নাতি-ঠাকুরমার পরামর্শ হল রাত্রে। কানু এক মতলব ফেঁদে এসেচে। ঠাকুরমাকে সে কাশী নিয়ে গিয়ে রেখে আসবে। তার একজন কে বন্ধুর মা কাশীতে থাকেন, সেই একই বাড়িতে ঠাকুরমাকে রাখবে। পরদিন সকালে ন-বউ শুনে খুব খুশি, অমন সব নাতি থাকতে ভাবনা কী? তীর্থধর্ম করার সময়ই তো এই। তাঁর যদি আজ ছেলেটাও বেঁচে থাকত।
আজ প্রায় পঁয়তাল্লিশ বৎসর পূর্বে সাত মাস বয়সে ন-ঠাকরুনের ছেলে মারা গিয়েছে সে-ই প্রথম, সেই শেষ। তাঁর আর ছেলেপুলে হয়নি।
যাবার দিন দ্রব ঠাকরুন প্রিয় মুংলি গোরুটার ভার দিয়ে গেলেন ন-বউকে। বার বার মাথার দিব্যি দিলেন, মুংলিকে যেন যত্ন করা হয়। বললেন—ও গোরু তোমারই হয়ে গেল ন-বউ, আমায় আশীর্বাদ করো যেন কাশীতে হাড় ক-খানা রাখতে পারি—নাতিদের ঘাড়ের বোঝা যেন নেমে যাই—আমার বড়ো নাতির ভাবনা কী, তার সচ্ছল অবস্থা, লুচি-পরোটা জলখাবার, তেল ঘিয়ে কলকলে করে পাঁচ ব্যাঞ্জন রান্না—আমি বুড়ি হয়েছি, ওদের সংসারে সেকেলে মতের লোকের জায়গা আর হয় না এখন–
ঘরের অড়ায় শুকনো নারকোল পাতার আঁটি, পাকাটির বোঝা জোগাড় করা ছিল, বর্ষায় উনুন ধরানোর কষ্ট বলে সুগৃহিণী দ্রব ঠাকরুন ‘যে-সময়ের-যা’ সঞ্চয় করে রাখতেন। কাশীবাস করতে যাচ্ছেন, পেছনটান থাকলে তীর্থবাস হয় না— সে-সব দান করে গেলেন কতক ন-ঠাকরুনকে, কতক একে-ওকে।
কনক একটা পাকা শসা হাতে এসে বললে—শসা খাবে ঠাকমা?
—তুই এক বোঝা পাকাটি নিয়ে যা কনকী—ঠাকমাকে মনে রাখবি তো, হ্যাঁ রে?
কনক অনেকখানি ঘাড় নেড়ে বললে—হু-উ-উ—
ন-ঠাকরুন চোখের জল ফেললেন যাবার সময়ে।
দ্রব ঠাকরুন ট্রেনে কোনোরকমে শুচিতা বজায় রেখে কাশী এসে পৌঁছালেন। একটা গলির মধ্যে দোতলা একটা বাড়ির নীচের তলার ঘরে কানুর সেই বন্ধুর মা কাশীবাস করছেন। পাশেই আর একখানা ছোটো ঘর ভাড়া নেওয়া হয়েছে দ্রব ঠাকরুনের জন্যে। অপর বৃদ্ধাটির কাছে চাবি ছিল ঘরের, তিনি চাবি খুলে দিলেন। দ্রব ঠাকরুন নিজের জিনিসপত্র নিয়ে সেই ঘরে অধিষ্ঠান হলেন।
দ্রব ঠাকরুন ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই সভয়ে আবিষ্কার করলেন, তাঁর প্রতিবেশিনী নদে’ জেলার লোক। কথাবার্তার ধরন ও সুর শহুরে ও সম্পূর্ণ মার্জিত। যশোর জেলার মানুষ দ্রব ঠাকরুনের ভয় পাবারই কথা বটে। তিনি এসে দ্রব ঠাকরুনের ঘরে ঢুকে বললেন—আপনার রান্নাবান্নার ব্যবস্থা কাল থেকে করলেই হবে— আজ আমার ঘরে দুধ আর মিষ্টি আছে, আপনার জন্যে রাখলুম কিনা।
দ্রব ঠাকরুন ভয়ে ভয়ে বললেন—ও!
প্রতিবেশিনী নিজের ঘর থেকে খাবার এনে বললেন—আপনার লোমবস্ত্র বার করুণ—
দ্রব ঠাকরুন ভালো বুঝতে না-পেরে বললেন—কী বললেন?
