হরিচরণ শঙ্কিত হইল। পূর্বেও যে আঘাতের শব্দ সে না-শুনিয়াছিল এমন নহে। কিন্তু এই শুনিতে না-পাওয়ার ভান করিবার মূলে একটু প্রত্নতত্ব নিহিত আছে। আজ তিন বৎসর পূর্বে ঠিক এই পৌঁষ মাসেই সে রামনারায়ণপুরের হাটে এক কাবুলি আলোয়ান বিক্রেতার নিকট ধারে দশ টাকা মূল্যের একটা আলোয়ান খরিদ করিয়াছিল। হতভাগ্য কাবুলিওয়ালা দুই-বৎসর যাবৎ হাঁটাহাঁটি করিয়াও এ পর্যন্ত টাকা পাওয়া তো দূরের কথা, হরিচরণের সাক্ষাৎ পর্যন্ত পায় নাই। হরিচরণ শঙ্কিত চিত্তে সামনের উঠানে গেল। সেই কাবুলিওয়ালাটা এত রাত্রে আসে নাই তো! – বিচিত্র কী! সঙ্গে কী সে তাহার দুই একজন দেশভ্রাতাদের আনিয়াছে? তাহা হইলে উপায়?
সন্তর্পণে বাহির-বাটীর দরজার নিকট যাইতে যাইতে হরিচরণ শুনিতে পাইল দরজার বাহির হইতে বাংলায় কে উচ্চৈঃস্বরে বলিতেছে—”রায় মশায় কী বাড়ি আছেন?” যাক বাঁচা গেল। তাহা হইলে কাবুলিওয়ালাটা নয়।
হরিচরণ খিল খুলিয়া দিল। দেখিল বাহিরে একজন অপরিচিত ভদ্রবেশী প্রৌঢ় দাঁড়াইয়া।
প্রৌঢ় জিজ্ঞাসা করিলেন—এইটেই কী হরিচরণ রায়মশায়ের বাড়ি?
হরিচরণ বলিল—আজ্ঞে আমারই নাম।
প্রৌঢ় বলিলেন—তা বেশ।
বড়ো সন্তুষ্ট হলাম। আমি আসছি কলকাতা থেকে —এই ট্রেনেই আসছি। তোমার শ্বশুর রামজীবনবাবু আমার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। তাঁর ওখানে একসময় আমার খুব যাতায়াত ছিল। তবে এখন আমিও বাইরে বাইরে থাকি, এইজন্যে ততটা আর—। তা বেশ বেশ, বড়ো সন্তুষ্ট হলাম বাবাজীবনকে দেখে। বীণা এখানেই আছে তো?
হরিচরণ বলিল—আজ্ঞে হ্যাঁ, তা আসুন বাড়ির মধ্যে।
মুখে অভ্যর্থনা করিলেও মনে মনে সে অত্যন্ত চটিয়া গেল। দিব্য শীতের রাত্রে স্ত্রীর সহিত গল্প জমাইয়া আনিয়াছিল, তা নয়, এখন আবার রাঁধো ভাত, নিয়ে এসো জলখাবার—কোথায়ই বা পিঠা, আর কোথায় বা কি! শ্বশুরগিরি ফলাবার আর সময় পেলেন না। এর চেয়ে সে কাবুলিওয়ালাও যে ছিল ভালো। নাঃ–এইসব দুবৃত্তের জন্য দুনিয়ায় আর সুখশান্তি নাই।
প্রৌঢ় বলিলেন—বাবাজি, তোমার শ্বশুরের সঙ্গে আমার হরিহরাত্মা ছিল। আমার নাম শুনেছ কিনা জানি না—আমার নাম কৃষ্ণলাল গাঙ্গুলী। ছেলেবেলা থেকে বন্ধুত্ব—তার ছেলেপিলে সব আমার কোলেপিঠে মানুষ। তোমার যখন বিয়ে হয় তখন আমি লাহোরে চাকরি করি, কাজেই আসতে পারিনি। আহা, ছোকরা অল্প বয়সেই মারা গেল। সবই ভবিতব্য।
হরিচরণের বাড়ির দালান ছিল নিতান্ত ছোটো; পৈতৃক আমলের বাড়ি, অনেকদিন মেরামত হয় নাই। জানালার কবাট খুলিয়া পড়িয়াছে, কোনো-কোনোটি নারিকেলের ছোবড়ার দড়ি দিয়া গরাদের সহিত বাঁধা। হরিচরণ কৃষ্ণলালবাবুকে দালানে একটা ছোটো টুলের উপর বসাইয়া বলিল—বসুন, আমি বাড়ির মধ্যে বলি।
