কৃষ্ণলালবাবুর নিজের মেয়ে ছিল না। বন্ধুকন্যাকে শৈশব হইতেই তিনি নিজের কন্যার ন্যায় দেখিতেন। বহুদিন দেশে আসেন নাই—বিদেশ হইতে দেশে আসিবার সময় প্রথমেই তাঁহার বীণাপাণির কথা মনে পড়িল। প্রায় দুই হাজার টাকা খরচ করিয়া দিল্লিতে তিনি বীণার জন্য এই ব্রেসলেটজোড়া প্রস্তুত করাইয়াছিলেন। কৃষ্ণলালবাবু ব্রেসলেটজোড়াটি বীণাপাণিকে দেখাইবার জন্য প্রদীপের সম্মুখে ধরিলেন। ক্ষীণ আলোয় তাহার চারিদিকের পাথরগুলি ঝক ঝক করিয়া উঠিল।
বীণাপাণি ব্রেসলেট দেখিয়া শুধু আশ্চর্য নয়, মুগ্ধ হইয়া গেল; সে এরূপ জিনিস কখনো দেখে নাই। ওগুলি কী জ্বলিতেছে, পাথর? পাথর ওইরকম জ্বলে নাকি?—ওমা! বিস্ময়ে তাহার মুখ দিয়া কথা সরিল না।
কৃষ্ণলালবাবু বলিলেন—দেখি মা, তোর হাত?
বীণাপাণির হাতের সবুজ ও লাল রঙের জার্মানি কাচের চুড়িগুলোকে বিদ্রুপ করিয়া ব্রেসলেটের দামি চুনি, পান্না, হীরা-জহরতগুলি যেন খিল খিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। প্রদীপের আলোক শতভাগে ভাগ করিয়া ব্রেসলেটজোড়া বীণাপাণির হাতে যেন লাল সবুজ নীল আগুনের ফুলকি উড়াইয়া জ্বলিতে লাগিল।
বীণাপাণি নিজের হাতের দিকে চাহিয়া অনেকক্ষণ চোখ ফিরাইতে পারিল না। গহনা আবার এরকম হয় নাকি?
কৃষ্ণলালবাবু বীণাপাণির ভাব দেখিয়া বুঝিলেন যে গহনাটি তাহার পক্ষে অপ্রত্যাশিতরূপে সুন্দর হইয়াছে। ইহাতে তিনি মনে মনে অত্যন্ত খুশি হইলেন। আহা, গরিবের ঘরে পড়িয়া মেয়েটা কত কষ্টই পাইতেছে, তবু এ বুড়া তো তাহাকে একটু আনন্দ দিতে পারিল।
এই সময় হরিচরণ দোকান হইতে ফিরিল। দালানের বাহিরে তাহার আসিবার শব্দ শুনিয়া বীণাপাণি দালান হইতে সরিয়া গেল। একটু পরে সে যখন রান্নাঘরে লুচি ভাজিতে বসিয়াছে, হরিচরণ সেখানে আসিলে বীণাপাণি হাসিতে হাসিতে বলিল—আজ কী দেখাব বলো দিকি?
কৃষ্ণলালবাবু হরিচরণকে গহনার সম্বন্ধে কোনো কথা বলেন নাই, কারণ বলা তাঁহার পক্ষে একটু অশোভন হইত।
হরিচরণ বলিল—কী?
ব্রেসলেট পাইয়া বীণাপাণির আনন্দ আর ধরিতেছিল না। সে ব্রেসলেটটা স্বামীকে দেখাইবার জন্য কেসে পুরিয়া কেসটা রান্নাঘরে আনিয়াছিল। স্বামীর সঙ্গে একটু কৌতুক করিতে ইচ্ছা হইল, বলিল—আচ্ছা, একটুখানি চোখ বুজিয়ে থাক দিকিনি, আমি একটা ভেলকি দেখাব।
হরিচরণ বলিল—কী, শুনি?
বীণাপাণি বলিল—আচ্ছা, বোজাও না একটু চোখ, দেখাচ্ছি।
—আমি পিছন ফিরছি, কী দেখাবে দেখাও।
বীণাপাণি কেস খুলিয়া নিজের হাতে পরিল, তার পর হাসিমুখে বলিল—চেয়ে দেখো এদিকে।
হরিচরণ হঠাৎ চাহিয়া দেখিতেই যেন চমকাইয়া উঠিল। বলিল—কী ও?
বীণাপাণি বলিল—কী বলো দেখি?
