—না বাপু, আমার নেই।
—কেন, আপনার বাড়ির পেছনে হরি রায়ের দারুণ জঙ্গলে তো বেশ বড়ো বড়ো পিটুলি গাছ আছে—
-না, আমি বেচব না।
আসলে দ্রব ঠাকরুনের গাছপালার ওপর বড়ো মায়া, স্বামীর আমলের যা কিছু যৎসামান্য জমিজমা, তা প্রায়ই জঙ্গলাবৃত এবং বড়ো বড়ো বাজে গাছে ভর্তি। জ্বালানি কাঠ হিসেবে বিক্রি করলেও এ কয়লার দুর্মূল্যতার দিনে দু-পয়সা পাওয়া যায়, কিন্তু গাছের একটা ডাল কাটতেও তাঁর মায়া। না-খেয়ে কষ্ট পাবেন, তবুও গাছ বিক্রির কথা তুলতেও দেবেন না। একজনের শুয়োপোকা লাগাতে সে। ডুমুরপাতা পাড়তে এসেছিল, কারণ ডুমুরপাতা দিয়ে শুয়ো-লাগা জায়গাটা ঘষলে শুয়ো ঝরে যায়, কিন্তু দ্রব ঠাকরুন তাকে ডুমুরপাতা পাড়তে দেননি। হয়তো এটা অতিরঞ্জিত গল্পমাত্র, তবে এর দ্বারা তাঁর মনের অবস্থা অনেকটা বোঝা যাবে।
বৈকালের দিকে দ্রব ঠাকরুন বেশ ভালোই বোধ করলেন। পাড়ার এক প্রান্তেজঙ্গলে ঘেরা বাড়ি, বড়ো কেউ এদিকে বেড়াতে আসে না, এক ন-ঠাকরুন ছাড়া কেউ উঁকি মেরে বড়ো একটা দেখে না, দ্রব ঠাকরুন কিন্তু লোকজন, আড্ডা, মজলিশ প্রভৃতি ভালোইবাসেন। কেউ এসে গল্প করে, এটা তাঁর খুবই ইচ্ছে— কিন্তু ও-বেলার সেই বালিকাটি ছাড়া বিকেলে আর কেউ এল না। সেও এসেছে নিজের স্বার্থে।
ঠাকুরমা, একটা লেবু দেবেন?
—কেন রে, কেন? ওবেলা তো—
—ওবেলার লেবু ওবেলা ফুরিয়েচে, এবেলা একটা দরকার—মা বললে—
—আচ্ছা, আয় উঠে, বোস একটু—
বালিকাটি অনিচ্ছাসত্বেও এসে বসে। নয়তো লেবু পাওয়া যায় না। বুড়ির কাছে বসতে তার ইচ্ছে হয় না, তার সমবয়সি বালিকারা রায়পাড়ার পুকুরধারে এতক্ষণ ফুল তোলাতুলি খেলা আরম্ভ করে দিয়েছে—তার প্রাণ রয়েছে সেখানে পড়ে। কিন্তু দ্রব ঠাকরুনের নিঃসঙ্গ মন যাকে আঁকড়ে ধরতে চায় এই নির্জন বৈকাল বেলাটিতে—তবুও দুটো কথা বলবার লোক তো বটে।
দ্রব ঠাকরুন আপনমনেই বকে চলেছেন, নাতবউ-এর মন্দ ব্যবহারের কথা, নাতির ছেলে খোকনের অলৌকিক গুণাবলি, ছোটো নাতি পরেশ তাঁকে কীরকম ভালোবাসে…এই ধরনের নানাকথা শুনতে শুনতে ক্ষুদ্র শ্রোতাটির হাই ওঠে, সে করুণস্বরে বলে—ঠাকুমা, মা সাবু চড়িয়ে আমায় বললে, লেবু নিয়ে আয়, বেলা গেল—
—হ্যাঁ হচ্চে হচ্চেতারপর শোন না…
–মা বকবে—লেবু নইলে সাবু খেতে পারবে না—
—আচ্ছা, শোন—তারপর খোকনমণি সেই পেয়ারা তো খাবেই, কিছুতেই ছাড়ে না—ওর মাও দেবে না—বড্ড হেজলদাগড়া মেয়ে ওর মা, আমি বলি, বউ, চাচ্চে খেতে, এক টুকরো ওকে দ্যাও—তা আমায় বললে—আপনি চুপ করে থাকুন, আপনি কী বোঝেন ছেলে-মেয়ে মানুষ করার—একালের মাও অন্যরকম, আপনাদের সেকাল গিয়েচে।…আমি জানিনে ছেলে-মেয়ে মানুষ করতে—তবে তুই তোর বর পেলি কোথা থেকেরে আবাগের বেটি?
