হরিচরণ অত্যন্ত চীৎকার করিয়া হাত-পা নাড়িয়া বলিতে লাগিল—বলো কী! সে তো এক-আধ টাকার জিনিস নয়; তুমিই-বা সেটাকে ফেলে অমন করে যাও কেন? যা সর্বনাশ হয়ে গেল। ভালো করে ঘরদোর খুঁজেছ? চলো দেখি, আমি একবার খুঁজে দেখি। ওসব মেয়েলি খোঁজার কাজ নয়—যাবে কোথায়, ঘরেই কোথাও পড়ে আছে।
বীণাপাণি দালানের মেঝেতে বসিয়া পড়িল। একটা নতুন রকমের ভয় তাহার মনের মধ্যে দেখা দিল। স্বামী মিথ্যা কথা বলিতেছে কেন? বীণাপাণি কখনো স্বামীকে অবিশ্বাস করে নাই—স্বামীর কথা এবারও সে অবিশ্বাস করিত না, যদি সে সন্ধ্যার সময় তাহাকে না-দেখিত। বুদ্ধির দিক হইতে না-হইলেও তাহার নারী হৃদয়ের অনুভূতিশক্তি কেমন করিয়া বুঝিয়া ফেলিল, স্বামী প্রতারণা করিতেছে।
তাহার ভয়টা অস্পষ্ট রকমের। কীসের জন্য এ ভয় তাহা সে বুঝিল না। ব্রেসলেট তো তুচ্ছ—তাহার জন্য এ ভয় নয়। স্বামী মিথ্যা কথা বলিতেছে কেন? তবে কী? কথাটা সে ভাবিতেও পারিল না, কিন্তু মনের মধ্যে সে-কথা স্পষ্টভাবে গ্রহণ করিতে না-পারিলেও একটা মহাযন্ত্রণাকর অনুভূতি মনের কোন গোপন তল হইতে যেন ঘনাইয়া উঠিতে লাগিল। তাহার কোনো নির্দিষ্ট রূপ নাই—তাহা আবছায়ার মতোই অস্পষ্ট, অথচ তীক্ষ্ণ ও কঠিন—রাত্রিশেষের হিমকণার মতো ঠাণ্ডা তাহার গোপন সঞ্চার।
সেই তীক্ষ্ণ শৈত্য ক্রমে ক্রমে তাহার হৃৎপিণ্ডে পোঁছাইয়া সেখানকার উষ্ণ রক্তস্রোতকে যেন জমাট বাঁধাইয়া দিল। তাহার চোখের সামনে হরিচরণ হাঁকডাক করিয়া ঘর তোলপাড় করিতে লাগিল। বাক্সের নীচে, সিন্দুকের নীচে, চৌকির নীচে, এবং তাহা ছাড়া যত অসম্ভব স্থানে খুঁজিতে লাগিল—বীণাপাণি চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। স্বামীকে কী বলিবে? একবার ভাবিল, বলে যে, সে তাহাকে সন্ধ্যার সময় ঘাটে যাইবার পথে দেখিয়াছে—কিন্তু—না, ছিঃ…।
সেদিন তো বটেই, পরের দিনও কাটিয়া গেল। ব্রেসলেটের কোনো সন্ধান হইল না। হরিচরণ বলিতেছে যে সে থানায় গিয়া ডায়েরি করিয়া আসিয়াছে, এখানে বাস করা অসম্ভব হইয়া উঠিল—আর চলে না, ইত্যাদি।
শীতের সেই ঠাণ্ডা রাত্রি ধীরে ধীরে শেষ হইয়া আসিল—ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়া চাঁদের আলো বিছানায় আসিয়া পড়িল। বিবাহের পর হইতে আজ পর্যন্ত যে মধুর অনুভূতি তাহার মনের মধ্যে চিরজাগরিত ছিল, দুঃখে কষ্টে যাহা তাহার নীরব অবলম্বন, জানালার বাহিরের ওই ভোরের জোৎস্নার মতো তাহা ধীরে ধীরে মন হইতে মিলাইয়া যাইতেছে। সংসারের শত অনটনেও মুখে যে হাসি তাহার চিরদিন ফুটিয়া থাকিত, এ কোন নিষ্ঠুর অপহারক তাহার সরল নারী হৃদয়ের সে গোপন ঐশ্বর্য এক মুহূর্তে লুটিয়া লইল! আজ দশ বৎসর ধরিয়া তিল তিল সঞ্চয়ের সে যে অমূল্য রত্নভাণ্ডার!
