—দীক্ষা না-নিলে কাশীবাসে ফল কী মা?
—ফলের জন্যে তো আসিনি, শরীরডা সারাতি এসেছিলাম।
নীরজা রাগের সুরে বললেন—শরীর আগে না-পরকাল আগে?
দ্রব ঠাকরুন চুপ করে রইলেন।
গুরুদেব বললেন—নীরজা-মার কথার উত্তর দাও—চুপ করে থাকলে হবে না।
নীরজা বললেন—গীতার ভক্তিযোগ সেদিন পড়ছিলাম, শুনলে তো দিদি? কর্মের চেয়েও ভক্তি বড়ো, স্বয়ং ভগবান বলছেন—
আ:, কী বিপদ! মাগির সবসময়েই কী আবোল-তাবোল বকুনি?
মুখে বললেন—আমি তো কিছু বুঝিনে, আপনারা যা বলেন। তবে এবার কিছু হবে না। নাতি সাতটাকা পাঠিয়েছিল, তা ঘরভাড়াতেই গিয়েছে। হাতে টাকা না থাকলি—
তবুও দুজনই নাছোড়বান্দা। দীক্ষা নিতেই হবে।
গুরুদেব বললেন—কাশীবাস করেচ মা, তোমার যথেষ্ট বয়েস হয়েছে। গুরুদীক্ষা না-নিলে যে সবই মাটি। আজ আছ, কাল নেই! পৃথিবী কিছুই না— ইহকাল কিছুই না—
নীরজা বললেন—গুরুর মুখেই ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর। ইহকালেও তিনি, পরকালেও তিনি–
দ্রব ঠাকরুন মনে মনে বললেন—আ মরণ মাগির! তবে সোয়ামি কোথায় যাবে মেয়েদের! ঢং দ্যাখো না! যাই হোক, বহু তর্ক করেও ঠাকরুনকে দ্রব করা গেল না। নাম দ্রবময়ী হলে কী হবে, ভেতরে বেজায় শক্ত। নীরজা অবিশ্যি তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধি মতে একজন সত্তর বছরের মৃত্যুপথযাত্রিণীর ভালো করবারই যথেষ্ট চেষ্টা করছিলেন, সে রাজি না-হলে তিনি আর কী করবেন?
নীরজার ভক্তি—হ্যাঁ, সে দেখবার মতো একটা জিনিস বটে। গুরুর পাদোদক পান না করে তিনি দাঁতে তৃণ কাটবেন না। গুরুর বাক্য বেদবাক্যের চেয়েও মূল্যবান তাঁর কাছে। পুরোনো একছড়া সোনার হার ছিল, সেটা বিক্রি করে এসে টাকা তুলে দিলেন গুরুদেবের হাতে।
কথাটা শুনে দ্রব ঠাকরুন জিজ্ঞেস করলেন—অতগুলো টাকা দিয়ে দিলে গুরুদেবকে?
—টাকা সার্থক হল, দিদি—
—তোমার নিজের হার?
-–ও আমার বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি থেকে দিয়েছিল—তিনি হাতে করে দিয়েছিলেন—
—সেই হার তুমি দিয়ে দিলে বেচে?
—দিদি, সংসার অনিত্য, সবই অনিত্য। কে কার স্বামী, কে কার স্ত্রী? সবই ভগবানের মায়া। মায়ায় সব ভুলে থাকা—গুরুই কেবল নিত্য বস্তু—
—তা তো বটে।
এ মাগির মুখে সবসময় বড়ো বড়ো কথা! দিগে যা তোর সব কিছু গুরুর পাদপদ্মে বিলিয়ে,—তাঁর কী? বিয়ের পরে স্বামী নিজের হাতে যে হারছড়া দিয়েছিল, তা কোনো মেয়েমানুষ এভাবে ঘুচিয়ে দিতে পারে? গভীর রাত পর্যন্ত শুধু এই কথাটিই বার বার তাঁর মনে পড়ে। সে-সব দিন ঝাপসা হয়ে গিয়েছে, মনের আকাশ বিস্মৃতির মেঘে ঢাকা। ওই গোপীনাথপুরের ভিটে অমন ছিল কী তখন? ফুলশয্যার রাত—
হঠাৎ মনে পড়ে যায়, গত আষাঢ় মাসের প্রথমে উত্তর দিকের ভাঙা পাঁচিলের গায়ে এতটুকু একটা শসাগাছ নতুন বর্ষার জল পেয়ে গজিয়েছে দেখে তিনি শুকনো কঞ্চি কুড়িয়ে একটা মাচা বেঁধে দিয়েছিলেন—এতদিনে গাছ বড়ো হয়েচে, কত শসার জালি পড়েছে গাছটাতে! কে খাচ্চে সে বনের মধ্যে? হয়তো কনকী আসে লেবু তুলতে—এক গাছ লেবু রেখে এসেছিলেন, সে-ই হয়তো শসা পেড়ে নিয়ে যায়—কে জানে?