কৃষ্ণলালবাবু বসিয়া দেখিলেন, দালানের দরজা-জানালা একটাও ভালো অবস্থায় নাই। সবগুলির ফাঁক দিয়াই হু-হু করিয়া হিম আসিতেছে। বন্ধুর এ কন্যাটি সকলের ছোটো, তিনটি মেয়ের বিবাহ দিবার পর সর্বস্বান্ত হইয়া তাহার বিবাহ দেন। সে যে ভালো পাত্রে পড়ে নাই তাহা তিনি জানিতেন। কৃষ্ণলালবাবু মনে মনে কষ্ট অনুভব করিলেন।
মিনিট চার-পাঁচ পরে উত্তরদিকের দরজা ঠেলিয়া বীণাপাণি দালানে প্রবেশ করিল।
কৃষ্ণলালবাবু তাড়াতাড়ি চৌকি ছাড়িয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন—এসো এসো, বীণু মা আমার, এসো। ওঃ, সেই তোর বিয়ের আগে মা—তখন আমি
বীণাপাণি গলায় আঁচল দিয়া কৃষ্ণলালবাবুকে প্রণাম করিল। কৃষ্ণলালবাবু তাহার হাত ধরিয়া তুলিলেন—এসো এসো, সাবিত্রী-সমান হও মা। দেখি মা বীণু মুখখানা তোর, কতদিন দেখিনি।
বীণাপাণির মাতাপিতা কেহ ছিল না। বাপের বাড়ি ভাইয়েরা থাকিলেও পিতার মৃত্যুর পর তাহারা বড়ো খোঁজখবর করিত না। আজ পাঁচ-ছয় বৎসর সে বাপেরবাড়ি যায় নাই বা বাপেরবাড়ির কাহাকেও দেখে নাই। নির্জনে তাহার মায়ের মুখ মনে পড়িত, বাপের মুখ মনে পড়িত, শৈশবের সাথিদের মুখ মনে পড়িত, উঠানের বকুলতলায় সেঁজুতি ব্রতের কথা মনে পড়িত। তার বিরহী প্রাণটি পুকুরের ঘাটের চালতাতলায়, শত শৈশবের স্মৃতিভরা তাহাদের পাড়ার ধুলামাটির পথে পথে, সেই বকুলফুলের বুকে মুখ লুকাইয়া মনের সমস্ত দুঃখকষ্ট উজাড় করিয়া দিত—অসহ্য তৃষ্ণায়। ভাইয়েরা তাহার খোঁজও করে না। সে ভাবিত, আজ মা-বাপ বাঁচিয়া থাকিলে কী তাহাকে এরূপ করিয়া ফেলিয়া থাকিতে পারিতেন? হাজার হউক মেয়েমানুষ—অনেকদিন পরে পিতৃসম পিতৃবন্ধুকে পাইয়া তাহার সেই অভিমানই সকলের চেয়ে প্রবল হইয়া উঠিল। ডাগর চক্ষুদুটি ছাপাইয়া চোখের জল ঝরঝর করিয়া গড়াইয়া পড়িল।
কৃষ্ণলালবাবু তাড়াতাড়ি কোঁচার খুঁট দিয়া তাহার চোখের জল মুছাইয়া দিতে দিতে সান্ত্বনা দিতে লাগিলেন—ছিঃ বীণু, মা আমার—কেঁদো না। কাঁদে কী মা: ছিঃ!
বীণাপাণি আঁচলে চোখ মুছিতে মুছিতে কাঁদো-কাঁদো সুরে বলিল—এতদিন কোথায় ছিলেন জ্যাঠামশায়?
—আমি তো লাহোরে ছিলাম অনেকদিন। তারপরে দেশে এসে সব শুনলাম। তোর বিয়ের সময়ও আমি চিঠি পেয়েছিলাম বটে, কিন্তু আসতে পারলাম না। বড়ো জরুরি কাজ পড়ে গেল। এই তো সেদিনকার কথা—
—নরুদা ভালো আছে জ্যাঠামশায়?
—নরু ভালো আছে, পড়ছে। এবার বি.এ. পরীক্ষা দেবে।
—আমার কথা বলে নরুদা?
—বলে না মা! খুব বলে। তার নিজের বোন নেই, তোকেই বোনের মতো ছেলেবেলা থেকে জানে। ছেলেবেলা খেলা হতে হতে তুই একবার ঝগড়া করে নরুর মুখ আঁচড়ে দিয়েছিলি, তোর মনে আছে বীণু?