গাছে গাছে পাখিরা যখন জাগিয়া উঠিয়া কলরব করিতে লাগিল, বীণাপাণি বিছানা হইতে উঠিয়া তখন বাহিরে গেল। সমস্ত রাত না-ঘুমাইয়া তাহার চোখ রাঙা হইয়া উঠিয়াছে। বাঁশগাছের মাথা অন্যদিনের মতো আজও ভোরের হিঙ্গুলরাগে রাঙা, পুকুরের পথে কচি কচি দূর্বাদলে শিশিরের জলের আলো আজও রামধনুর রং ফলাইয়াছে—আসশ্যাওড়ার ঝোপের মাথায় রাঙালতার সাদা ফুলগুলি অন্যদিনের মতোই নব-প্রস্ফুট; কিন্তু পৃথিবীর চেহারা এক রাতেই তাহার কাছে বদলাইয়া গেল কীসে?
সমস্ত দিন কোনোরূপে কাটিল। বীণাপাণির মুখে ব্রেসলেটের সম্বন্ধে এ পর্যন্ত কোনো কথাই আর শোনা যায় নাই। চুপ করিয়া কলের পুতুলের মতো সে সংসারের কাজ একে একে করিয়া গেল। রাত্রে শুইয়া তাহার আর ঘুম হইল না। তাহার সকল নির্ভরতা-ভরা নারীহৃদয় যেন নিষ্ঠুর আঘাতে একেবারে ভাঙিয়া গিয়াছে। সেদিন ভোরে যখন হরিচরণ উঠিল তখনও বীণাপাণি শুইয়া। হরিচরণ কাজে বাহির হইয়া গেল; ফিরিল যখন, দেখিল নিপু রকে বসিয়া কাঁদিতেছে। ঘরের মধ্যে গিয়া দেখিল বীণাপাণি তখনও বিছানায় শুইয়া। স্ত্রীকে গায়ে হাত দিয়া ডাকিতে গিয়া দেখিল তাহার গা জ্বরে পুড়িয়া যাইতেছে। সংজ্ঞা নাই—জ্বরের ঘোরে অঘোর-অচৈতন্য।
হঠাৎ অনুতাপের দংশনে হরিচরণের মন তীব্র বেদনায় ভরিয়া উঠিল। সেদিন সে-ই সন্ধ্যার সময় গহনা চুরি করিয়াছিল নানাদিকে দেনা ও পাওনাদারদের জ্বালায় বিব্রত হইয়া। তাহার পূর্বে কয়েকদিন হইতেই তাহার স্ত্রীর ব্রেসলেটজোড়াটার উপর লোভ হয়; সেদিন সন্ধ্যাবেলা ঘরে ঢুকিয়াই সে দেখিল, দালানের উপর ব্রেসলেটের বাক্স। লোভ সামলাইতে না-পারিয়া সেই ব্রেসলেট চুরি করিয়া রামনারায়ণপুরে এক মাড়োয়ারির দোকানে গিয়া বিক্রয় করিল মোট সাত শত টাকায়! ভাবিয়াছিল, পরে না-হয় একদিন সব প্রকাশ করিবে।
স্ত্রীর মাথার কাছে গিয়া ডাকিল—বউ, ও বউ!
বীণাপাণি চোখ মেলিয়া চাহিল। চোখ জবাফুলের মতো লাল। হরিচরণ পাগলের মতো রামহরি ডাক্তারের বাড়ি ছুটিল। ডাক্তার আসিয়া বলিলেন—জ্বরটা খুব বেশিই হয়েছে, তবে ভয়ের কোনো কারণ নেই। শিশিটা পাঠিয়ে দেবেন, ওষুধ দেব।
সেইদিন বৈকাল হইতে কিন্তু বীণাপাণির অবস্থা খুব খারাপ হইয়া উঠিল। শেষবেলা হইতেই ছটফট করিতে লাগিল। সন্ধ্যার পর হইতে জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকিতে লাগিল—ওগো, আমায় বললে না কেন? মুক্তোর মালাছড়াটা তোমায় এমনিই পরিয়ে দিতুম—আমি তো রাখতে চাইনি—
ডাক্তার বলিলেন—আজকের রাত আর টিকবে কিনা সন্দেহ।
দশ-বারো বৎসর পরের কথা।