হরিচরণ নীচু হইয়া স্ত্রীর হাতের উপর ঝুঁকিয়া পড়িয়া দেখিতে লাগিল। সেও দরিদ্র সন্তান, এরকম জিনিস কখনও দেখে নাই—হাঁ করিয়া অনেকক্ষণ ব্রেসলেট জোড়ার দিকে চাহিয়া রহিল।
বীণাপাণি সকৌতুকে বলিল—কোথায় পেলাম বলো দেখি?
হরিচরণ বলিল—উনি দিলেন বুঝি? দেখি—। তাহার পর ব্রেসলেটের পাথরগুলির উপর সন্দিগ্ধভাবে হাত বুলাইতে বুলাইতে বলিল—এগুলো বোধ হয় কাচ। এরকম কাচবসানো আংটি তো দেখেছি—কলকাতা থেকে হরিগাঁয়ের মেলায় বিক্রি করতে আনে–এর দাম বেশি নয়।
বীণাপাণি বিজ্ঞ জহুরির মতো মুখখানা গম্ভীর করিয়া বলিল—হ্যাঁ, কাচ! এসব পাথর, খুব দামি পাথর।
হরিচরণ বলিল—তুই কী করে জানলি পাথর? তুই পাথর চিনিস?
বীণাপাণি মুখ হইতে বিজ্ঞতার বোঝা ভালো করিয়া না-নামাইয়াই বলিল— জ্যাঠামশায় বললেন যে।
হরিচরণ ব্রেসলেটজোড়া ঘুরাইয়া ফিরাইয়া ভালো করিয়া দেখিল, তারপর বলিল—তা যদি হয়, তাহলেও কিন্তু এর দাম তিনশো’ টাকার এক পয়সা বেশি নয়।
বীণাপাণি সন্দিগ্ধসুরে বলিল—তুমি কী করে বুঝলে? জ্যাঠামশায় যে বললেন পাথরগুলোর দাম খুব বেশি?
হরিচরণ বলিল—ওইরকমই হবে। তিনশো না-হোক, সাড়ে তিনশো-ই হল— তার বেশি আর কত হবে! আজকাল পাথরের দাম কী! আর পাথরেই তো সবজায়গা ছেয়ে ফেলেছে, সোনা আর ওতে কতটুকু আছে!
বীণাপাণির এ কথা বিশ্বাস হইল না। একজোড়া অনন্ত গড়াইতে সে শুনিয়াছে পাঁচশো টাকার বেশি পড়ে, আর একজোড়া দামি পাথর বসানো ব্রেসলেট যে তিনশ টাকায় হইবে, ইহা তাহার আদৌ সম্ভব বলিয়া মনে হইল না।
রাত্রি বেশি হইবার ভয়ে বীণাপাণি খুব শীঘ্র শীঘ্র খাবার প্রস্তুত করিয়া ফেলিল। তারপর জ্যাঠামশায়কে ও স্বামীকে খাওয়াইয়া নিজে খাইয়া শুইতে গেল।
পরদিন ভোরে জ্যাঠামশায় নিপুকে দেখিয়া অত্যন্ত আশ্চর্য হইলেন। সেদিনকার বীণু—তাহার ছেলে অত বড়ো হইয়াছে! সমস্ত সকাল নিপুর সঙ্গছাড়া হইলেন না; দুঃখ করিতে লাগিলেন, বীণুমার খোকা হইয়াছে জানিলে তিনি তাহার জন্য একটা চেন গড়াইয়া আনিতেন।
কলিকাতায় কৃষ্ণলালবাবুর জরুরি কাজ। দুপুরের ট্রেনে রওনা হইবার ইচ্ছা থাকিলেও, বীণাপাণির চোখের জল এড়াইতে না-পারিয়া তিনি বৈকাল পর্যন্ত রহিয়া গেলেন। সন্ধ্যার পূর্বে হরিচরণ তাঁহাকে স্টেশনে পৌঁছাইয়া দিতে গেল।
সাত-আট দিন হইয়া গেল।
বীণাপাণি ব্রেসলেটজোড়া মাত্র বৈকালে কিছুক্ষণের জন্য পরিত, অন্য সময়ে বাসন মাজা, উঠোন ঝাঁট, রান্নাবান্না করা—ইহার মধ্যে কখন সে ব্রেসলেট পরে। ব্রেসলেটজোড়া তাহার কাছে যেন নিত্য নতুন ঠেকিত। প্রদীপের মৃদু আলোয়, নীল-লাল-সবুজ আলো যখন ব্রেসলেটের গা হইতে ঠিকরাইয়া পড়িত, বীণাপাণি মুগ্ধদৃষ্টিতে তাহার দিকে চাহিয়া থাকিত। তাহার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ সুগঠিত হাত দুটিতে ব্রেসলেটজোড়াটি বড়ো সুন্দর মানাইয়াছিল।
