষ্ট বিষয় গান করে শুনিয়ে যাও দিকি?
—কৃষ্ট বিষয়?
—কিংবা শ্যামা বিষয়। না, তুমি বোষ্টম, টুম আবার বুঝি শ্যামা বিষয় গাইবা। ঝা মন চায় একখানা শোনাও। বড্ড রোদ পড়ছে, শরীলির কষ্ট হয়েছে বড্ড। বোসো, এই পিটুলিতলার ছাওয়াপানে।
গোপেশ্বর গান গাহিতে বসিয়া দু-বার কাশিল, সাহেবের দিকে লাজুক দৃষ্টিতে দু-একবার চাহিয়া পরে গান আরম্ভ করিল—
কোনটি তোমার আসল রূপ শুধাই তোমারে
ফালমন সাহেব হাতে তালি দিতে দিতে বলিলেন—বাঃ বাঃ—বেশ গলা— দাশুরায় না-নীলকণ্ঠ?
—নীলকণ্ঠ।
–দাশুরায় একখানা হোক না?
সাহেবের আদেশ অমান্য করিবার ক্ষমতা কাহারও নাই এ অঞ্চলে, সুতরাং গোপেশ্বরকে আর একখানা গান গাহিতেই হইল।
ভয়ে আকূল বসুদেব
দেখে অকূল যমুনা।
কূলে বসে দু-নয়নে বারি ঝরে
কোলে অকূলের কাণ্ডারী তাও জানে না।
একবার ভাবি যদি বর্তমান কংসের পদে
দৈবে দয়া যদি হত পাষাণ হৃদে—
তা হয় না আর
গেল একূল ওকূল দুকূল
অকূল পারে গোকূল
কুলের তিলক রাখতে কূল পেলেম না।
ভয়ে আকূল বসুদেব
দেখে অকূল যমুনা—
ফালমন সাহেব চক্ষু মুদিয়া পাইপ টানিতে টানিতে গান শুনিতেছিলেন। আবার গোপেশ্বরের পিঠ চাপড়াইয়া বলিলেন—বাঃ বাঃ—দাশুরায়ের গানের কাছে আর সবকিছু লাগে না। কী রগম—কী ওরে বলে গোপেশ্বর?
—অনুপ্রাস?
—ওই যা বললে। ভারি চমৎকার, লাগতিই হবে যে। দাশুরায় হুঁঃ—
—আজ উঠি সাহেব।
—আচ্ছা এসো—
ফালমন সাহেবের কাছারিঘরে—রাম শ্যামকে মারিয়াছে, শ্যামের গোরু যদুর পটলের খেত নষ্ট করিয়াছে—এইসব গ্রাম্য মামলার বিচার হইত। বিচার সাধারণত করিত নায়েব ষড়ানন বকসি, গুরুতর মোকর্দমায় ফালমন সাহেব নিজে বিচারাসনে বসিতেন।
আমি দেখিয়াছিলাম যেদিন গুড়ে জেলের ভাই-বউ রেমো ধোপার ছেলে অতুলের সঙ্গে সোজা চম্পট দেওয়ার পরে আড়ংঘাটা স্টেশনে ধরা পড়িয়া পুনরায় গ্রামে আনীত হইল, সেদিন ফালমন সাহেবের বিচার। গ্রামে হইচই কাণ্ড পড়িয়া গিয়াছিল। কারণ দু-দশ বছরে এই ধরনের ব্যাপার কেহ এ অঞ্চলে দেখে নাই, শোনেও নাই।
ফালমন সাহেব অতুলকে কড়াসুরে প্রশ্ন করিলেন—জেলেবউয়ের বয়সটা কত? অতুল কাঁপিতে কাঁপিতে বলিল—তা জানিনে সাহেব।
-তোমার চেয়ে বড়ো না-ত ছোটো?
—আমার চেয়ে বড়ো।
—তোমার বয়েস কত?
—আজ্ঞে, এই তেইশ। রেমো ধোপার দিকে চাহিয়া সাহেব বলিলেন—এই রেমো, বয়েস ঠিক বলচে তো?
রেমো বলিল—হাঁ, সাহেব।
—আর জেলে-বউ-এর বয়স কত?
