বারোয়ারি যাত্রার আসরে ফালমন সাহেব সকলের সামনের চেয়ার পাতিয়া বসিতেন। যাত্রাগানের অমন ভক্ত দুটি দেখা যাইত না।
—ও বেয়ালাদার, একটা একালে গৎ ধরো বাবা–জুড়িদের এগিয়ে দাও—
সাহেবের ফাইফরমাশ খাটিতে খাটিতে যাত্রাদলের গাইয়ে-বাজিয়ে ব্যতিব্যস্ত।
আর কৃষ্ণ সাজিয়া আসিয়া গান ধরিলেই হইল, অমনি মেডেল ঘোষণা।
সাহেব দাঁড়াইয়া উঠিয়া বলিবেনই—এই যে ছোঁড়াডা কৃষ্ট সেজে এসে গানখানা করে গেল, ওরে আমি একটা রূপোর মেডেল দেব। কথা শেষ করিয়াই চারিদিকে ঘুরিয়া ঘুরিয়া হাসিমুখে চাহিয়া বলিতেন—হাততালি–হাততালি—
অমনি চটপট করিয়া চতুর্দিকে হাততালি পড়িবে। নিজে সকলের আগে হাততালি দিবেন।
কোনো করুণ ভক্তিরসের ব্যাপার ঘটিলে সাহেব সকলের সঙ্গে ‘হরিবোল’ দিয়া উঠিবেন।
বারোয়ারিতে চাঁদা দিতে সাহেব যেমন মুক্তহস্ত, তেমনি রক্ষাকালীপূজা বা শীতলাপূজার অনুষ্ঠানে। তখনকার দিনে বারোয়ারি দুর্গাপূজা বা শ্যামাপূজার রেওয়াজ ছিল না।
মিসেস ফালমন মারা যাওয়ার পর নীলগঞ্জের কুঠির রাঙা ‘প্যাটেন’ ফুলের গাছ, নদীর ধারের অত বড়ো বাড়ি, লেবু ও আমের বাগান, পসার-প্রতিপত্তি, অর্থসম্পত্তি সব কিছু শ্রীহীন হইয়া পড়িল। বাড়ির এক নিম্নজাতীয়া দাসীর সঙ্গে সাহেবের নাম জড়িত হইয়া চারিদিকে প্রচার হইতে লাগিল। মার্জোরি ও ডোরা বিবাহ করিয়া বাহিরে চলিয়া গেল। সাহেবের যে ছেলে বিলাতে পড়িত, সে আর এদেশে আসিলই না। শোনা গেল, ইংলন্ডেই বিবাহ করিয়া সেখানেই সংসার পাতাইয়া সে ইংলন্ডের প্রজাবৃদ্ধির দিকে মন দিয়াছে।
এই সময় নীলগঞ্জের কুঠিতে এক ঘটনা ঘটিল।
বাহির হইতে কে একজন সাহেব আসিয়া কিছুদিন কুঠিতে রহিল। এ সময়ে প্যাটও কুঠি হইতে চলিয়া গিয়াছিল। নবাগত সাহেবের নাম মি. মুডি। এ অঞ্চলে তাহাকে ‘মুদি সাহেব’ বলিত সবাই। মুদি সাহেব একটু অতিরিক্তমাত্রায় মদ খাইত।
একদিন কী ঘটিয়াছিল কেহ জানে না, গভীর রাত্রে মি. ফালমনের সঙ্গে মুদি সাহেবের বচসার শব্দ শোনা গেল। বাহির হইতে চাকরেবাকরে কিছু বুঝিল না, হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজ হইল, সকলে ছুটিয়া গিয়া দেখে মুদি সাহেবের রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহ ঘরের মেঝেতে লুটাইতেছে এবং ঘরের কোণে সেই নীচজাতীয়া দাসীটা দাঁড়াইয়া থরথর করিয়া কাঁপিতেছে।
পুলিশ তদন্ত হইল। কিন্তু মি. ফালমনের কিছু হয় নাই, ব্যাপার নীলকুঠির শক্ত কম্পাউন্ডের বাহিরে এক পাও গড়ায় নাই।
