মাথাটা খুব যন্তননা করছিল—কাতর মুখে জলি বলে দেয়, বাস। মারোয়াড়িদের কাজগুলোয় ভালোমতো বসে গেলে সে রীতা বউদিদের কাজটা ছেড়ে দেবে। মাকে বলাবলির দরকার নেই। খামখা ব্যাগড়া দেবে। অ্যাদ্দিনের বাড়ি, আমাদের বিপদ-আপদে বুক দিয়ে করেছে। একটু মাইনে কম ঠিকই কিন্তু খাটুনিও কম, ব্যবহার ভালো। তো ব্যবহার নিয়ে কি জলি ধুয়ে খাবে? আর ব্যবহার না আরও কিছু ভুলিয়ে ভালিয়ে হোমিয়োপ্যাথিকের গুলি খাইয়ে, অ্যাত করলুম, ত্যাত-করলুম…কিনে রেখেছে নাকি!
কী রে? কাল এলি না। আজও এত বেলা…অসুখবিসুখ না কী?
ভুরু কুঁচকে রীতা বউদি বলল।
সাত সক্কালে কু গাইছে দেখো। অসুকবিসুখ তার হতে যাবে কেন? শত্তুরের হোক! অসুক-বিসুক ছাড়া কি তোদের লোকজন ছুটি পেতে পারে না?
শরীরটা ঢিসঢিস করছিল বউদি—সে ব্যাজার মুখে বলে।
হ্যাঁরে শুনছি নাকি তুই ওই মাল্টিস্টোরিড-এ কাজ নিয়েছিস?
কে বললে?
যে-ই বলুক। কথাটা কি সত্যি?
কেন? ওদের বাড়ি কি আমাদের কাজ করা মানা?
তা কেন? কিন্তু তুই অলরেডি আমার, বিপিন জ্যাঠার ওখানে, সাহা বাড়িতে কাজ করছিস। এর ওপরে আরও কাজ নিলে, শরীর তো টিসটিস করবেই। এত লোভ করিস না।
লোভ?—ফোঁস করে উঠল জলি—ভালো খেতে, ভালো পরতে আমাদের বুঝি শখ সাধ হতে নেই? খাটব, খাব, তা-ও পারব না? সবই তোমাদের একচেটে?
অমন করে কথা বলছিস কেন জলি? তুই তো আগে এমন ছিলি না। কোত্থেকে এসব শিখে আসছিস?
তুমিই আমাকে যা শেখাবার শিখিয়েচ বউদি, আর কেউ অমন যেচে পড়ে আমার উপকার করতে যায়নি।
ঠিক, ঠিক বলেছিস। আমি তোর উপকার করতে গিয়েছিলুম। তাই তুই ভালো করে দক্ষিণা দিচ্ছিস।
মুখখানা আষাঢ়ে মেঘের মতো, থমথম করছে একেবারে। কী রে বাবা? কাঁদবে নাকি? ঘরগুলো ঝটপাট দিয়ে চলে যা জলি। বাসন আমি মেজে নিয়েছি। এক্ষুনি বেরোব।… রীতা বউদি ঝটকা মেরে চলে গেল।
এর ঠিক তিনদিন পরে রীতা বউদির বাড়ির কাজটা ছেড়ে দিল জলি। সে কি আর বলে করে ছেড়েছে? দূর! যায়নি! একদিন, দুদিন, তিনদিন স্রেফ ডুব মেরে দিয়েছে। এদিকে অন্য বাড়িগুলোতে ঠিকই আসা-যাওয়া করছে। এর থেকে বোঝা যা বোববার।
বুড়োই বললে চারদিনের দিন, হ্যাঁ রে জলি, রীতা বউমাদের বাড়ি যাচ্ছিস না? আমার কাছে সে খোঁজ করতে এসেছিল! জলি গম্ভীরভাবে বলল, ছেড়ে দিয়েছি।
সে কী! বলা নেই, কওয়া নেই…
বলতে কইতে গেলে ফালতু এক কাঁড়ি কথা শুনতে হবে দাদু।
তাই বলে…-বউটা বড়ো ভালো রে…ওকে ভোগাচ্ছিস?
