জলি যখন গুড়গুড়ে ছিল, তখন এত সব আকাশছোঁয়া বাতাস-ঢাকা বাড়ি ছিল কিন্তু। ছিল দোতলা, বড়ো জোর তিনতলা, গলির মধ্যে থাম-টাম-অলা পেল্লাই প্রাসাদও কয়েকটা, কিন্তু ওই—তিনতলার বেশি নয়। সাতপুরোনো আদ্যিকালের বাড়ি সব। নোনা ধরেছে কোনোটায়, কোনোটায় হলুদ কি গোলাপি রং জ্বলে গিয়ে ছাতলা পড়ে গেছে। এক-একটা অবশ্য নতুন রংচং মেখে, সেজেগুঁজে ওঠে কখনও সখনও, দেখায় যেন এক ডালা শিঙি-মাগুরের মধ্যে একখানা ঝাঁ-চকচকে বাংলাদেশি ইলিশ। কিন্তু এখন? এখন এ তল্লাটের চেহারাই পালটে গেছে। আদ্যিকালের বদ্যিবুড়ি ডবসন রোডটা তো সদাসর্বদা ঝমঝম ঝমঝম করছে। তিরিশ ফুট কুল্লে হবে কি রাস্তাটা? আগে ছিল একটা সাবেক চার্চ, ক-টা দোকানপাট। পাঞ্জাব-লাইনের এ পাশে খোলামেলা ছড়ানো খান দুই বাড়ি রাস্তাটাতে রাজত্ব করত। রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরির কোনো আত্মীয়ের বাড়ি একটা, অন্যটা এ অঞ্চলের বিখ্যাত ধনী ও দানবীর বিরজা ঘোষদের। হাওড়া স্টেশনের দিকে এগিয়ে গেলে ডানদিকে রেলওয়ে কোয়াটার্স বেশ খানিকটা খোলা জায়গা জমি নিয়ে। সেখানে এদিককার অনেক স্কুল-কলেজেরই বচ্ছরকার স্পোর্টস হয়। এখন এ রাস্তায় যত এগোবে তত দোকানপাট, যত এগোবে তত দোকানপাট। এ সি মার্কেট, স্টেনলেস স্টিলের বাসনপত্রের দোকান, পাওভাজি-দহিবড়া-পাপড়িচাট, ইডলি-ধোসা এ সবের দোকান। হলদিরাম ভুজিয়াওয়ালার শ্বেতপাথরের সিঁড়িঅলা ঠান্ডা দোকান তো আছেই আর আছে দু গজ অন্তর একটা করে ওষুধের দোকান আর প্রতি মোড়ে একখানা করে জলিদের পাল্লার। সেই পাল্লারে একবার ঢুকে পড়ো অমনি চেরা-চেরা চোখের নেপালি দিদিরা হাতের কেরামতিতে বেমালুম তোমার ভোল পালটে দেবে। ঢুকল জলি, বেরুল জুলেখা সুলতানা, ঢুকল টুনটুনি, বেরুল টুইঙ্কল খান্না। আর সেই পাল্লারের স্বর্গদ্বারে ঢোকবার রেস্ত জোগাতেই উঠছে পরের পর পরের পর তাল ঢ্যাঙা বাড়ি। সাততলা আটতলা নতলা। মার্বেলের সিঁড়ি, রেলিংয়ের ওপর পেতলের পাত। দরজার বাহার কী। চৌখুপি চেঁছে মাথা গোল করে যেন সুন্দরী-অপ্সরাদের নেলপালিশ লাগানো পেল্লাই নখ এক-একটা। মন্দিরও আছে একাধিক। হনুমানজি বজরংবলি, শিউজি। মন্দিরে বারোমাস গাঁদাফুলে কেয়ারি ঝোলে। দেখলে বুঝবে কী একটা বিশেষ পরব। তা কিন্তু নয়। রোজ রোজই প্রবল ঘন্টা-ঘড়ি বাজিয়ে আরতি হচ্ছে। রোজই কাতার দিয়ে দাঁড়াচ্ছে ভক্তরা। আপিস যেতে-আসতে মারোয়াড়ি বাবু দণ্ডবৎ হয়ে যাচ্ছে একবার করে। মহা ধূম। আকাশ ঢেকে গেছে বলে যে খুব একটা ক্ষতি হয়েছে, তা নয়। আকাশে কী থাকে? চাঁদ, তারা, সুয্যি—এই তো! তা দোকানে দোকানে কি এখন অমন হাজার তারা জ্বলছে না? সাদা সিঁড়ির মোড়ে, গেটের ওপর ঘষা কাচের গোল বাতিগুলোর থেকে যে আলো বেরোচ্ছে, সেটা কি জোছনার চেয়ে কম সুন্দর!