এই ঘটনার পরেও ফালমন সাহেব অনেকদিন বাঁচিয়া ছিলেন। একাই থাকিতেন। পুত্র-কন্যা কখনো আসিত না। সাহেবের এক ভাই শোনা যায় ইংলন্ড হইতে কতবার তাঁহাকে সেখানে যাইতে লিখিয়াছিল, ফালমন সাহেব বলিতেন— এদেশেই জন্ম, এদেশ ভালোবাসি, যাব কোথায়? যখন মরে যাব ওই নিমতলাডায় কবর দিও, বাবা আর মায়ের পাশে। এদেশেই জন্ম, এদেশেই মাটি মুড়ি দেবে।
ফালমন সাহেব এদেশেই মাটি মুড়ি দিয়াছিলেন। তাঁহার মৃত্যু হইয়াছিল আজ হইতে পঁচিশ বৎসর পূর্বে। নীলগঞ্জের কুঠি ভাঙিয়াচুরিয়া জঙ্গল হইয়া গিয়াছে। এখন সেখানে দিনমানেও বাঘ বুনো-শুয়োরের ভয়ে কেউ যায় না। কুঠির নিমতলায় ঘন কুঁচকাঁটায় দুর্ভেদ্য ঝোপের ছায়ায় খুঁজিলে ফালমন সাহেবের কবরের ভগ্নাবশেষ এখন কৌতূহলী রাখাল বালকদের চোখে পড়ে। আলমপুর পরগনার বড়ো তরফের দে চৌধুরী জমিদারবাবুরা নীলগঞ্জের জমিদারি গবর্নমেন্টের নীলামে ক্রয় করিয়াছিলেন।
পুঁই মাচা
সহায়হরি চাটুজ্যে উঠানে পা দিয়াই স্ত্রীকে বলিলেন—একটা বড় বাটি কি ঘটি যা হয় কিছু দাও ততা, তারক খুড়ো গাছ কেটেছে, একটু ভাল রস আনি।
স্ত্রী অন্নপূর্ণা খড়ের রান্নাঘরের দাওয়ায় বসিয়া শীতকালের সকালবেলা নারিকেল তেলের বোতলে ঝাঁটার কাটি পুরিয়া দুই আঙুলের সাহায্যে ঝাঁটার কাটিলগ্ন জমানো তেলটুকু সংগ্রহ করিয়া চুলে মাখাইতে ছিলেন স্বামীকে দেখিয়া তাড়াতাড়ি গায়ের কাপড় একটু টানিয়া দিলেন মাত্র, কিন্তু বাটি কি ঘটি বাহির করিয়া দিবার জন্য বিন্দুমাত্র আগ্রহ তো দেখাইলেন না, এমন কি বিশেষ কোনো কথাও বলিলেন না।
সহায়হরি অগ্রবর্তী হইয়া বলিলেন—কি হয়েছে, বসে রইলে যে? দাও না একটা ঘটি? আঃ, ক্ষেন্তি-টেন্তি সব কোথায় গেল এরা? তুমি তেল মেখে বুঝি ছোঁবে না?
অন্নপূর্ণা তেলের বোতলটি সরাইয়া স্বামীর দিকে খানিকক্ষণ চাহিয়া রহিলেন, পরে অত্যন্ত শান্ত সুরে জিজ্ঞাসা করিলেন—তুমি মনে মনে কি ঠাউরেছ বলতে পার?
স্ত্রীর অতিরিক্ত রকমের শান্ত সুরে সহায়হরির মনে ভীতির সঞ্চার হইল—ইহা যে ঝড়ের অব্যবহিত পূর্বের আকাশের স্থিরভাব মাত্র, তাহা বুঝিয়া তিনি মরীয়া হইয়া ঝড়ের প্রতীক্ষায় রহিলেন। একটু আমতা আমতা করিয়া কহিলেন—কেন…কি আবার…কি…
অন্নপূর্ণা পূর্বাপেক্ষাও শান্ত সুরে বলিলেন-দেখ, রঙ্গ কোরো না বলছি ন্যাকামি করতে হয় অন্য সময় কোরো। তুমি কিছু জান না, কি খোঁজ রাখ না? অত বড় মেয়ে যার ঘরে, সে মাছ ধরে আর রস খেয়ে দিন কাটায় কি করে তা বলতে পার? গাঁয়ে কি গুজব রটেছে জান?
সহায়হরি আশ্চর্য হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—কেন? কি গুজব?
—কি গুজব জিজ্ঞাসা করো গিয়ে চৌধুরীদের বাড়ি। কেবল বাগদী দুলে পাড়ায় ঘুরে ঘুরে জন্ম কাটালে ভদ্দরলোকের গাঁয়ে বাস করা যায় না। সমাজে থাকতে হলে সেই রকম মেনে চলতে হয়।
