তা সে নেশা জমাবার পাত্তর অন্যত্র পেয়ে গেল বোধহয়। তাই তাকে মেরে ধামসে তার সোনার জল করা কগাছি রুপোর চুড়ি আর হার ছিনিয়ে নিয়ে সেই যে পিঠটান দিল, আর এ মুখো হয়নি।
গেছে, ভালো হয়েছে।
খালি জলি ডাক শুনলেই সে যেন ভূতগ্রস্ত হয়ে যায়, মনে হয় সে একটা সুন্দরপানা বউ, হাওয়াই শাড়ি পরেছে, ঝমঝম করছে সোনার চুড়ি, বালা। গা থেকে সেন্টের পাগল করা গন্ধ বেরোচ্ছে আর সে, সেই রিক্তা-জলি-টিংকুর রূপের ধুচুনি বাপ হঠাৎ কার সোনার কাঠির ছোঁয়ায় ওই জলির বাপের মতন লম্বা, ফরসা, লাল-চশমার এক ম্যাজিক মানুষ হয়ে গেছে, তাকে আদর করছে, চুলে হাত বুলিয়ে, কপালে চুমো খেয়ে। এই স্বপন দেখতে-দেখতেই তার হাতের ঝাড়ন হাতেই থেকে যায়, ফ্যালফ্যাল করে সে সামনের দিকে চেয়ে থাকে।
ও বউ! ও কী! কী ভাবছ? হাত চলছে না যে তোমার মা! কিছু হয়েছে?
আর কী হয়েছে! হয়েছে যা হবার তাই। বা যা না হওয়ার তা না হওয়াই।
তা আসল বৃত্তান্তটি হল কমলা মাসিদের সাধ-আহ্বাদের সঙ্গে তাদের মেয়ে জলিদের সাধ-আহ্লাদের কিন্ত অনেক ফারাক। জলির সাধ অন্যরকম।
ও কীরে? তুই কি ভুরু প্লাক করে এলি নাকি?—রীতা বউদি একদিন অবাক হয়ে বলল।
ভেতরে ভেতরে রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে জলির। সে বলল, কেন বউদি, তুমিও তো করো, করো না?
কী একটা উত্তর দিতে যাচ্ছিল বউদি। তাড়াতাড়ি সামলে নিল, হাসি চেপে বলল, হ্যাঁ…তা অবশ্য। সে যাহোক বেশ করেছিস। ধনুকের মতো হয়েছে। একেবারে, পঞ্চশরের পুষ্পধনু!
শেষের কথাগুলোর মানে ঠিক ধরতে পারল না জলি, ইচ্ছে করে শক্ত করে বলেছে, যাতে সে বুঝতে না পারে! কিন্তু ওটা যে একটা ঠাট্টা, বিদ্রুপ, ব্যঙ্গ এটুকু সে বেশ বুঝেছে। বুঝে অঙ্গ জ্বলে গেছে তার।
কী রে? আজকে পড়তে এলি না! পড়তে আমার হারগিজ ভালো লাগে না বউদি-ঝাঁঝিয়ে ওঠে সে। বউদি না আরও কিছু! মামি আসলে! তার মা যদি বউদি ডাকে তার ডাকা উচিত মামি, ডেকেও ছিল সে, মনিবই বারণ করল, বলল, বউদি, বউদিই ডাকবি।
আমি কিন্তু হারগিজ পড়ি রে জলি। খবরের কাগজ, পত্রিকা-টত্রিকা, বই…রীতা বউদি মুচকি হেসে বলল।
তুমি পড়ো তো আমার কী!
না, সেদিন বলছিলি না আমি ভুরু প্লাক করি তাই তুই করেছিস, তাই বলছিলুম আমি যখন পড়ি তুইও পড়।
খবর তো টিভি, দেখলেই জানা যায়। কোন পার্টি ভালো, কোন পার্টি শয়তানের পার্টি, কেরোসিনের দাম বাড়ল, নতুন মারুতি বেরিয়েছে… আসল প্রসঙ্গটা সামান্য পাশ কাটিয়ে যায় সে।
বাস? এইটুকু জানলেই তোর হয়ে যাবে? তোকে কেউ উলটো পালটা কাগজে সই করিয়ে নিলে বুঝতে পারবি?
কাগজে সই? কত একেবারে জমি-বাড়ি-ঘরদোর রয়েছে আমার! হুঁঃ! ঠকিয়ে নেবে!
শুধু বাড়িঘরদোর কেন? ঠকিয়ে নেবার অনেক কিছু আছে রে জলি! তা ছাড়াও লেখাপড়া শিখলে নিজেদের অবস্থার উন্নতি করতে পারবি। এটা বুঝিস না? কোনটা ভালো কোনটা মন্দ—বোঝবার জন্যেও একটু পড়তে হয় রে। আর সুযোগ যখন পেয়েছিস!
