আরে!—লাড়ু চমৎকৃত হয়ে বলে, তুই তো শেয়ানা মাল আছিস রে।
হল কাঁপিয়ে উল্লাসে সিটি দেয় লাড়ু। অন্যরা প্রতিধবনি করে। আসল কথাটা বুঝেই অবশ্য, একটা শেয়াল ডেকে উঠলে যেখানে যত শেয়াল আছে ডেকে ওঠে, সেই নিয়মে।
নিজের বুদ্ধিবৃত্তির এ হেন তারিফে মাটিতে পা পড়ে না জলির। রীতা বউদির মুখখানা মনে পড়ে। তার মুখ ঝামটা খেয়ে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা মেরে গিয়েছিল! হু, দুখানা খবরের কাগজ মুখস্ত করলেই যদি বুদ্ধি হয়ে যেত, তাহলে আর ভাবনা ছিল না। জলিকে নাকি ঠকিয়ে নেবে! অত সস্তা!
লাড্ড থেকে, পিন্টু থেকে ক্রমশ নন্দীর বাগান, পিরতলা, ঘুসুড়ি, পর্যন্ত সারা তল্লাটের অনেকের জানা হয়ে যায়—কীসে জলি মাধুরী দীক্ষিতের কতটা পাওয়া যায়। জলি হল গিয়ে গরিব লোকেদের মাধুরী দীক্ষিত। আর সেই হিসেবে, এখন জলির তোরঙ্গে ওনলি ভিমল আর প্রফুল জমতে থাকে, জমতে থাকে নেল এনামেল, লিপস্টিক, লিকুইড মেকাপ, কাজল, ব্লাশার, হাজারো রঙের বিন্দি আর কাচ-মেটালের চুড়ি, সেন্ট, রুমাল, ব্রা, প্যান্টি, ঘাগরা চোলি, জরির কাজ করা শলমাচুমকির কাজ করা চুড়িদার, শ্যাম্পু, ফরসা হবার রকম রকম ক্রিম।
কমলা, তার মা বলে, এত কিনছিস? জলি এসব তো বেশ দামি রে!
দামি কিনব না তত সস্তা কিনব?
না, তাই বলচি, বোনেদেরও একটু আধটু দে। আহা মুখ শুকিয়ে থাকে। চেয়ার বেঁধে বেঁধে হাতে কড়া।
অবহেলাভরে জলি পূজা-পিঙ্কির কাছ থেকে পাওয়া চুড়িদার-ফুড়িদারগুলো রিক্তা-টিংকুকে দিয়ে দেয়। ক্ষয়া লিপস্টিক, জমে যাওয়া কমপ্যাক্ট—তা-ও দেয়।
এখন, লাড়ু-পিন্টুদের আওতা যে সে ক্রমেই ছাড়িয়ে যাচ্ছে এটা লাডুরা প্রথমটায় বোঝেনি। কিন্তু একদিন পিলখানার ফলের কারবারি মোয়াজ্জমের সঙ্গে ধর্মতলার হিন্দ-সিনেমায়, আর একদিন বাঁধাঘাটের তুলোর দোকানের কুঁড়িয়াল ভজুবাবুর সঙ্গে কাফে ডি মনিকোয় তাকে এরা আবিষ্কার করে ফেলল। আর তখনই শুরু হয়ে গেল বখেভা। এ পাড়ার সঙ্গে ও পাড়ার, এ তল্লাটের সঙ্গে ও তল্লাটের। এরা বলে জলি আমাদের মাধুরী দীক্ষিত ওকে আমরা একা চাখব, ওরা বলে জলি আমাদের রোবিনা ট্যান্ডন ওকে আমরা একা চাটব। এরা বলে জলি আমাদের মিস ইউনিভার্স, ও আমাদের সঙ্গে নাচবে, ওরা বলে খবর্দার জলি আমাদের মিস ওয়ার্ল্ড, ওর সঙ্গে নাচার হক খালি আমাদের, আমাদের আমাদের।
প্রথমটা ঝগড়া শুরু হয়েছিল খিস্তাখিস্তি দিয়ে। তারপর ক্রমে ঘুষোঘুষি, লাঠালাঠি, পাইপগান, সাইকেলের চেন, তারপর বোমবাজি। দুটো চারটে লাশ পড়ে গেল, কয়েক জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, কয়েকজন গুরুতররূপে আহত। পুলিশ এল। কয়েকটাকে রুলের গুঁতো দিয়ে কয়েদে পুরল, কয়েকটাকে আবার নেতৃ-ফোন পেয়ে চটপট ছেড়েও দিল। লাশগুলো বেশির ভাগই মর্গে পচতে লাগল, কেননা ডোম ফোমদের সঙ্গে বড়ো করে কে সেসব ছাড়ায়। যাঃ, যা খুশি কর গে যা। আর ইতিমধ্যে একদিন কমলামাসি এসে রীতা বউদিদির কাছে কেঁদে পড়ল, ও বউদিদি গো, আমার জলিকে তুলে নিয়ে গেচে গো-ও-ও! কিছু করো, কিছু একটা উপায় করো বউদিদি!
