পৌঁষ মাস। খুব শীত। সন্ধ্যার সময় এক দূর প্রজাবাড়ি হইতে খাজনা আদায় করিয়া হরিচরণ বাড়ি ফিরিয়া আসিল। স্ত্রী বীণাপাণি উঠানের তুলসীতলায় সন্ধ্যা দিতেছিল, স্বামীকে আসিতে দেখিয়া তাড়াতাড়ি তুলসীতলায় প্রণাম সারিয়া, হাসিমুখে কাছে আসিয়া বলিল—তবে যে বলা হল ফিরতে অনেক রাত হবে? আমি এখনও ডাল বাটিনি।
হরিচরণ হাতের পুটুলি নামাইতে নামাইতে বলিল—এলাম চলে। খাজনা তো এক পয়সাও দেবে না, মিথ্যে হয়রান হওয়া।
বীণাপাণি হাতের প্রদীপ নামাইয়া রাখিয়া বলিল—একটু দাঁড়াও, আমি কুয়ো থেকে টাটকা জল তুলে দি, তবুও একটু গরম হবে এখন। এবার যে শীত পড়ল তাতে পুকুরের জলে আর কাজ চলবে না।
হরিচরণের ছেলে নীপু বাবার গলার স্বর পাইয়া ঘরের মধ্য হইতে বাহির হইয়া আসিল। মাকে নিশ্চিন্তমনে তুলসীতলায় প্রদীপ দিতে দেখিয়া সে ঘরের মধ্যে তাকের হাঁড়ি হইতে আমসত্ব চুরির কাজে ব্যাপৃত ছিল। বাবার গলার স্বরে বুঝিল বিপক্ষ সজাগ হইয়াছে। সে ক্ষুগ্নমনে বাহির হইয়া আসিয়া বাবার বড়ো পুটুলিটা দেখিয়া হঠাৎ নিজের অসাফল্যের দুঃখটা ভুলিয়া গেল। বাবাকে সে একটু ভয় করিত। হঠাৎ কাছে না-আসিয়া আঙুল দিয়া পুটুলিটা দেখাইয়া জিজ্ঞাসা করিল— কী বাবা এতে?
হরিচরণ বলিল—হ্যাঁরে, এই বাঁদর, এই শীতে একটা কিছু গায়ে দিতে নেই তোর? ওগো, নীপুর সে দোলাইখানা কোথায় গেল?
বীণাপাণি জলের বালতি নামাইয়া বলিল—সেই বিকেলবেলা থেকে বলছি ছেলেকে, ও কী কারুর কথা শোনে! গায়ে দিয়ে দিলেও গায়ে রাখবে না। ওই তো, কাঠের আলনায় দোলাই রয়েছে।
হরিচরণ বলিল—হুঁ! সে বেতখানা কোথায় গেল?
নীপু প্রমাদ গণিয়া মার মুখের দিকে চাহিল। বীণাপাণি বলিল—থাক গো, আজ আর কিছু বলো না। তারপর ছেলেকে কাছে টানিয়া বলিল—এবার ফের কিন্তু যেদিন—
এক ঘণ্টা পরে দেখা গেল বীণাপাণি রান্নাঘরে বসিয়া ডাল বাটিয়া কী একটা পিঠা তৈয়ারির জোগাড় করিতেছে, বাহিরের কনকনে শীত হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য হরিচরণ উনানের পাশে বসিয়া তামাক টানিতেছে ও স্ত্রীর সহিত খোশগল্প করিয়া সমস্ত দিনের শ্রম নিবারণের চেষ্টা করিতেছে। নীপু ঘুমাইয়া পড়িয়াছে।
বীণাপাণি ভুলই শুনুক কী যাই হোক, স্বামী বাহির হইয়া যাইবার সময় সে শুনিয়াছিল তাঁহার ফিরিতে রাত হইবে, কাজেই যে ডাল পূর্বে বাটা উচিত ছিল তাহা সে এখন বাটিতে বসিয়াছে। ইহার পর কখন কী হইবে? বীণাপাণি অত্যন্ত অপ্রতিভ হইয়া তাড়াতাড়ি বাটিতে লাগিল।
হরিচরণ ভালো করিয়া এক কলিকা তামাক সাজিতে সাজিতে বলিল—অত করে তাড়াতাড়ি করছিস কেন রে? না হয় একটু রাতই হবে এখন। এই তো সবে সন্ধে, শেষে আঙুল-টাঙুল ঘেঁচে ফেলবি?
