—হাঁফ লেগে মরে যাব যে এখানে থাকলে—
—আবার ওইসব নাস্তিকের মতো কথাবার্তা—ঠাকমা তুমি কী!
শীত কেটে গ্রীষ্ম এল, চলেও গেল। আবার আষাঢ় মাসের প্রথম। দেশের খবর নেই অনেকদিন। ন-ঠাকরুনের চিঠি আগে আগে আসত—গত তিন-চার মাস তাও বন্ধ। কথায় কথায় একদিন নীরজাকে কথাটা বলেই ফেললেন।
—দেশে কে আছে আপনার? শুনেছি সেখানে থাকে না কেউ?
—বাড়িটা, গাছটা পালাটা—
—দিদি, এখনও ওইসবের মায়া? বিশ্বনাথের পাদপদ্মে মন সমর্পণ করুন, সব বন্ধন ঘুচে যাবে। কেউ কিছু নয়, কিছু নয়—একমাত্র তিনিই সত্যি। বলে নীরজা চোখ কপালে তুলে ওপরের দিকে চেয়ে রইলেন।
দ্রব ঠাকরুন তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন—ওই যাঃ, দাঁড়াও, কড়ার দুধটুকু বুঝি বেড়ালে খেয়ে গেল! নাঃ বেড়ালের জ্বালায়—যত-বা বেড়াল, তত-বা বাঁদর! অমন গামছাখানা সেদিন—
—দিদি, আজ আমার সঙ্গে চলুন, কেদারঘাটে কাশীখণ্ডের ব্যাখ্যা করবেন উপীন কথক। শোনবার জিনিস। কাশীতে এসে কাশীখণ্ড শুনতে হয়—
—আমার শরীর ভালো না, আজ থাক, তুমি যাও—
নীরজা নাছোড়বান্দা, অবশেষে নিয়ে গেলেন দ্রব ঠাকরুণকে। কেদারঘাটে এর আগেও দু-তিন বার দ্রব গিয়েচেন সত্যর মা-র সঙ্গেই। ওপরের রানার চওড়া চাতালের একপাশে ফর্সা রোগামতো কথক ঠাকুর কথকতা শুরু করেছেন—তাঁকে ঘিরে বাঙালি মেয়ে-পুরুষের ভিড়। পুরুষের চেয়ে মেয়ে অনেক বেশি। সত্যর মা জিজ্ঞেস করলেন—দিদি, প্রণামী কিছু এনেছেন তো?
—তা তো বললে না—আনিনি—
—আট আনার কম দেওয়া যায় না। আচ্ছা, আপনারটা আমি দিয়ে দেব এখন
—আমার আট আনা না-দিয়ে চার আনা বরং দেও। নাতিরা ক-টাকা বা পাঠায়?
—এখানে যা দেবেন দিদি, পরকালের জন্য তোলা রইল—
বর্ষার গঙ্গায় ঢল নেমেছে। কেদারঘাটের সামনের নদীতে কাদের বড়ো একটা বজরা ভেসে চলেচে, দু-তিনখানা পানসিতে সুসজ্জিত নরনারী নদীভ্রমণে বার হয়েচে। রামনগরের দিকে সূর্য অস্ত যাচ্ছে—উঁচু বাড়ির ছাদের কার্নিশে তরল সোনার মতো ঝিলমিল করচে রাঙা রোদ। কথক ঠাকুর সুকণ্ঠে গান ধরেচেন, কাশী সকল তীর্থর সার, মৃত্যুর সময় মনিকর্ণিকার ঘাটে স্বয়ং বিশ্বনাথ কানে মন্ত্র দেন— মানুষের শিবলোকপ্রাপ্তি ঘটে—এই হল গানের অর্থ।
দ্রব ঠাকরুনের মন অজ্ঞানে অনেকদূরে চলে গেল। তাঁর খয়েরখাগী গাছে কত কাঁঠাল হয়েছে এই আষাঢ় মাসে, বড্ড কাঁঠাল ধরে গাছটাতে, শেকড়ে পর্যন্ত কাঁঠাল। তিনটে আমগাছে আমও নিশ্চয়ই খুব ধরেছিল—নাতিরা কি গিয়েচে আম খেতে? তাদের সেদিকে দৃষ্টি নেই! বারোভূতে লুটে খাচ্ছে!
রাত্রি নামল। নীরজা বল্লে—চলুন দিদি—
দ্রব ঠাকরুন লক্ষ করেচেন সমস্ত সময় নীরজা মাগি ফোঁস ফোঁস করে কেঁদেছে। আর কেবল বলেছে—আহা-হা-হা!
