খড় উড়ে উড়ে পড়ছে বাড়ির চাল থেকে! কানু বা বিন্দু দেশে যায়নি, ঘরও সারায়নি! এবার বর্ষায় কী টিকবে চালে খুঁটি না-দিলে?
কনক বলচে—অ ঠাকুমা, একটা লেবু দেবা? আমার মার অরুচি হয়েছে, কিছু খেতি পারে না—
সকালে উঠে নীরজা নিজেই গঙ্গাস্নান করে এসে স্বপাক হবিষ্যান্ন চড়িয়েছেন এবং প্রতিদিনের অভ্যাসমতো ইষ্টমন্ত্র জপ শেষ করে গানবাদ্যসহকারে শিবপূজা করচেন। দ্রব ঠাকরুনের একটু বেলা হয়েছে আজ উঠতে। মনও খুব ভার। তাঁর আপনার জন পড়ে রইল—তাঁর মুংলি, তাঁর খয়েরখাগী গাছটা, তাঁর ডুমুরগাছ— আর তিনি কোথায়! আরও ওই মাগির জ্বালায়…
নীরজার গান-বাদ্য থামল। দ্রব ঠাকুরুনকে বললেন—আজ বড়ো সুখবর পেলুম দিদি–গঙ্গাস্নানে গিয়ে গুপ্তিপাড়ার সইয়ের সঙ্গে দেখা—সেও আমার মতো কাশীবাস করচে বাঙালিটোলায় থাকে, বললে, গুরুদেব আসচেন সামনের সোমবারে। হরিদ্বার থেকে ফেরবার পথে আমার এখানে পায়ের ধুলো দিয়ে তবে যাবেন। সইও একই গুরুর কাছে মন্ত্র নিয়েছে কিনা। আজ বড়ো শুভদিন আমার। গুরুর পাদপদ্ম আশ্রয় করেই বেঁচে আছি, এবার এলে আপনাকে দীক্ষা নিতেই হবে দিদি, আমি ছাড়ব না। গুরুদীক্ষা না-হলে দেহ পবিত্র হয় না, ভবসাগর পার হতে হলে গুরুর চরণরূপ-ভেলা চাই আগে—নইলে হাবুডুবু খেয়ে মরতে হবে যে দিদি!
দ্রব ঠাকরুন বললেন—তা তো ঠিক, তা ঠিক—
গুরুদেবের আগমনের পূর্বেই শনিবার সকালের গাড়িতে কানু এসে হাজির হল। দ্রব ঠাকরুন নাতির কাছে কেঁদে পড়লেন—তুই আমায় গুপীনাথপুরে নিয়ে চল ভাই, আমার আর কাশীবাসে কাজ নেই—বাবা বিশ্বনাথ মাথায় থাকুন, ও মাগির কাছে আর দু-মাস থাকলে আমি পাগল হয়ে যাব।
ফলে সোমবার কাশীতে গুরুদেবের শুভাগমনের দিন দুপুরের ট্রেনে দ্রব ঠাকরুন দেশের ইস্টিশানে তাঁর বোঁচকা-তোরঙ্গ নিয়ে নাতির সঙ্গে এসে নামলেন।
ন-ঠাকরুন শুনে ছুটে এলেন—ও দিদি—দিদি–
—হ্যাঁ ন-বউ—আমার মুংলি ভালো আছে?
—ভালো নেই দিদি। ওঠে না, খায় না—তোমার যাওয়ার পর থেকেই, গোয়ালে শুয়েই থাকে।
—সে আমার মন বলেচে ভাই, তুমি কী বলবে! তাকে রাত্তিরে স্বপ্ন দেখেই তো আর টিকতে পারলাম না, চলে এলাম। কানুকে বললাম, নিয়ে চল ভাই গুপীনাথপুর, মাথায় থাকুন বাবা বিশ্বনাথ-মুংলি কোথায়? ওকে কচি বাঁশপাতা খাওয়াব নিজের হাতে, স্বপ্ন দেখিচি।
একটু পরে ন-ঠাকরুন দড়া ধরে মুংলিকে নিয়ে এলেন। সত্যিই তার সে চেহারা নেই! সব কাজ ফেলে দ্রব ছুটে গিয়ে তার গায়ে-মুখে হাত বুলিয়ে আদর করতে লাগলেন। মুংলির চোখে জল পড়ে, তাঁরও চোখে জল পড়ে।
ন-ঠাকরুন বললেন–আর-জন্মে ও তোমার মেয়ে ছিল দিদি–আর-জন্মের মায়ার বাঁধন–
–রক্ষে কর ন-বউ—তুমিও বড়ো বড়ো কথা বলতে শুরু করলে নাকি সেই মাগির মতো! মুংলি এ জন্মেই আমার মেয়ে—আর-জন্ম-টন্ম ছেড়ে দাও।
—কে মাগি, কার কথা বলচ—
—সে বলব এখন সব। হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছি দেশে এসে—বাবাঃ—
কানু হেসে বললে—নাঃ, ঠাকুমাকে নিয়ে আর পারা গেল না—এমন নাস্তিক —কাশীপ্রাপ্তি অদৃষ্টে থাকলে তো?