নিতান্ত ঘরোয় লোক হরিচরণের স্ত্রীর সহিত সম্ভাষণের রীতি এই রকমই। অবশ্য ছেলেপিলের সম্মুখে এবং বাহিরের লোকের কাছে সম্ভাষণের অন্য রীতি আছে। এটা নির্জনের একটু গাঢ় রকমের আদরের ডাক।
বীণাপাণি হাসিয়া বলিল—কেন? আঙুল কী রোজই হেঁচি নাকি?
বীণাপাণি দেখিতে মন্দ নহে—রংটি খুব ফরসা না-হইলেও উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, মুখের গড়নটি বেশ সুন্দর, চোখদুটিও ডাগর ডাগর। পাড়াগাঁয়ের গৃহস্থবন্ধু, কাজকর্মে থাকে বলিয়া শরীরেও বেশ নিটোল স্বাস্থ্য।
হরিচরণ তামাক টানিতে টানিতে বলিল—না, সত্যি বউ, দেখ কতদিন ভাবছি একজোড়া ভালোরকম অনন্ত তোকে গড়িয়ে দেব, তা ‘এই হবে’ ‘এই হবে’ করে-বুঝলি না?
বীণাপাণি একটুখানি হাসিয়া মুখ নীচু করিল। সে বিবাহের পর প্রথম শ্বশুরবাড়ি আসিয়া আজ দশ বৎসর ধরিয়া এ কথা শুনিয়া আসিতেছে। একজোড়া সোনার অনন্ত গড়াইয়া দেওয়া যে তাহার দরিদ্র স্বামীর পক্ষে কতটা অসম্ভব, তাহা সে বুঝিত। স্বামীকে একটু ভুলাইবার জন্য সমদুঃখে বলিল—তা এবার তো হয়েও যেত; ওই সেটেলমেন্টের খরচা দিতেই তো অনেকটা বেরিয়ে গেল।
হরিচরণের সামান্য যাহা কিছু জমিজমা ছিল, এবার সেটেলমেন্টের খরচ বাবদ তাহার দরুন গভর্নমেন্টের লোককে ত্রিশ টাকা দিতে হইয়াছিল। সে কিন্তু স্ত্রীর কাছে, ও যেসব লোকে জমিজমার ধার ধারে না তাহাদের নিকট প্রচার করিয়া বেড়াইত যে, তাহার পৈতৃক অনেক জমি লোকে ফাঁকি দিয়া খাইত, এখন সেটেলমেন্টে সেগুলি সে ফিরিয়া পাইয়াছে, প্রায় ‘শদাবধি’ টাকা এজন্য তাহাকে খরচা দিতে হইয়াছে, সেটেলমেন্টের ক্যাম্পে তাহার খুব খাতির হইয়াছে ইত্যাদি। স্ত্রীর চোখে বড়ো হইতে সকলেই চাহে।
স্ত্রীর মুখে সেটেলমেন্টের কথা শুনিয়া হরিচরণ আরম্ভ করিল–দেখ সেদিন তো ক্যাম্পে গেলাম। আমাদের গাঁয়ের অনেক সব বড়ো বড়ো (হরিচরণ আঙুল দেখাইল)—হুঁ হুঁডেকে জিজ্ঞাসাও করলে না কানুনগো। আমি যেতেমাত্রই কানুনগো একেবারে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, বললে, “আসুন জমিদার মশায়, আসুন!” সাতবেড়ের দরুন সেই জমার যে কাগজপত্র গোলমাল হয়েছিল, বুঝলি তো—তা বলতেই কানুনগো মুহুরিদের সব বকে উঠল, বললে—”রায় মশায়, আমি না-থাকলেই এরা সব গোলমাল করে ফেলে; আপনি বসুন, আমি বন্দোবস্ত করে দিচ্ছি।”—সে খাতির কী!
স্ত্রীর ডাগর চোখের প্রশংসমান দৃষ্টিতে উৎসাহিত হইয়া হরিচরণ অধিকতর ভিত্তিহীন কী একটা ফাঁদিতে যাইতেছিল, এমন সময় তাহাদের বাহিরের বাড়ির সদর দরজায় কে যেন ঘা দিতেছে শোনা গেল।
বীণাপাণি বলিল—ওগো, দরজায় কে যেন ঘা দেয়।
হরিচরণ বলিল—কই না, এত রাত্রে কে ঘা দেবে? সঙ্গে সঙ্গে পুনরায় আঘাতের শব্দ ও কার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। বীণাপাণি বলিল—ওই যে কে ডাকছে, দেখো না একবার?