যদি এ মাগির সঙ্গ ছাড়তে পারতেন!—কিন্তু তা হবার নয়, কানু শুনবে না।
বাসায় এসে নীরজা দেখলেন তাঁর সঙ্গিনীর মন বড়ো খারাপ—অন্যমনস্ক ভাব, বিশেষ কোনো কথা বলে না।
কাশীখণ্ড শুনে আজ তাহলে খুব ভালো লেগেচে বোধ হয়! পাষাণ বুঝি গলেছে!
নীরজা বললেন—কী ভাবছেন দিদি?
—একটা গাছ কাঁঠাল দেশে। খয়েরখাগীর কাঁঠাল, সে তুমি কখনো খাওনি— খেলে বুঝতে।
—দিদি, এখনও আপনার মায়ার বন্ধন গেল না? আপনার তো দুটো-একটা গাছ, আমার তিনটে বড়ো বাগান–কলমের বোম্বাই, মালদার ফজলি—মায় ল্যাংড়া পর্যন্ত। আমি তো ফিরেও চাইনি ওসব দিকে। ছেলেরা কাঁদে, বলে, এখন কী কাশীবাস করবার সময় হয়েছে তোমার? আমি বলি, না, সংসারের মায়ায় আর। গানে বলে—কেবা কার পর, কে কার আপন? (এই মরেচে, মাগি আবার শুরু করেচে!) কালশয্যা পরে মোহতা ঘোরে, দেখে পরস্পরে অসার আশার স্বপন।
—তা আমি বলি—এতকাল তো সংসারের বন্ধনে ঘুরে আশার স্বপন অনেক দেখলুম। এইবার পরকালের কথা ভাবি। আর আমার এই যে গুরুদেব, উনি দেহধারী মুক্তপুরুষ—ওঁর কৃপায়—(নীরজা উদ্দেশে প্রণাম করলেন।)
দ্রব ঠাকরুন মুখে বললেন—তা তো বটেই—
—চলুন দিদি, কাল বাবা বিশ্বনাথের মন্দিরে সেই মাইজির কাছে আপনাকে নিয়ে যাই—আপনার বয়স আমার চেয়ে বেশি, আপনার এখন উচিত গুরুমন্ত্রে দীক্ষা নিয়ে সব বন্ধন-মুক্ত হয়ে একমনে কাশীবাস করা। আমাদের আর ক-দিন দিদি! শমন তো দোরে দাঁড়িয়ে—সবরকম তো দেখলুম শুনলুম—
দ্রব ঠাকরুন মনে মনে বললেন—তোমার মুণ্ডু করলুম, মাগির কথার আবার ধরন শোনো না, ভাটপাড়ার ভটচাজ্জি এসেছেন! মুখে বল্লেন—মুংলি বলে একটা গাই গোরু ছিল আমার—বড় ন্যাওটা। যেখানে যাব, সেখানে যাবে। আমার হাতে না-খেলে তার পেট ভরত না। এই বেশ কচি কচি বাঁশপাতা এনে মুখে দেতাম তুলি—আর—
—আ:, আবার ওইসব কথা আপনার মুখে! জড়ভরতের কথা জানেন তো? অত বড়ো জ্ঞানী—পূর্বজন্মের এক হরিণের মায়ায় তাঁর সব গেল। ভগবানের চিন্তা করুন—ভগবানের চিন্তা করুন—সব মিথ্যে, সব মিথ্যে।
দ্রব ঠাকরুন কোনো কথা বললেন না। তাঁর ওর কথা একেবারেই ভালো লাগে। মাগি যেন কী! কী বলে, কী করে! মাগি এমন পাষাণ যে, ছোটো ছেলের বিয়েতে বাড়ি গেল না! মুখ দেখতে আছে ওর? ছিঃ
সারারাত্রি স্বপ্নের ঘোরে দেখলেন তাঁর গোপীনাথপুরের ভিটেতে চালাঘরের ছাঁচতলায় ম্লানমুখে ছলছলে চোখে তাঁর মুংলি দাঁড়িয়ে রয়েচেন-বউ তাকে যত্ন করচে না, বুড়ি হয়েচে মুংলি, তেমন দুধ তো আর দিতে পারে না—মুংলিকে তিনি তার মায়ের পেট থেকে টেনে বার করে এতকাল নিজের মেয়ের মতো পুষেছিলেন—তিনি নেই, কে ওকে দেখে! কাঁঠাল হয়েছে বটে খয়েরখাগী গাছটাতে! এত কাঁঠাল তিন-চার বছরের মধ্যে হয়নি। তিনি নাইতে যাচ্ছেন নদীতে, মুখুজ্জে-গিন্নি বলচে-হ্যাঁ খুড়িমা, এবার তোমার গাছে কী কাঁঠাল ধরেছেঃ! তা আমায় একটা দিও, তোমার নাতিদের খেতে দেব—
