রিক্তা নাম শুনে মুখ টিপে বুঝি হেসেছিল বউদি, হ্যাঁ গো কমলামাসি, হঠাৎ রিক্তা নাম দিতে গেলে কেন? রিক্তা মানে জানোনা?
তা অবশ্য কমলামাসি জানে না। রিক্তা হল গিয়ে রিক্তা, জলি হল জলি, আর টিংকু, তার ছোটো মেয়ে টিংকু হল টিংকু—তার আবার মানে কী? তার নিজের নামটি যে মা-লক্ষ্মীর নাম সেটুকু অবশ্য কেন যেন সে ছোট্টবেলা থেকেই জানে, মানেটা হাওয়ায় বাতাসে ভেসে থাকে। তবে ওসব নামের এখন আর তেমন ধক নেই।
মানে জানে না, উৎসটি সোৎসাহে বলে কমলামাসি।
বিরজা ঘোষদের বাড়ি কাজ করতুম বউদি, তাদেরই কুটুমবাড়ির বউ এয়েছিল। কী সুন্দর! কী সুন্দর! এই অ্যাত্ত গয়না, এ-ই বেনারসি শাড়ি…তার নাম ছিল রিক্তা।
রীতা বউদি হেসে বলেছিল, এই গয়না আর সেই শাড়িতেই সুন্দর হয়ে গেল?
না গো বউদি, কী রং! কী চোখমুখ!
তাই বলো।
তারই নাম থেকে নাম রেখেছি। নইলে আমাদের আর বিদ্যে কী? তবে কী জানো বউদি, মুকখু-সুকখু গরিবগুর্বো মানুষেরও তো শখ যায়—বাক্যের শেষে কমলামাসির অভিমানের সুর গোপন থাকেনি।
নিশ্চয়ই। শখেতে তো দোষ নেই—রীতা বউদি তাড়াতাড়ি বলে ওঠে—কিন্তু রিক্তা মানে যার কিছু নেই। কিচ্ছুটি না। অমন নাম রাখতে গেলে কোন আক্কেলে?
তা হবে-কমলা যেমন ন্যাতা টানছিল তেমনি টানতে থাকে, তার কোনো ভাবান্তর হয়নি। ন্যাংটার নেই বাটপাড়ের ভয়। তা ছাড়া, কমলামাসি কোনো কোনো ব্যাপারে আলট্রা-মডার্ন। জোর অসুখবিসুখ করলে সে শনি-মঙ্গলবারের ভরের দিনে চণ্ডীমায়ের ঝাড়ফুঁকে বিশ্বাস করে, কতবার জলপড়া তেলপড়া নিয়ে এসেছে সে মায়ের থানের ঠাকুরমশাইয়ের কাছ থেকে, টিংকুর পাছে নজর লেগে যায় বলে তার কপালের কোণে ভুষো কালির ধ্যাবড়া ফোঁটাটি দিতেও তার কোনোদিন ভুল হয়নি। যে বর লাথি মেরে তাকে ঘর থেকে দূর করে দিয়েছে তার জন্যে সধবার জয়-মঙ্গলবার, সাবিত্রী বের্তো, তারকেশ্বর এসবও সে নিয়ম মেনে করে–এগুলো মেয়েমানুষের কর্তব্য, লাথি-ঝাঁটার বরই হোক আর সোহাগ সিঁদুরের বরই হোক, আর যতই তাকে সে নিজে দু বেলা মর মর বলে শাপান্ত করুক। বড়ো মা (শীতলা) যখন ফি বছর ফাগুন মাসে চানে বেরোন, তখনও সে নতুন কাপড় পরে, নতুন গামছা বুকে জড়িয়ে, উপোস করে এলোচুলে দণ্ডি কেটে থাকে। কিন্তু রিক্তা নামের মেয়ে নিঃস্ব রিক্তই হবে এমন বাজে কুসংস্কার তার নেই। এই যে তার নাম কমলা, তা লক্ষ্মী ঠাকরুনটি কি ট্যারচা চোখের কোণ দিয়েও কোনো দিন দেখেছেন তার সংসারের দিকে? নিজের মনেই চোখ গরম করে ভেংচি কাটে সে। হ্যাঁ, কিছু নেই, কিছু নেই, তোকে বলেছে! রিক্তা নাম হলেও কিছু নেই, কমলা নাম হলেও কিছু নেই। তফাতটা কী? আসল কথা, নিজেদের নাম তো! ঝি-চাকরে নিচ্ছে, গায়ে ফোসকা পড়ছে তাই ভদ্দরলোকদের।