জলি মুখ ঝামটে বলল, আমি তো আর তোমার মতো মাস্টারি করতে যাচ্ছি। উন্নতি? কী উন্নতি? ভদ্দরলোকে আমাদের বিয়ে করবে?
রীতা বউদি এ প্রশ্নের সদুত্তর জানে না। সে চুপ করে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ, তারপর বলল, ঠিক আছে, যা ভালো বুঝিস কর, আমি তো চেষ্টা করলুম। তারপর…। ছোটোবেলায় আমার বাপের বাড়িতে রঘু বলে একজন কাজ করতে এসেছিল দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে। আমাদেরই মতো বয়স ছিল। আমরা ভাইবোনেরা মিলে তাকে লেখাপড়া শেখাতুম। স্কুলফাইন্যাল পাস করল। ড্রাইভিং শিখল, আস্তে আস্তে নিজের ট্যাক্সি করল। এখন রঘুনাথের নিজেরই তিনটে ট্যাক্সি। ডিপ্লোমা এনজিনিয়ারিং পড়েছে। মাঝে মাঝে আমার সঙ্গে দেখা করতে আসে, দেখিস—ভালো ছেলে। মানে আমার দাদা ভাইয়েদের সঙ্গে তফাত বুঝবি না।
দাদা ভাইয়েদের সঙ্গে তফাত বুঝবি না। হুঁ! কে চেয়েছে তোমার বোন হতে! অষ্টপ্রহর পরনে ফ্যাসফেসে সাদা শাড়ি, খাতা দেখছে তো দেখছেই, টিভিতে ভালো ভালো মারপিট কি নাচগান রোমান্সের সিনগুলো এলেই নব ঘুরিয়ে দেবে। কাজ নেই অমন ভদ্দরলোক হয়ে!
সেইদিনই জলি মনে মনে সিদ্ধান্তটা নিয়ে নেয়। চন্দ্রলোক। এই বিল্ডিংটার তিনতলায় একটা, চারতলায় একটা, মোট দুটো কাজ সে পেয়েছে। সুরানাদের বাড়িতে পাঁচশো, আর একটু চাপ দিয়ে ছশো সে আদায় করে নেবে। দেওরারা একটু কিপটে। ওরা চারশোর বেশি কিছুতেই উঠল না। কিন্তু সুবিধে হচ্ছে ওদের বাড়িতে তার সাইজের দুটো মেয়ে আছে। তাদের পুরনো সালোয়ার কামিজ সে এখনই গোটা-তিন পেয়ে গেছে। টিকে থাকতে পারলে আরও কত পাবে। ম্যাকসি, নাইটি, ঘাগরা চোলি…ফাটা নয়, চটা নয়, খালি পুরোনো। রীতা বউদি শুধু শাড়ি পরে। বেড়াতে যাবার সময়ে সে চুড়িদারগুলো পরে। কম ব্যবহার হয় সেগুলো, সেগুলোর আশায় বসে থাকবার কোনো মানেই হয় না। তা ছাড়া রীতা বউদি তার থেকে মোটাও বেশি। লম্বাতেও একটু বেশি। রিক্তার গায়ে ঠিক হয়। তা সে রিক্তা বুঝুক গিয়ে। চেহারাটাই ভ্যাসকা, রিক্তার গতর নেই। মা আর জলি দুজনে মিলে বাড়ি বাড়ি খেয়ে রোজগার করে, রিক্তা আর টিংকু ঘর সামলায়। তা ছাড়া, অবশ্য ওরা দুজনেই চেয়ার বোনে।
রীতাবউদির বাড়ি ছাড়াও আরও দুবাড়ি কাজ করে সে। একজন বুড়ো, তাকে বেঁধে বেড়ে, ঘরদোর গুছিয়ে ছিষ্টি করে দিতে হয়। তবে কিছুই দেখে না বুড়োটা। চাল ডাল সবজি, বালিশের ওয়াড়, মোমদান এসব হারগিজ সরায় সে। বুড়োর বাড়ির কাজ হল তার লক্ষ্মী। আরেক পার্টি আছে সাহা বাড়ি। ও বাড়ির মেম্বারও যত, কাজের লোকও তত। রান্নার লোক, ঘর ঝাড়ার লোক, ঝাঁটপাটের লোক, কাপড়কাচার লোক…। মাইনে মোটামুটি, কিন্তু কামাইয়ের সুখ খুব, হপ্তায় একদিন দুদিন না গেলে টেরও পায় না। মনিব নয়, হয়তো অন্য কোনো কাজের লোকই খেয়াল করে, বলে—কাল যে বড়ো এলি না জলি!
