খারাপ থাকবে কেন? চারদিকের সাইকেডেলিক আলোয় জলি হারগিজ ভালোই আছে।
জ্যোতির্ময়ী গুহ
গত কয়েকদিন ধরেই অদ্ভুত ফোন আসছে। ভুতুড়ে ফোন। কে একজন বিনা ভূমিকায় জিজ্ঞেস করেন, জুতির্ময়ী গুহা বলে কাউকে চিনেন? ভাষা এবং গলার টোন থেকে বোঝা যায় ভদ্রলোক বাঙালি নয়, কিন্তু বাংলা বলতে পারেন। জুতির্ময়ী গুহা বলে কারুকে চিনেন? ভোর সাড়ে ছটায়, রাত আটটায় অফিস থেকে ফিরে সবে জিরোতে বসেছি তখন, কখনও আবার রাত দশটায়, খেয়ে উঠেছি হয়তো, ছেলে এসে বলল, বাবা তোমার ফোন। সেই এক কথা, এক প্রশ্ন। একদিন সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। রাত সাড়ে বারোটায়—ঝনঝন ঝনঝন ভয়ে আঁতকে উঠেছি। ধর ফোন ধর। কোত্থেকে আবার কী সংবাদ এল রে বাবা। শাশুডি হার্টের রোগী। শ্বশুরের হাইপ্রেশার। শেষ মামাটি আজ তিনমাস হল। কিডনির রোগে শয্যাগত। যে কোনো জায়গা থেকেই ফোন আসতে পারে। তোক করে উঠেছি। নিজের বুকের দবদবানি নিজেই শুনতে পাচ্ছি।
হ্যালো।
সুরঞ্জনবাবু!
হ্যাঁ, বলছি।
জুতির্ময়ী গুহাকে চিনেন? …
একে ভুতুড়ে ফোন ছাড়া কী বলব বলুন তো।
প্রায় তেড়ে উঠি ঘুমে ভারী গলায়।
কী ভেবেছেন বলুন তো! কে আপনি? বারবার এক কথা। কতবার আপনাকে বলব জ্যোতির্ময়ী-ফয়ী কাউকে আমি চিনি না।
কিন্তু উনি যে বলছেন উনি আপনাকে চিনেন! অনেক কষ্ট করে আপনার ফোন নোম্বার বার করেছি। সারা টেলিফোন গাইডে আর কুনও সুরোঞ্জন করচৌধুরী নাই। কোতবার নোম্বর পালটেছে, ওয়ান-নাইন ফাইভ ওয়ান ফোন করে করে… উনি বলছেন উনি আপনার ভাঞ্জা।
মানে?
সরি? উনি বলছেন আপনি উনার ভাইপো।
মানে উনি আমার পিসিমা? সরি আমার কোনো পিসিমা নেই। জ্যোতির্ময়ী গুহ বলে তো কেউ নয়ই, আর আমাকে বিরক্ত করবেন না ফর গডস সেক।
ফর গডস সেক আপনি একবার আসুন। একজন লেডির শেষ ইচ্ছা। তিনি আপনার আন্ট নোন কি না জানি না, কিন্তু কারু না কারুর আন্ট তো বোটে। বোলছেন যোখন। …
কী অদ্ভুত যুক্তি!
