হরিচরণ একদিন রাত্রে খাইতে বসিয়া বলিল—বউ, তোর হাতে বড়ো সুন্দর দেখাচ্ছে কিন্তু।
বীণাপাণির মুখ লজ্জায় ও আনন্দে রাঙা হইয়া উঠিল।
সাত-আট দিন পরে মাঘ মাসের মাঝামাঝি রায়বাড়িতে একটা বড়ো নিমন্ত্রণ উপস্থিত হইল। বীণাপাণির অনেক দিনের একখানা জরিপাড় কাপড় তোরঙ্গের ভিতর তোলা ছিল। নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণে এই কাপড়খানা সে বাহির করিয়া পরিত। হরিচরণ মুখে যতই আস্ফালন করুক, স্ত্রীকে ভালো কাপড় কিনিয়া দিবার ক্ষমতা তাহার ছিল না। অত্যন্ত পুরাতন হইলেও বীণাপাণি কাপড়খানাকে অতি যত্নের সহিত ব্যবহার করিত। এই নিমন্ত্রণে যাইবার সময় কাপড়খানা সে বাহির করিয়া পরিল ও মেয়েমহলে দিগবিজয়ের লোভ সামলাইতে না-পারিয়া ব্রেসলেটজোড়াও হাতে পরিয়া খাইতে গেল। তাহার ইচ্ছা নিজেকে লোকের চক্ষে বড়ো করা। আমাদের দেশের শিক্ষিত পুরুষদের জ্ঞান ও বিদ্যা আছে, তাহারা লোকসমাজে তাহাই দেখাইয়া বেড়ান; কিন্তু বেচারি মেয়েদের সে সম্বল নাই, কাজেই তাহারা শুধু গহনা দেখাইয়া বড়ো হইতে চাহে।
সন্ধ্যার একটু পরে বীণাপাণি নিমন্ত্রণ হইতে ফিরিয়া আসিল। একাদশীর জ্যোৎস্না অল্প অল্প উঠিয়াছে, বাড়িতে কেহ নাই—নিপুকে রায়গৃহিণী ভালোবাসিতেন, রাত্রের জন্য তাহাকে রাখিয়া দিয়াছেন—সকালে লোক দিয়া পাঠাইয়া দিবেন। বীণাপাণি ভাবিল স্বামী এখনও বাড়ি আসেন নাই, ততক্ষণ গা ধুইয়া ও কাপড়খানা কাচিয়া আসিয়া রান্না চড়াইয়া দিবে। পুকুরের ঘাটে যাইবার সময় দেখিল, বাগানের বেড়ার ওপারে বসিয়া স্বামী কী কাজ করিতেছেন। গা-হাত ধুইয়া পুকুর হইতে উঠিবার সময় সে দেখিল স্বামী বেড়ার ধারে নাই, বোধ হয় উঠিয়া বাড়ি গিয়া হাত-পা ধুইতেছেন। বাড়ি আসিয়া দেখিল, দুয়ার যেমন তেমনই তালা লাগানো আছে—স্বামী বাড়ি নাই। ভাবিল বোধ হয় পাড়ার কোথাও বেড়াইতে গিয়াছেন। জলের ঘড়া দালানের মুখে নামাইয়া সে ঘড়ার জলে হাত-পা ধুইয়া রকে উঠিল—কুলুঙ্গি হইতে চাবি লইয়া ঘর খুলিল, তারপর শুকনো কাপড় পরিয়া প্রদীপ জ্বালিল। জলের ঘড়া বাহির হইতে আনিয়া ভিতর হইতে দালানের দোর বন্ধ করিয়া রান্নাঘরে যাইবে, এমন সময় তাহার ব্রেসলেটের বাক্সের কথা মনে পড়িল। নিমন্ত্রণ খাইয়া আসিয়া ব্রেসলেট খুলিয়া কেস-সুদ্ধ গহনা দালানের উপর রাখিয়াছিল, তুলিয়া রাখিবার জন্য সেখানে গিয়া বীণাপাণি দেখিল— ব্রেসলেটের কেস দালানে নাই! ভাবিল, তবে কি নীচে পড়িয়া গেল? আলো ধরিয়া দেখিল, সেখানেও নাই!
