বীণাপাণি একটুখানি হাসিল; সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু শৈশবের সাথি নরুদার কথা মনে পড়ায় তার চোখের পাতা পুনর্বার অশ্রুসিক্ত হইয়া উঠিল। বলিল—নরুদা আমায় একবারটি দেখতে আসে না কেন জ্যাঠামশায়? আপনি গিয়ে একবার পাঠিয়ে দেবেন।
কৃষ্ণলালবাবু বলিলেন—দেব বই কী মা, দেব। তবে এখন তো আসতে পারবে না, এবার যে তার পরীক্ষা কিনা। বি.এ. পরীক্ষা হয়ে গেলে তখন তোকে একবার দেখে যাবে, বলে দেব।
বীণাপাণির মনে পড়িল, রাত হইয়াছে, জ্যাঠামশায়ের আহারাদির বন্দোবস্ত তো করিতে হইবে। সে বলিল—আপনি বসুন জ্যাঠামশায়—
কৃষ্ণালবাবু শশব্যস্তে প্রায় চৌকি হইতে উঠিয়া পড়িয়া বলিলেন—শোন মা, শোন। আমার জন্যে এত রাত্রে কিছু রাঁধতে-টাধতে হবে না। আমি রাত্রে বরং–
বীণাপাণি ঘাড় বাঁকাইয়া জননীর মতো শাসনের সুরে বলিল—আচ্ছা সে হবে, বসুন জ্যাঠামশায়। আমি সে বুঝব।
কৃষ্ণলালবাবু হতাশ হইয়া বসিয়া পড়িলেন। বীণাপাণির বড়ো ইচ্ছা হইল জ্যাঠামশায়কে শীতের রাত্রে গরম গরম লুচি ভাজিয়া খাওয়ায়। কিন্তু পয়সা কই? তাহাতে এখনই তো প্রায় এক টাকা খরচ। সংসারে অসচ্ছলতা যে কতদূর তাহা তো সে জানে। সে রান্নাঘরে গিয়া দেখিল স্বামী উনুনের পাড়ে বসিয়া আপনমনে তামাক টানিতেছে স্ত্রীকে দেখিয়াই হরিচরণ বলিল—তা, কী, ভাত-টাত তো আবার রাঁধতে হবে?
বীণাপাণি বলিল—একটা কথা বলি, রাখবে? জ্যাঠামশায়ের বয়স হয়েছে। আমার কাছে এসেছেন, এ সময় যদি একটু সেবা-যত্ন করতে না-পারব তবে মেয়েজন্ম মিথ্যে নিয়েছিলাম। আমি ভাবছি জ্যাঠামশায়কে খানকতক লুচি ভেজে দিই। তুমি তোমার সেটেলমেন্টের টাকা থেকে একটা টাকা নিয়ে গিয়ে বিপিনের দোকান থেকে জিনিস কিনে নিয়ে এসো না?—আনবে?
হরিচরণ কিছু পূর্বে স্ত্রীর নিকট যে জমিদারগিরির আস্ফালন করিয়াছিল, আসন্ন বিপদের মুখে সে কথা ভুলিয়া গেল। মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল—তা তো আনলে ভালোই হত—মানে আনা তো কিছু উচিত ছিল, কিন্তু হয়েছে কী, এই চব্বিশের মধ্যে টাকা দাখিল না-করলে আবার সার্টিফিকেট জারি হবে। ওই যা জোগাড় করা আছে—তা থেকে—
বীণাপাণি উপায় ঠাওরাইয়া রাখিয়াছিল, বলিল—তুমি তার জন্যে ভেব না, আমার কানের ঘেঁদা ভালো হয়নি, মাকড়ি পরতে বড়ো ব্যথা হয়—আজই খুলে রাখতাম,—তা নিপুর জন্মবার বলে খুলিনি। তুমি ওই থেকে টাকা নিয়ে যাও, কাল সকালে বরং মাকড়ি বাঁধা দিয়ে দুটো টাকা আর কোথাও পাব না? মাকড়ি তো সেই খুলতেই হবে?
ইহার পর আর কোনো প্রতিবাদ করা ভালো দেখায় না বলিয়া হরিচরণ বলিল —তবে একটা বাটি দাও, ঘি-টা আনতে হবে। যাই দেখি—
হরিচরণ চলিয়া গেলে বীণাপাণি দালানে গিয়া দেখিল কৃষ্ণলালবাবু চামড়ার ব্যাগ খুলিয়া কী সব জিনিসপত্র বাহির করিতেছেন। তাহাকে দেখিয়া বলিলেন— মা বীণু, শোন, এদিকে আয়। আমার একটা সাধ তোকে পুরোতে হবে মা।
বীণাপাণি হাসিয়া বলিল—কী জ্যাঠামশায়?