—তুই ভাই বল, ন-বউ বলো—আমার এই ভিটেতেই যেন তোদের কোলে শুয়ে সকলের কাছ থেকে বিদেয় নিয়ে যেতে পারি। কাশি পেরাপ্তিতে দরকার নেই —এই ভিটেই আমার গয়া-কাশী। তিনি এই উঠোনের মৃত্তিকেতে শুয়েছিলেন ওই তুলসিতলায়—আমাকেও তোরা ওখানে—
আঁচলের খুঁট দিয়ে দ্রব ঠাকরুন চোখের জল মুছলেন।
বেলা যায়-যায়—আষাঢ়ান্ত সুদীর্ঘ দিনমানের শেষে সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিম দিকের নিবিড় বাঁশবনের অড়ালে। ঘেঁটকোল ফুল কোথাও জঙ্গলে ফুটেচে, বাতাসে তার কটু উগ্র গন্ধ। দ্রব ঠাকরুনের মন শান্তিতে, আনন্দে, উৎসাহে পূর্ণ হয়ে গেল। এগারো বছরের নববধূ, এই বাড়ির উঠোনে পা দিয়েছিলেন, এখন তাঁর বয়েস তিন-কুড়ি ছয়। কনক হাসিমুখে এসে দাঁড়িয়ে বললে—ঠাকুমা, ভালো আছেন? এয়েচেন শুনে ছুটে দেখতি এলাম—আমাদের কথা মনে ছিল?
নব-বৃন্দাবন
কর্ণপুর সংসার ছাড়িয়া বৃন্দাবনে যাইতেছিলেন।
সংসারে তাঁহার কেহই ছিল না। স্ত্রী পাঁচ-ছয় বছর মারা গিয়াছে, একটি দশ বৎসরের পুত্র ছিল, সেও গত শরৎকালে শারদীয় পূজার অষ্টমীর দিনে হঠাৎ বিসূচিকা রোগে দেহত্যাগ করিয়াছে। সংসারের অন্য বন্ধন কিছুই নাই। বিষয়সম্পত্তি যাহা ছিল, সেগুলি সব জ্ঞাতিভ্রাতাদের দিয়া অত্যন্ত পুরাতন তালপত্রে কয়েকখানি ভক্তিগ্রন্থ জীর্ণ তসরের পুটুলিতে বাঁধিয়া লইয়া পদব্রজে বৃন্দাবন যাইবার জন্য প্রস্তুত হইলেন।
কর্ণপুরের জন্মপল্লি অজয় নদের ধারে। তিনি পরমবৈষ্ণবের সন্তান। অজয়ের জলের গৈরিক দুই তীরের বন-তুলসী মঞ্জরীর ঘ্রাণে কোন শৈশবেই তাঁর বৈষ্ণবধর্মে মানসিক দীক্ষা হয়। তিনি গ্রামের টোলে উত্তমরূপে সংস্কৃত অধ্যয়ন করেন। দুই-একটি ছাত্রকে কিছুকাল স্মৃতি ও বৈদ্যকশাস্ত্রও পড়াইয়াছিলেন। ছাত্রেরা দেখিত তাহাদের অধ্যাপক মাঝে মাঝে ঘরে দুয়ার বন্ধ করিয়া সমস্ত দিন কাঁদেন। পাগল বলিয়া অখ্যাতি রটাতে ছাত্রেরা ছাড়িয়া গেল, প্রতিবেশীরা তাচ্ছিল্য করিতে শুরু করিল, তাহার উপর প্রথমে স্ত্রী, তৎপরে পুত্রের মৃত্যু। সংসারের উপর কর্ণপুর নিতান্তই বিরক্ত হইয়া উঠিলেন।
যাইবার সময় জ্ঞাতিভ্রাতা রসরাজ আসিয়া মায়াকান্না কাঁদিল, গ্রামের এক ব্রাহ্মণ বহুদিন ধরিয়া কর্ণপুরের নিকট ঋণ গ্রহণ করিয়াছিল এবং তাহার পর হইতেই সে তাঁহাকে বাজিজ্ঞানে শত হস্ত দূরে রাখিয়া চলিয়া আসিতেছিল। আজ যখন সে দেখিল কর্ণপুর সত্য সত্যই বাহির হইয়া যাইতেছেন, ফিরিবার কোনো আশঙ্কাই নাই, তখন সে আসিয়া মহা পীড়াপীড়ি শুরু করিল—আর কয়েকটা মাস থাকুন, যে করিয়া পারি ঋণটা শোধ করিয়া ফেলি, কারণ ঋণ পাপ ইত্যাদি। উদারচিত্ত কর্ণপুর এসব কপট প্রবন্ধ বুঝিলেন না। তিনি রসরাজকে তাঁহার প্রার্থনা মতো তালদিঘির পাড়ের আশুধান্যের একটুকরা উৎকৃষ্ট ভূমি দানপত্র করিয়া দিলেন। ব্রাহ্মণ অধমর্ণকে বলিলেন—এককড়া কড়ি আনো ভায়া, গ্রহণ করিয়া তোমায় ঋণমুক্ত করি।