—আমি এবার যাই ঠাকমা—লেবু একটা
-আচ্ছা তা যা নিয়ে একটা লেবু—শুনলি তো সব কাণ্ডখানা! দিদিশাশুড়ি বড়ো মন্দ—
এমন সময়ে বাড়ির বাইরে একখানা গোরুরগাড়ির শব্দ শোনা গেল। খুকি কৌতূহলে চোখ বড়ো বড়ো করে বললেও ঠাকমা, কে যেন এল গাড়ি করে —তোমার ওই তুত-তলায় গাড়ি দাঁড়াল—
বলতে বলতে দ্রব ঠাকরুনের মেজো নাতি নীরদচন্দ্র দুটি ভারি মোট দু-হাতে ঝুলিয়ে বাড়ি ঢুকে ডাক দিলে–ও ঠাকমা—
দ্রব ধড়মড় করে উঠে দাঁড়িয়ে একগাল হেসে বল্লেন-কানু? আয়, আয় ভাই ভালো আছিস?
কানু এসে মোট নামিয়ে পিতামহীকে প্রণাম করলে, বলিকাটির দিকে চেয়ে বললে— এ হরিকাকার মেয়ে কনক না? ওঃ কত বড়ো হয়ে গিয়েছে—ভালো আছিস কনকী? নে দাঁড়া—একখানা গজা নিয়ে যা—
পুঁটলি খুলে মেয়েটির হাতে একখানা বড়ো গজা দিতে সে নিঃশব্দে হাসিমুখে হাত পেতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইল, বড়ো মোটটার মধ্যে আরও কী কী জিনিস আছে দেখবার আগ্রহে। তাদের বাড়িতে এমন কেউ নেই যে বিদেশে চাকুরি করে— নিতান্তই অল্পবিত্ত গৃহস্থের সংসার চাকুরে বাবুরা বাড়ি আসবার সময় কী কী অপূর্ব জিনিস না-জানি নিয়ে আসে!
দ্রব ঠাকরুন জিজ্ঞেস করলেন— তারপর, কী মনে করে? হঠাৎ যে! বুড়িকে মনে পড়েছে তাহলে? বাবাঃ, সারা আষাঢ় মাস অসুখে ভুগে ভুগে—তাই এখনও কী সেরেচি! এমন একটা লক নেই যে, এক ঘটি জল এগিয়ে দেয়—ওই ন-বউ ছিল তাই—এত চিঠি দিলাম, না-এল টেবু, না-এল বিন্দে, না-এলে তুমি
সন্ধ্যার পর ন-ঠাকরুন খবর পেয়ে ছুটে এলেন। গ্রামের ছেলে, জন্মাতে দেখেছেন, অনেক দিন পরে দেখে খুব খুশি। কুশলপ্রশ্নাদি জিজ্ঞেস করার পর বললেন—হ্যাঁ কানু, তা তোমরা সোনারচাঁদ সব নাতি থাকতে বুড়ি এখানে বেঘোরে মারা যাবে! পালাজ্বরে ধরেচে—এই আজ ভালো আছে, কাল এমন সময় লেপ-কাঁথা মুড়ি দিয়ে পড়বে! কে দেখে, কে শোনে—তার ওপর আবার গোরু—একটা বিহিত করে যাও যা হয়—নইলে—
কানু বললে—সেসবের জন্যেই তো আসা। চিঠি পেয়েছি অনেক দিন, সায়েব ছুটি দিতে চায় না—পরের চাকরি—তাই দেরি হল।
দ্রব ঠাকরুন বললেন—ভালো কথা, ও ন-বউ, দু-খানা গজা নিয়ে যাও, জল খেয়ো কানু এনেচে আমার জন্যে—তা ও যেমন পাগল, আমার কী দাঁত আছে। যে গজা খাব? নিয়ে যাও ন-বউ।
—তা দ্যাও দু-খানা, নিয়ে যাই। ভালোটা-মন্দটা এ পাড়াগাঁয়ে তো চক্ষেই দেখতে পাইনে দিদি-বেঁচে থাক তোমার সোনারচাঁদ নাতিরা, তোমার ভাবনাটা কীসের? বিশেষ করে কানুর মতো ছেলে নেই এ গাঁয়ে—আমি যা বলব তা মুখের ওপরেই বলব বাপু
বলে ন-বউ দু-খানার জায়গায় চারখানা গজা হাতে খুশি মনে বাড়ির দিকে চললেন আর কিছুক্ষণ পরে।