দেখো দাদু, প্রেশার কুকার নামাতে নামাতে জলি বলে, কে ভালো কে মন্দ অতশত জানি না, পোষাচ্ছে না, ছেড়ে দিয়েছি, বাস।
বুড়ো আর কিছু বলল না।
হাতে পয়সা এসেছে, ভালো পয়সা। এখন নিয়ম করে পাল্লারে যাচ্ছে জলি। কদিন পরেই চুলটা ঝপ করে কেটে ফেলল, একে বলে স্টেপ-কাট। পাল্লারের ঝকঝকে আয়নায় নিজেকে দেখে নিজেই চিনতে পারে না জলি। রুমুঝুমু চুল। বাঁকানো ধনুকের মতো ভুরু। বিলিচ করে মুখটা ফরসা চকচকে লাগছে। পূজা দেওরার জর্জেটের চুড়িদার কামিজ পরে শ্যাম্পু করা চুল ঝাঁকিয়ে, লাল টুকটুকে লিপস্টিক লাগিয়ে, হাত ভরতি লাল-সোনালি কাচের চুড়ি ঝমঝমিয়ে জলি চন্দ্রলোক থেকে আসছে। আবার পিঙ্কি দেওরার লাহেঙ্গা চোলি পরে ফ্রস্টেড লিপস্টিক লাগিয়ে বেগুনি চুড়ি ঝমঝমিয়ে জলি চন্দ্রলোকে যাচ্ছে।
জলি কত মাইনে পায় তার মা বোনেরা জানে না। আগে যে টাকাটা পেত সেটাই সে মাস গেলে মাকে ফেলে দেয়, বলে—বাকিটা আমার, আমি যা খুশি করব, একটা কথা বলতে পাবে না।
রিক্তা জুলজুল করে তার ভুরু দেখে, কত নিল রে?
আট টাকা।
আর চুল?
তোর অত খোঁজে দরকার কী? তোর টাকা?
শুধু বোনেরাই নয়, পাড়ার মস্তানরাও তাকে লক্ষ করেছে। পিন্টু কোন কারখানায় লেদের কাজ করে, চুল ফাঁপিয়ে, হাতে বালা পরে চলে, একদিন বললে, এ জলি! সিনেমা যাবি নাকি?
কী সিনেমা?
মোহরা। ফাস্টো কেলাস রে…তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত…আধ-গাওয়া গেয়েই দিল পিন্টু তাকে লক্ষ করে।
পাত্তা দিল না জলি, কী খাওয়াবি?
ঝালমুড়ি।
আইসক্রিম খাওয়াস তো যাব। পেস্তা-আইসক্রিম।
সিনেমা, আবার আইসক্রিম, বড্ড বেশি হয়ে গেল না?
তাহলে থাক—জলি আর দাঁড়ায় না।
সাট্টার পেনসিলের লাডডু সিংও তাকে নজর করেছে। লাড়ুর পকেট ভারী বেশি।
কী রে জলি? একেবারে মাধুরী দীক্ষিত হয়ে গেছিস যে রে।
নাকি?—মুখ বেঁকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের ভঙ্গি করে জলি বলে।
এক থাবড়ায় মুখ ভেঙে দেব অমন করে কথা বললে—লাডু বাবা মেজাজি লোক, এ প্যাংলা পিন্টু নয়!
সিনেমা যাবি?
কী সিনেমা?
মোহরা। ফ্ল্যাট হয়ে যাবি নাচ দেখলে—তু চিজ বড়ি হ্যায়…
ও আমার টি.ভি.-তে দেখা হয়ে গেছে। অনেক বার।
আরে! কোথায় টিভি আর কোথায় বড়ো ইস্কিন…যাবি তো বল।
কী খাওয়াবে?–খুব সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন জালির।
ধর রোল।
কী রোল, এগ না চিকেন না মাটন।
ধর এগ!
আর?
আর? আচ্ছা আইসক্রিম, তোর ওই ঘাগরামতো ড্রেসটা পরে আসিস।
লাড্ডুর সঙ্গে পারিজাত-এ মোহরা দেখতে চলে যায় জলি। এগ নয়, চিকেন রোল খাইয়েছে লাড্ডু, ভ্যানিলা আইসক্রিম।
সিনেমা দেখতে দেখতে লাড্ড জলির চুলে ইলিবিলি কাটে, পেট খিমচে ধরে।
ভ্যাট, হাত সরান, কাতুকুতু লাগছে।
আইসক্রিম খাওয়ালুম না।
আইসক্রিমে যেটুকু হয় হয়ে গেছে।