গুড়ে জেলে বলিল—আজ্ঞে, বত্রিশ।
–বত্রিশ?
—আজ্ঞে।
সাহেব রাগে কাঁপিতে কাঁপিতে অতুলের দিকে চাহিয়া বলিলেন—তোর বড়ো দিদির বয়েসি যে-রে হারামজাদা—তোর লঘু-গুরু জ্ঞান নেই? মারো দশ জুতো সকলের সামনে—আর পঞ্চাশ টাকা জরিমানা, যাও—
ব্যস বিচার শেষ।
আর কোনো সাক্ষ্যপ্রমাণ বা ওকালতি খাটিবে না।
The great Khan has spoken—মিটিয়া গেল।
সেকালের নীলকুঠির অটোক্র্যাট ভূম্যধিকারীর রক্ত ছিল ফালমন সাহেবের গায়ে, প্রজা পীড়ন ও শোষণে তিনি তেমনি পটু, তবে যুগপ্রভাবে নখ-দন্ত অপেক্ষাকৃত ভোঁতা—এইমাত্র।
সেবার মস্ত বড়ো দাঙ্গা বাধিল বাগদি ও জেলে প্রজাদের মালার বিলের দখল লইয়া। মালার বিল বরাবর বাগদি প্রজাদের কাজে বন্দোবস্ত করা ছিল রানি রাসমণি এস্টেটের স্বরূপনগর কাছারি থেকে। কখনো এক পয়সা খাজনা আদায় হইত না। মামলা-মোকর্দমা করিয়াও কিছু হয় না—তখন রানি-এস্টেটের নায়েব ভৈরব চক্রবর্তী মালার বিল দশ বৎসরের জন্য ইজারা দিলেন ফালমন সাহেবকে। সেলামি এক পয়সাও নয়, কেবল শালিয়ানা আড়াইশো টাকা খাজনা। কারণ দুর্ধর্ষ জেলে ও বাগদি প্রজাদের কাছ থেকে বিলের দখল পাওয়াই ছিল সমস্যা— সাহেবের দ্বারা সে-সমস্যা পূরণ হইবে, ভৈরব চক্রবর্তীর এ আশা ছিল এবং সে আশা যে নিতান্ত ভিত্তিহীন নয়—বিল ইজারা দেওয়ার এক পক্ষকালের মধ্যেই পদ্মফোটা মালা বিলের রক্ত-রঞ্জিত জল তাহার প্রমাণ দিল। প্রকাশ ফালমন সায়েব স্বয়ং টোকা মাথায় দিয়া ঘোড়ায় চড়িয়া দাঙ্গা পরিচালনা করিয়াছিলেন। যদিও পুলিশ রিপোর্টে পরে প্রকাশ হইল, দাঙ্গার সময় ফালমন সাহেব তাঁর বড়ো মেয়ে মার্জোরির টনসিল অস্ত্র করিবার জন্যে তাহাকে লইয়া কৃষ্ণনগর মিশন হাসপাতালে যান।
মামলাবাজ ও-ধরনের আর একটি লোক সারা জেলা খুঁজিলে পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ।
প্রায়ই মহকুমায় মামলা পড়িত।
সাহেবের চারদাঁড়ের ডিঙি সাতটার সময় ছাড়িত কুঠিঘাট থেকে। ছইয়ের মধ্যে ফালমন সাহেব ও তাঁর খাওয়ার জন্য ফলের ঝুড়ি, জলের কুঁজো, দুধের বোতল, নায়েব ষড়ানন বাবু ও তাঁর বিছানাপত্র, দুজন মাঝি (তার মধ্যে একজনের নাম গোপাল পাইক, জাতে বাগদি, খুব ভালো গান গাহিতে পারে)—এই লইয়া তিরবেগে নৌকো ছুটিত দশ মাইল দূরবর্তী মহকুমার শহরের দিকে। হু-হু করিয়া মুখোড় বাতাস বহিত। গাঙে সাহেবের প্রিয় অনুচর গোপাল পাইক প্রভুর ইঙ্গিতে নৌকোর গলুইয়ের কাছ থেকে ছইয়ের কাছে সরিয়া আসিত। সাহেব বলিতেন— একটা কৃষ্ণ-বিষয় কিংবা শ্যামা-বিষয় গাও গোপাল—