বীণাপাণির মুখ ভয়ে নীলবর্ণ হইয়া গেল। পরক্ষণেই মনে হইল বোধ হয় স্বামী ঘরে আসিয়া জিনিসটা অসাবধানে পড়িয়া থাকিতে দেখিয়া বাক্সের মধ্যে রাখিয়া দিয়া থাকিবেন। তাহার নিজের তোরঙ্গের চাবি নিজের কাছে—স্বামীর নিজস্ব একটা তোরঙ্গ ছিল, তাহার চাবি ছিল না, সেটা খুলিয়া দেখিল তাহাতেও নাই। এ কুলুঙ্গি-সেকুলুঙ্গি খুঁজিল, বাক্সের উপর-নীচে দেখিল, ঘরের কোণে খুঁজিল— কোথাও নাই। গরিবের গৃহস্থালি, বাক্স-প্যাঁটরার সংখ্যা অত্যন্ত অল্প। যাহা ছিল তাহার কোথাও ব্রেসলেটের কেস খুঁজিয়া পাইল না। বীণাপাণি ভয়ে আড়ষ্ট হইয়া উঠিল—তাহা হইলে অন্য কেহ কী ঘরে ঢুকিয়া চুরি করিল? সে-কথা ভাবিতেও পারিতেছিল না—ভাবিতেই তাহার বুক কেমন আড়ষ্ট হইয়া যাইতে লাগিল।
চুরি গিয়াছে এ কথায় আমল না-দিয়া সে মনে মনে ভাবিতে লাগিল—তবে কি তাহার স্বামী কৌতুক দেখিবার জন্য গহনার বাক্স লুকাইয়া রাখিয়াছেন? নিশ্চয়। তাই—নতুবা আর কে লইতে পারে?
হরিচরণের সেদিন বাড়ি ফিরিতে বেশ বিলম্ব হইল। সে কোনোদিন এত রাত করিয়া ফিরে না। যখন ফিরিয়া আসিল, তখন রাত অনেক। তাহার একহাঁটু ধূলিকাদা, যেন অনেক রাস্তা হাঁটিয়া আসিয়াছে। হরিচরণ ঢুকিয়াই বলিল—ওঃ, আজ যা ঘোরাঘুরি হল। সেই বেলা দুটোর সময় দুটি নেমন্তন্ন গিলেই বেরিয়েছি আর অনবরত ঘুরছি। তা তুমি এসেছ কখন?
বীণাপাণি স্বামীর কথা শুনিয়া হাসিয়া ফেলিল, বলিল—আহা, আমি বুঝি কিছু বুঝতে পারিনি, কচি খুকি কিনা! সে তুমি বের হয়ে গেলেই আমি ধরেছি।
হরিচরণের মুখ হঠাৎ একেবারে কাগজের মতো সাদা হইয়া গেল। একটু পরেই সে কথা বলিল বটে, কিন্তু সে যেন অনেক চেষ্টা করিয়া—কী বলো দেখি? সত্যি বলছি আমি তো বাড়ি ছিলাম না। আমি সেই দুটোর সময়েই চলে গেছি খাজনা আদায় করতে। তুই কীসের কথা বলছিস?
তাহার স্বরে লেশমাত্র কৌতুকের আভাস ছিল না।
বীণাপাণি স্বামীর কথায় ও চোখমুখের ভাবে চিন্তিত হইল, বলিল—সেই ব্রেসলেটের বাক্স কোথায় গেল খুঁজে পাচ্ছি না। সন্ধের আগে নেমন্তন্ন খেয়ে এসে দালানের ওপর রেখে গেলাম, তারপর ঘাট থেকে এসে দেখি আর নেই! তুমি সত্যি জানো না? না, জানেনা। সত্যি সত্যি বলো লক্ষ্মীটি!
হরিচরণ লাফাইয়া উঠিল—অ্যাাঁ, বলো কী! ব্রেসলেটের বাক্স পাওয়া যাচ্ছে না? কী সর্বনাশ! অ্যাঁ! সে যে অনেক টাকার জিনিস। আমি কী করে জানব বল, আমি তো এখানে ছিলাম না। আমি কী মিথ্যে বলছি! সেই দুটোর সময় বেরিয়ে গিয়েছি —আমি তো কিছুই জানি না।
বীণাপাণি স্বামীর কথা শুনিয়া বুদ্ধি হারাইল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার মনে হইল— বেলা দুইটার সময় বাহির হইয়া যাওয়ার কথাটা। স্বামী এত জোর করিয়া বলিতেছেন কেন? সে যে তাঁহাকে সন্ধ্যার পর বেড়ার পাশে গাবতলায় বসিয়া কঞ্চি কাটিতে দেখিয়াছে। স্বামীর আস্ফালন ও বিস্ময়ের মধ্যে একটা মিথ্যার ধ্বনি তাহার কানে আসিয়া যেন বাজিতে লাগিল।
