দিনকয়েক যেতে-না-যেতেই দ্রব ঠাকরুন বুঝে নিলেন সঙ্গিনীটি ধর্মবাতিকগ্রস্তা। সাধুসন্নিসির ভক্ত। যদি কোথাও কোনোধরনের সাধু মন্দিরে কী ঘাটে বসে আছে, তবে আর নিস্তার নেই। সেখানে বসে অমনি গরুড়ের মতো হাত জোড় করে বকবক বকুনি জুড়ে দেবে। আর কীসব কথা জিজ্ঞেস করবে, কর্মফল কী, পুনর্জন্ম কী, হেনো তেনো। রাস্তাঘাটে বেরুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়, বাসায় ফেরবার নামটি নেই। এত বিরক্ত ধরে দ্রব ঠাকরুনের—কিন্তু তিনি কী করবেন? কাশীর রাস্তা চেনেন না—একাও বাসায় ফিরতে পারেন না সঙ্গিনী না-ফিরলে।
একদিন বিশ্বনাথের মন্দিরে সন্ধ্যার আরতি দেখতে গেলেন দুজনেই।
সেখানে এক সন্ন্যাসিনী নাটমন্দিরে বসে আছেন, গেরুয়া কাপড় পরনে, মাথায় জটা, অনেক মেয়েছেলের ভিড় হয়েছে সেখানে। নীরজা তো সাধু-সন্ন্যাসী দেখলে সর্বদা একপায়ে খাড়া, চারিপাশের ভক্তের দলে গেল মিশে তাঁকে নিয়ে। দ্রব ঠাকরুন শুনতে লাগলেন কেউ জিজ্ঞেস করচে, মাইজি, ঠাকুরের দেখা পাওয়া যায়?
কেউ বলছে—মাইজি, আমার মেয়ের মাদুলি দেবেন তো আজ?
—আজ আমার হাতখানা দয়া করে দেখবেন কী?
নীরজা জিজ্ঞেস করলেন—মাইজি, আমার ভক্তি হচ্ছে না কেন?
দ্রব ঠাকরুন শুনে মনে মনে হেসে আর বাঁচেন না। সর্বদা সাধুসন্নিসি নিয়েই আছো, এখানে প্রণাম, ওখানে ধন্না, দু-ঘণ্টা ধরে নাক টেপা—এতেও যদি তোমার ভক্তি না-হয়ে থাকে, গঙ্গার জলে ডুবে মরো গিয়ে—ঢং দেখে আর বাঁচিনে! মরণ আর কী!
তারপরই সবাই চলে গেল—নীরজা সেই যে সেখানে চোখ বুজে ধ্যান না কী যোগে বসল, আর ওঠে না! দ্রব ঠাকরুনও কিছু বলতে সাহস পান না। এদিকে তাঁর মনে পড়ল সুজি একদম নেই, সে-কথা এতক্ষণ মনে ছিল না, এত রাত হয়ে গেল, কোথায়-বা সুজি কেনা হবে! রাত্রে একটু মোহনভোগ খাওয়া, তাও আজ ধর্মের ভিড়ে বুঝি বা হয় না।
বসে বসে দ্রব ঠাকরুন বিরক্ত হয়ে উঠলেন। মন্দির থেকে মেয়েরা প্রায় সব চলে গিয়েছে, এদেশি লোক যারা হিন্দিমিন্দি বলে, তাদের দলই যাচ্চে-আসছে। কী জানি ওদের কথা তিনি কিছুই বুঝতেও পারেন না, বলতেও পারেন না।
আজ মাসতিনেক গ্রাম থেকে এসেছেন। বেশ শীত পড়ে গিয়েচে কাশীতে। মংলি গোরুটার কথা এত করেও আজকাল মনে পড়ছে। শীতের রাত্রে পাছে কষ্ট হয় বলে তিনি গোয়ালে আগুন করে রাখতেন। তাঁর গাছটাতে খুব ডুমুর হয়েছে নিশ্চয়, কে জানে একটা গাছ ডুমুর কারা খাচ্চে? কম ডুমুর হয় গাছটাতে! আহা, ন-বউ কী মুংলিকে অত যত্ন করছে?—তাঁর মতো? তিনি যে পেটের মেয়ের মতো ওকে…না, তাঁর চোখে জল এসে পড়ে।
আজই এতকাল পরে ন-বউ-এর পত্র এসেচে দেশ থেকে…তাই বেশি করে মনে পড়ছে দেশের কথা। ন-বউ লিখেচে মুংলি ভালো আছে, শিগগির বাছুর হবে। তাঁর বাড়ির দাওয়ার খুঁটি না-বদলালে নয়। কানু বা বিন্দেকে যেন চিঠি লেখা হয় সেজন্যে।
নীরজা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে ধ্যান ভঙ্গ করে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন—দিদি চলো যাই…সত্যি কী পবিত্র স্থান, না? ইচ্ছে হয় না যে আবার সংসারে ফিরে যাই, রাঁধি খাই!