হঠাৎ কী একটা কুস্বরে দ্রব ঠাকরুন চমকে ওঠেন। নীরজার ঘর থেকে শব্দটা আসচে। মাগি এত রাত্রে করে কী? হুস হুস করে অত জোরে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলচে কেন? ঘুমের ঘোরে মুখ-চাপা লাগল নাকি?
দ্রব ঠাকরুন ডাকলেন—শুনচ—ওগো—কী হয়েছে? ওগো—
নীরজা বললেন—ডাকচেন কেন দিদি?
—বলি ও শব্দ কীসের?
—কুম্ভকের রেচক-পূরক অভ্যেস করচি—অনেক রাত ভিন্ন হয় না কিনা, ঠাকুর তাই বলে গেলেন।
সে আবার কীরে বাবা! মাগি তো ঘুমুতেও দেয় না রাত্তিরে!
দ্রব ঠাকরুন বললেন—যাকগে—ঘুমের ঘোরে মুখ-চাপা হয় নিতো?
—না দিদি—ঘুমোইনি এখনও। ঘুমোলে যোগের ক্রিয়া হয় না। জীবনটা যদি ঘুমিয়েই কাটাব, তবে পরকালের কাজ করব কখন?
—তা বেশ, বেশ। —দিদি-ঘুমোলেন? —না, কেন?
—নির্বিকল্প সমাধি না-হওয়া পর্যন্ত আমার মনে শান্তি পাচ্চিনে, পাবও না। দেহ কী-জন্যে দিদি? ঘুমোবার জন্যে নয়, আরামের নয়—শুধু নিজের কাজ করে যাওয়ার জন্যে। দিন কিনে নাও, শুধু দিন কিনে নাও
দ্রব ঠাকরুনের পিত্তি জ্বলে গেল। কিনগে যা দিন মাগি, যদি তোর পয়সা থাকে। রাত্তিরে একটু ঘুমোতে দে অন্তত।
শীতকাল এসে গেল। কানু বড়োদিনের ছুটিতে একবার কাশী এসে পিতামহীর সঙ্গে দেখা করে গেল।
দ্রব ঠাকরুন তাকে বললেন—কানু ভাই, অন্য একটা বাসা পাওয়া যায় না? কানু বিস্মিত হয়ে বললে—কেন, এখানে কী হল? সত্যর মা রয়েছেন, এই তো সবচেয়ে ভালো—
—ও মাগি পাগল।
—পাগল! সে কী!
—না বাবু বেজায় ধর্মিষ্টি। অত ধর্মিষ্টি আমার পোষাবে না। আমাকে তুই সরিয়ে নিয়ে যা—
কানু কথাটা হেসে উড়িয়ে দিলে। ঠাকুরমার যেমন কাণ্ড! বললে—আচ্ছা ঠাকুমা, শেষবয়সে কাশীবাস করতে এলে—না-হয় তুমিও হও একটু ধর্মিষ্টি! হ্যাঁ, উনি ওইরকমই বটে। সত্য বলছিল, মা কিছুতেই দেশে থাকতে চান না। এই গত বোশেখ মাসে সত্যর ছোটো ভাইয়ের বিয়ে গেল, ওঁর ছোটো ছেলের—ওঁকে কত চিঠিপত্তর, কত অনুরোধ—কিছুতেই গেলেন না! বললেন, যে মায়া একবার কাটিয়েছেন, তাতে আর জড়িয়ে পড়তে চান না। ছোটো ছেলে টেলিগ্রাম পর্যন্ত করলে, কোনো ফল হল না।
দ্রব ঠাকরুন অবাক হয়ে বললেন—বলিস কীরে কানু, সত্যি?
—মিথ্যে বলছি তোমার কাছে ঠাকুমা?
—আমায় এখান থেকে তুই সরিয়ে দে ভাই!
—ছিঃ—আচ্ছা, তুমি অত নাস্তিক কেন ঠাকুমা? ওঁর সঙ্গে থেকে একটু ধর্ম শেখো না, চিরকালই বিষয় আর সংসার নিয়েই তো কাটালে!