—তুই ছেলেবেলায় আমার কাছে বসে আমার জলখাবার থেকে খাবার তুলে খেতিস তোর মনে আছে? আমি কলকাতা থেকে খাবার এনেছি ব্যাগে করে, তোকে ছেলেবেলার মতো খাওয়াব বলে। আয় এখানে বোস বীণু—তোকে কতদিন খাওয়াইনি! তখন এইসব খাবার খেতে তুই খুব ভালোবাসতিস তোর মনে আছে? আয় মা, এখানে বোস দিকি।
জ্যাঠামশায়ের কথা শুনিয়া বীণাপাণির খুব আমোদ অনুভব হইল। সঙ্গে সঙ্গে মনে হইল, বাপ-জ্যাঠা ভিন্ন কী কেউ মেয়ের কষ্ট বোঝে? সে খাইতে ভালোবাসে সত্য, কিন্তু সেজন্য এখানে তো কেউ কোনোদিন তাহাকে আদর করিয়া ভালো কিছু খাইতে দেয় নাই, পূর্বে তো তাহার শ্বশুর-শাশুড়ি বর্তমান ছিলেন। আর জ্যাঠামশায় আজ কলিকাতা হইতে ব্যাগে বহিয়া খাবার আনিয়াছেন তাহাকে খাওয়াইবার জন্য! শুধু যত্ন ও স্নেহ দান করিতে করিতে তার মনটি যে গৃহিণী ও জননীর প্রবীণত্বে উপনীত হইতেছিল, আজ এই প্রৌঢ়ের সংস্পর্শে তাহার সে মনটি আবার দশ বৎসরের ছোটো মেয়ের মতো হইয়া গেল। তাহার পর তাহার ঘুমন্ত খোকা নিপুর কথা মনে পড়িল—সেও খাবার খাইতে ভালোবাসে। এ পর্যন্ত জ্যাঠামশায় নিপুর কথা কিছু বলেন নাই, বোধ হয় তাহার কথা তিনি জানেন না—জানিলে নিশ্চয় তাহার কথা জিজ্ঞাসা করিতেন। নিজে বলিতে তাহার লজ্জা করিতে লাগিল।
বীণাপাণি আসিয়া জ্যাঠামশায়ের কাছে গিয়া বসিল। কৃষ্ণলালবাবু আহ্বাদে আত্মবিস্মৃত প্রায় হইলেন। বাম হাতে বীণাপাণির মাথার চুলগুলির মধ্যে আঙুল চালাইতে চালাইতে তিনি তাহাকে খাবার খাওয়াইতে লাগিলেন। স্নেহ-মায়ায় তাঁহার মন পরিপূর্ণ হইয়া গেল। তিনি বলিতে লাগিলেন—মা বীণু, সেই তুই ছেলেবেলায় আমার জলখাবার থেকে জোর করে টপ টপ খাবার তুলে খেতিস, তোর মনে আছে কী? তখন তুই খুব ছোটো। মা আমার কত রোগা হয়ে গিয়েছে (এ কথা সত্য নহে, কারণ বীণাপাণি পূর্বাপেক্ষা বরং সুস্থই ছিল)—আজ যদি রাম থাকত! এইটে খেয়ে দেখ মা, একে রাজভোগ বলে—এ তুই কখনো খাসনি, এ কলকাতা ছাড়া সবজায়গায় বড়ো একটা মেলে না। কেমন, ভালো নয়?
বীণাপাণির মনে হইল নিপু কখনো রাজভোগ খায় নাই। সে খাইতে খাইতে নতমুখে ঘাড় নাড়িল।
আরও কিছু খাইবার পর বীণাপাণি বলিল—জ্যাঠামশায়, আর কত খাব?
—আচ্ছা, এই অমৃতিখানা শুধু খা। আর খাবারগুলো তুলে রেখে দে, জামাইকে। তারপর বলিলেন—একটু দাঁড়া, এই দেখ দিকি, এই ব্রেসলেট জোড়াটা তোর জন্যে গড়িয়েছি মা, দেখ দিকি, হাতে হবে তো?