কিন্তু শুনতে পেলাম আমি বলছি, সম্ভবত হাল ছেড়ে দিয়ে, অল রাইট, বলুন আপনার ঠিকানা।
তিন বাই এক গুরুসোদয় দত্ত রোড। বালিগঞ্জ। …
আমি একেবারে আপাদমস্তক চমকে উঠেছি।
একটা সময় পর্যন্ত, সম্ভবত বারো বছর বয়স পর্যন্ত তিনের এক গুরুসদয় দত্ত রোড ছিল আমারই, আমাদেরই ঠিকানা। সে এক বিশাল বাড়ি। বেশ কয়েক পুরুষের বাড়বৃদ্ধি চিন্তা করে তৈরি করা। ঠাকুরদা তিন ভাই। প্রত্যেকেরই যথেষ্ট পরিমাণ ছেলেমেয়ে। মেজো ঠাকুরদার ছেলে আমার বাবারা তিন ভাই এক বোন। একটা সময় এল যখন ওই বিশাল বাড়ি মেরামত করবার সাধ্য বাবাদের রইল না। দুই প্রজন্মের যে তফাত সেটাও বেশ বড়ো হয়ে দেখা দিল। তখনই সর্বসম্মতিক্রমে ওই বাড়ি বিক্রি করে দেওয়া হয়। এ ঘটনা আমার বারো বছর বয়সের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা। শুধু আমরা কেন, শুনেছি বাড়ি বিক্রির বছর দুই পরেই হার্ট অ্যাটাকে একজন, সেরিব্রাল অ্যাটাকে একজন, আমার দুই ঠাকুরদা গত হন। বাকি দুজন আগেই গিয়েছিলেন। বেশি কথা কি আমার বাবার নিজের বোনই শকে মারা যান। হঠাৎ স্ট্রোক। পিসিমার আমি এবং আমার পিসিমা বড়োই প্রিয় সে সময়টায়। সারা দিনমান তাঁর রান্নাঘরেই কাটত। ওরই মধ্যে সুরোর জন্য ভালো জিনিসটা, পছন্দের জিনিসটা তুলে রাখা ওঁর বাতিক ছিল। তাতে অশান্তিও কম হত না। কেন না আমার আর এক ভাই ও এক বোন ছিল।
কোথায় গেল সে-সব দিন, সে-সব রাত। সেসব মানঅভিমান, রাগারাগি। ছড়িয়ে পড়েছি সবাই এখানে ওখানে সেখানে। আমার নিজের ভাই সুজন মারা গেছে, বোন থাকে দিল্লির উপকণ্ঠে। বাবার দুই ভাই, অর্থাৎ দুই জ্যাঠা কবে গত হয়েছে। বাবা-মা গেছেনই। অন্য ঠাকুর্দাদের ছেলেমেয়েদের সঙ্গে যোগাযোগ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হতে হতে একেবারেই ছিন্ন। যখন সবাই এক ছাদের তলায় ছিলুম তখন সম্পর্ক জ্যান্ত ছিল। ভাই বোন! এক একজনের বিয়েতে কী ঘটা! কী মজা! কে এখন কোন কোণে বাসা বেঁধেছে জানি না। জানতে খুব একটা উৎসাহও নেই! আর! নিজেই অবসর নিলুম এ বছর, কে আর ঠিকানা মনে রাখে। এমত অবস্থায় জ্যোতির্ময়ী গুহ, পিসিমা আবার তিনের এক গুরুসদয়ের প্রাচীন ভিটেয় আবিভূর্ত হলেন? আমি তাঁর ভাইপো? বলছেন একজন অবাঙালি? ব্যাপারটা দেখতে হচ্ছে তো!
আমরা থাকি স্টেশন রোড, চন্দননগর। গুরুসদয়ের বাড়ি বিক্রি হয়ে যাবার পর আমরা চলে যাই দমদম। ভাই সুজন বড়োসড়ো ইঞ্জিনিয়ার হয়েছিল, অবধারিতভাবে চলে গেল সব পথ এসে মিলে গেল শেষে যেখানে সেই মেন্টিং পট আমেরিকা মহাদেশে। সেখানে ওয়াশিংটনের এক রাস্তায় গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে মাত্র সাতাশ বছর বয়সে। বিয়ে হয়নি, ভাগ্যিস! এ ঘটনার জের আমরা কেউ কাটাতে পারিনি। মা মারা গেলেন দু বছরের মধ্যে। বাবা তাড়াতাড়ি বোনের বিয়ে দিয়েদিলেন। দমদমের বাড়ি বিক্রি করে চলে এলুম শ্বশুরবাড়ির দেশ চন্দননগরে, নিরিবিলিতে। তা এখন, দমদমও যা চন্দননগরও তা। বাবা যদ্দিন ছিলেন তদ্দিন অবশ্য শান্ত, সুন্দর স্ট্র্যান্ড, ফরাসি স্থাপত্যের সৌন্দর্য এ সবের মধ্যে দিয়ে একটা চলনসই শান্তি পেয়েছিলেন।
কত বছর কেটে গেল চন্দননগর যাতায়াত করছি। উলটো মুখে যাই বলে ট্রেনের অফিস-টাইম-ভিড় খুব একটা পাইনি। অ্যাম্বিশন ছিল না, বর্ধমান ট্রেজারি অফিসেই কাটিয়ে দিলুম সারা জীবন। নোংরা ঘিঞ্জি অফিস, ফাইলে ফাইলে ধুলোয় ধুলোয় একেক্কার। নিজের ঘরটুকুর আবডাল সরলেই নরক। তবু ওখান থেকে নড়িনি। ভাইয়ের উচ্চাকাঙক্ষার কথা মনে পড়ত, বিদেশ-বিভুঁইয়ে একলা-একলা মর্মান্তিক মৃত্যু। বেশ আছি, তা ছাড়া সুজনের ক্যালিই কি আমার কোনো দিন ছিল?