রিক্তার পরে যে জলি! সে-ও তো এক ধনীর দুলালি নেকি চণ্ডীর নাম থেকে নেওয়া। সে মেয়েটা সব সময় লাফাচ্ছে। স্কিপিংদড়ি নিয়ে, লাল রবারের বল নিয়ে, ছোট্ট ছোট্ট পায়রার ডিমের মতো সাদা-সাদা বল নিয়ে। ধাড়ি মেয়ে, যতই কেন ফ্রকে-স্কার্টে বয়স লুকোক! ওর বয়সে তার রিক্তা হয়ে গিয়েছিল নির্ঘাত। ফ্রক দিয়ে বয়স ফুটে বেরোচ্ছে। নেচে বেড়াচ্ছেন ধিঙ্গি। তবু সে মেয়েটার বাবা মা-দাদু যখন জলি-জলি ডাকত গায়ের লোমগুলো তার খাড়া হয়ে যেত। সত্যি, সত্যি, এই তিন সত্যি। একটা নীল দরজার কপাট খুলে সে যেন ঢুকে পড়েছে এক মোজাইক-মেহগিনি-কার্পেটের স্বপ্নের জগতে, যেখানে মেয়েরা খালি বল খেলে আর গান যায়, বউয়েরা খালি ক্রিম মাখে আর অর্ডার করে আর ভালো ভালো সিল্কের শাড়ি পরে বেড়াতে যায়, আর বরেরা হাসি হাসি মুখে বউয়েদের দিকে ঘোর-লাগা চোখে তাকায় আর চুমো দেয়। হ্যাঁ, জলির বাবা জলির মাকে যখন তখন চুমো খেত, এ কমলা নিজের চোখে চুপচুপিয়ে দেখেছে। ভূত নয় প্রেত নয়, চণ্ডীমায়ের নল-চালা নয়, সুষ্ঠু জলি-জলি ডাক। মায়ে ডাকছে, ঠাকুমায় ডাকছে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, ভিন্ন ভিন্ন সুরে। বাস! কমলার নোম খাড়া। চোখের ওপর সেই দৃশ্য, জলির বাবা জলির মাকে টুক করে চুমো খেয়ে নিচ্ছে।
এমনটাও হয়! রিক্তাদের বাপ তো ওসব চুমো-ফুমো জানত না। মাসমাইনে পেলে আগে নিজেরটা ফুর্তি করে ওড়াবে। তারপর চুলের ঝুটি ধরে তার মাথা দেয়ালে ঠুকে ঠুকে তার থেকেও আদায় করবে ফুর্তির টাকা। রাত্তিরে মালের ঘোরে, ছেড়া কাঁথায় দু-পাশে দুই মেয়ে, হুঁশ খেয়াল নেই, ভুতের মতো লম্বা লম্বা হাত বাড়িয়ে তার ন্যাতানো বুক ধরে হিড়হিড় করে টানত লোকটা। তার ঝাঁপাই কী! বাপ রে! যেন রাক্কস। কচিকাঁচা জেগে যাবে বলে সে মুখ বুজে গোঁ গোঁ করে যন্তন্না সইত। একদিন সেই গোঙানি শুনে রিক্তা জেগে উঠে কচি-কচি হাত দিয়ে বাপকে পিটতে শুরু করে, মাকে মারছ কেন? মাকে মারছ কেন? এক ঝটকায় মেয়েকে মেঝেতে ফেলে দিয়েছিল বাপ, এবার তোকেও মেরে পাট করে দেব মেলা হম্বিতম্বি করলে।
নেহাত নিকষ অন্ধকার, তাই।
ধুস। তোকে দিয়ে নেশা জমে না—পরবর্তী মন্তব্য রিক্তার বাপের, জড়ালে গায়ে হাড় ফোটে। বডি বলতে কিছু নেই, মমতা কুলকান্নির বডি দেখেচিস?
কে আমার গতর এমন করেছে? চারবেলা গতর খাঁটিয়ে মুখে অন্ন তুলে দিচ্ছি। বছর-বছর ছেলেপিলে আর দুবেলা মার, আবার কুলকান্নি দেখাচ্ছেন। কে আমার অক্ষয়কুমার এলেন রে!