দ্রব ঠাকরুন ‘বললেন’ এই কথায় ‘ব’-এর উচ্চরণ যশোর জেলার উচ্চারণ রীতি অনুযায়ী প্রসারিত উচ্চারণ, প্রতিবেশিনী বৃদ্ধার উচ্চারণে এইসব স্থানের উচ্চারণ যতদূর সম্ভব আকুঞ্চিত। ‘বললেন’-এর উচ্চারণ ‘বোললেন’—’ও’-এর উচ্চারণও যতদূর সম্ভব ঘোরালো।
–বলচি, লোমবস্ত্র বের করে পরুন, একটু কিছু মুখে দিতে হবে তো?
লোমবস্ত্র কি জিনিস, পাড়াগাঁয়ের মানুষ দ্রব ঠাকরুন কখনো শোনেননি—তবে জিনিসটা যে বস্ত্রজাতীয় দ্রব্য তা বুঝতে পারলেন, বললেন—সে তো আমার নেই!
—লোমবস্ত্র নেই? আপনি জপ করেন কী পরে?
—এই সাদা থান পরেই জপ করি, আর কোথায় কী পাব?
বাড়িখানা গলির মুখে হলেও প্রায় সদর রাস্তার ওপরে। অনেক রাত পর্যন্ত গাড়িঘোড়া রাস্তার গোলমাল থামে না। নিরিবিলি বনজঙ্গলের মধ্যে বাড়িতে একা থাকা দ্রব ঠাকরুনের চিরদিনের অভ্যাস, এত গোলমালে বড়োই অস্বস্তিবোধ করতে লাগলেন তিনি। উঃ, কী মুশকিলেই পড়া গেল! নাঃ কাশীর লোক ঘুমোয় কখন?
কানু তার পরদিন বন্ধুর হাতে পল্লিবাসিনী পিতামহীকে সমর্পণ করে কর্মস্থানে চলে গেল, তার ছুটি ফুরিয়েছে। বন্ধুর মা-র নাম নীরজাবাসিনী, দ্রব ঠাকরুনের চেয়ে তাঁর বয়স দু-পাঁচ বছর কম হবে, মাথার সব চুল এখনও পাকেনি—তবে সেটা স্বাস্থ্যের গুণেও হতে পারে।
দ্রব ঠাকরুন এঁর সঙ্গে দশাশ্বমেধ ঘাটে বিকেলে বেড়াতে গেলেন—খুব লোকজনের ভিড়, গান, বক্তৃতা, কথকতা। এক গেরুয়া কাপড়পরা সন্নিসির চারিপাশে খুব ভিড়, নীরজা সেখানে জুটলেন গিয়ে। কর্মবাদ, সেবাধর্ম ইত্যাদি নিয়ে সন্নিসি কীসব কথা বলে যাচ্ছেন, দ্রব ঠাকরুন অতশত বুঝতে পারলেন না। ফিরবার পথে দ্রব ঠাকরুন জিজ্ঞেস করলেন—উনি কেডা?
—উনি রামকৃষ্ণ মঠের একজন বড়ো ইয়ে—স্বামী সেবানন্দ।
—কী মঠ?
—কেন, রামকৃষ্ণ মঠের কথা শোনেননি? ঠাকুর রামকৃষ্ণদেবের—মস্ত বড়ো কাণ্ড ওঁদের
—রাম আর কৃষ্ণ দুই ঠাকুরের নাম বুঝি?
নীরজা বিস্ময়ে দ্রব ঠাকরুনের দিকে চেয়ে বললেন—আপনি শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসের নাম শোনেননি?
—না। কে তিনি—কই না—এখানে আছেন?
নীরজা আর কোনো কথা বললেন না। এমন বর্বরের সঙ্গেও তিনি বেড়াতে বেরিয়েছেন যে রামকৃষ্ণদেবের নাম পর্যন্ত জানে না! দ্রব ঠাকরুনের কোনো দোষ নেই, তিনি অজ্ঞ সেকেলে লোক, অজ পল্লিগ্রাম ছেড়ে জীবনে কখনো কোথাও যাননি। গোপীনাথপুরের জঙ্গলে ও-নাম কখনো কারো মুখে শোনেনওনি। তিনি জানেন, রাম, কৃষ্ণ, রাধা, দুর্গা, লোচনপুরের জাগ্রত কালী, কালীঘাটের কালী ইত্যাদি। অতবড়ো নামের কোনো ঠাকুরের কথা—কই কেউ তো তাঁকে বলেনি।
দ্রব ঠাকরুন ভয়ে ভয়ে থাকেন। তাঁর সঙ্গিনী তাঁকে নিতান্ত নাস্তিক, অজ্ঞ, মূখ বলে না। ঠাওরান।