কে তুলে নিয়ে গেল? পুলিশ?
না বউদিদি, অন্য কেউ, চুপচাপ কখন তুলে নিয়ে গেছে টেরটি পাইনি।
খুবই রাগ রীতা বউদি অশোক দাদাবাবুর। হাতের ছাত্রী ফসকে গেলে কার না রাগ হয়! তবু মানুষটা বিপদে পড়েছে, অনেক দিনের লোক। আর সত্যি, ওর তো কোনো দোষ নেই। পাঁচ বাড়ি কাজ করে বেড়ায়, কখন আর সে মেয়ের ওপর নজর রাখবে, মেয়ে বিগড়ে গেলেই বা সে করবেটা কী! তবু মায়ের প্রাণ তো! অতএব দাদা-বউদিদি কমলামাসিকে সঙ্গে করে পুলিশে ডায়েরি করে আসে। খরচ-খরচা করে কাগজে বিজ্ঞাপন দেয়, ধরা পড়া করে টিভিতেও বলায়। ছবি আর কোথায় পাবে? শুধু বিবরণ। দৈর্ঘ্য-পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, লাল চুড়িদার, বয়স পনেরো-ষোলো, জলি দাস। সন্ধান পেলে… ইত্যাদি ইত্যাদি।
টিঙ্কু আর রিক্তা কিন্তু তালে ছিল। মা যখন দোরে দোরে হা জলি যো জলি করতে করতে ঘুরে মরছে, তখন দুই বোন চোখে চোখে তাকায়, পরিষ্কার ইশারা। তক্তপোশের তলা থেকে জলির তোরঙ্গটি তারা টেনে বের করে, এর ভেতরেই তাদের আলিবাবার রত্নভাণ্ডার। কোনটা আগে পরবে আর কোনটা পরে পরবে ঠিকঠাক অর্ডারটা ঠিক করতে না পেরে দুই বোনেরই গা শিরশির করতে থাকে। ডালা কিন্তু সহজেই খুলে যায়। তালাই ছিল না। ও মা! এ যে ফক্কা! কিচ্ছুটি নেই। ভিমল হাপিস, পাউডার, ক্রিম, কাজল, সেন্ট, রুজ, লিপস্টিক, সায়া-ব্লাউজ, চুড়িদার, মায় বিন্দি আর হেয়ারক্লিপগুলো পর্যন্ত হাপিস। ভ্যাবাচ্যাকা মেরে থাকে দুজনে। যারা জলিকে তুলে নিয়ে গেল, তারা কি জলির তোরঙ্গের মালও তুলে নিয়ে গেল? যা বাববা! কী করে! কখন?
আসলে, জলিকে তো কেউ তুলে নিয়েই যায়নি! জলি নিজেই নিজেকে সুযোগমতো তুলে নিয়েছে। তার সামনে এখন সিনেমা-রঙা ঝিলিমিলি পথ। সে পথ দিয়ে কত মেয়ের মেলা, তাদের জন্যে কত জিনিস! ফরসা, আরও ফরসা, আরও আরও ফরসা। আরও হেয়ার স্টাইল, আরও হেয়ার স্টাইল, এখন জলিও তো…..। জলিও তো কী! মাস্টার হবে? সরকারি চাকুরে হবে? স্বাধীন ব্যবসাজীবী হবে? আই.এ.এস, হবে? নাকি হবে পাইলট বা খেলোয়াড়? না, এ সব না, এখন ইচ্ছে করলেই জরি-চিকমিক চুমকি-ঝিকমিক সিকি পোশাকে জলি আপামর ব্যাটাছেলে সাধারণের লেহ্য হয়ে উঠতে পারে। রিক্তা-টিঙ্কুদের ঈর্ষা, জলিদের গৌরব।