দ্রব ঠাকরুন মনে মনে বললেন—মরো না এখানে শুকিয়ে হত্যে দিয়ে—কে মাথার দিব্যি দিয়েছে রাঁধতে খেতে!
নীরজা বললেন—করন্যাসটা অভ্যেস করছি কিনা, প্রায় হয়ে এল—
দ্রবময়ী নীরব। মাগিটা পাগল নাকি? কীসব বলে বোঝাও যায় না! রাত দুপুর বাজল, বাবা, এখন বাসায় চল দিকি!
বাসায় এসেও কি তাই নিস্তার আছে?
নীরজা ডাকবেন তাঁর ঘর থেকে—ও দিদি, একটু গীতাপাঠ করি শোনো— নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে তাঁকে যেতে হয়। গীতা-টিতা ওসব তিনি বোঝেন না। সুবচনীর ব্রতকথা, সত্যনারায়ণের পাঁচালি, শিবরাত্রির ব্রতকথা এসব শোনা তাঁর অভ্যেস আছে, বেশ দিব্যি বুঝতেও পারেন—এসব শক্ত শক্ত কথার কী কাণ্ডমাণ্ড, এক বর্ণও যদি তিনি বোঝেন! আর মাগির চোখ উলটে, কান্না কান্না মুখের ভাব করে পড়বার ভঙ্গিই বা কী! দ্রব ঠাকরুন না-পারেন হাসতে, না পারেন হাসি চাপতে! এমন বিপদেও মানুষ পড়ে গা!
নীরজা পড়তে পড়তে বলবেন—আহা-হা! কী চমৎকার!
দ্রব ঠাকরুন বসে ঢুলতে ঢুলতে ভাববেন—থামলে যে বাঁচি–
সকালে উঠে নীরজা বললেন—আজ আমার গুরুদেব আসবেন, দিদি দু-খানা লুচি ভেজে দিও তো আমার ঘরে বসে।
বেলা দু-টোর সময় এক সন্নিসি এসে হাজির। বেশ মোটা ভুড়িওয়ালা, এই লম্বা দাড়ি। নীরজা সাষ্টাঙ্গ হয়ে প্রণাম করে দু-বার মাথা ঠুকলেন গুরুদেবের পাদপদ্মে। আহারাদির জোগাড় করতেই কাটল সারাদিন—তিনসের দুধ মেয়ে একসের হল, ঘরে রাবড়ি মালাই তৈরি হল। লুচি ভাজা হল। সন্ধ্যার সময় নীরজা বসলেন গুরুর কাছে কীসব ক্রিয়া শিখতে। আসন না মাথামুণ্ডু তাই শিখতে। যত-বা এ বকে, তত-বা ও বকে। মনে হল বুঝি কানের পোকা সব বেরিয়ে যায়!
গুরুদেব বাঙালি। রাত নটার পরে দ্রব ঠাকরুনকে ডাক দিলেন। বললেন—তোমার বাড়ি কোথায়?
—গোপীনাথপুর, যশোর জেলা—
—কে আছে বাড়িতে?
-নাতিরা আছে, তাদের ছেলে-বউ আছে।
—তুমি কাশীবাস করতে এসেছ?
—হ্যাঁ।
—নাম কী?
–দ্রবময়ী দেব্যা—
—দীক্ষা হয়েছে?
–না।
নীরজা চোখ কপালে তুলে বললেন—কী সর্বনাশ! দীক্ষা হয়নি এতদিন? তা তো জানতাম না?
গুরুদেব বললেন—দীক্ষা নিতে হবে মা তোমাকে।
—আমার পয়সা নেই, দীক্ষা নিতে গেলে খরচ আছে। নাতিরা এগারো টাকা করে মাসে পাঠায়—তার মধ্যে ঘরভাড়া, তার মধ্যে খাওয়া। পয়সা পাই কোথায়?