এ তো গেল একটা রাস্তা। এটাই সবচেয়ে জমজমাট, সবচেয়ে দামি। কিন্তু আরও আছে। রয়েছে শহরের বুক ফুঁড়ে জি টি রোড, হাওড়া রোড, হরগঞ্জ রোড, আর সেসব রোডের এ পাশ ওপাশ দিয়ে ডালপালার মতো নেংটি-নেংটি গলি। কত লেন, কত স্ট্রিট, কত যে রোড। ক্ষেত্তর মিত্তির লেন, সীতেনাথ বোসের লেন, জেলেপাড়া, শৈলেন বোসের রোড়, অবনী দত্ত রোড, আরও ওদিকে যাও তো উত্তম ঘোষের লেন, শ্রীরাম ঢ্যাং রোড, জালান রোড, ধর্মতলা রোড। রোডের আর শেষ নেই। সেই সব রোডের দু ধারে টপাটপ দাঁড়িয়ে পড়ছে ঢ্যাঙা-ঢ্যাঙা মাল্টিস্টোরি। আলাদিনের ম্যাজিক যেন! এ জায়গায় পুরোনো বাসিন্দারা গজগজ করে অবশ্য আসতে যেতে—শহরটাকে একবারে বেচে দিলে? আকাশটাকে সুন্ধু বেচে দিলে এই মেয়র আর মিউনিসিপ্যালিটি! ছি, ছি, ছি! কিন্তু করবেটা কী! মুরোদ তো ঘন্টা। আর জলি তো দেখে দিব্যি শ্রীবৃদ্ধি হয়েছে শহরের। বিল্ডিং দেখলে বুক দশ হাত হয়ে যায়, দোকানপাট দেখলে চোখ ধকধক করে, জিভ দিয়ে দিয়ে লাল ঝরে। শহরের মতো শহর একখানা।
তা চোখে দেখে থ মেরে থাকলেই তো হবে না। পয়সা চাই। বাঙালিরা মোটে পয়সা দিতে চায় না। মাইনে দেখো বছরের পর বছর এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রয়েছে। জিনিসপত্তরের দাম বাড়ছে না? বলি তোমরা মাগগিভাতা পাও না? তোমাদের ইনকিমেন নেই?—ক্যাঁট ক্যাঁট করে জলি শুনিয়ে দিয়েছে কোণের বাড়ির রীতা বউদিকে। এই বউদিটা আবার তাদের সঙ্গে একটু গলাগলি মেশে। বাড়ির, বাপ-মায়ের খবর নেয়, হোমিয়োপ্যাথিকের ওষুধ দেয়, জ্বরজ্বারি-পেটের গোলমাল, সর্দি-কাশি, পা টনটন, দাঁত কনকন-সেরেও যায় বেশ। এখন জলি আর তার বন্ধু টুনটুনি নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে—আদিখ্যেতা! জলির মায়ের যখন হঠাৎ অ্যাপেনডিসের ব্যথা উঠল। সে তো চোখের গুলি ঠিকরে যায় আর কী! রীতা বউদি আর অশোক দাদা তাদের কোনো চেনাশোনা লোক ধরে হাসপাতালে ভরতি করে দিল। কোন কেলাব থেকে অ্যাম্বুলেন্স আনাল। ডাক্তার বলেছিল, তক্ষুনি অপারেশন না করলে নাকি বার্স করত। জলির সেই মা আবার উঠে হেঁটে বেড়াচ্ছে, আবার বাড়ি-বাড়ি বাসনমাজার কাজ ধরেছে। তবে, সে তো কোন কালের কথা। তখন জলি ছোটো, কাজ ধরেনি।
স্লেট-পেনসিল-বর্ণপরিচয় কিনে জলিকে খানিকটা লেখাপড়াও অবশ্য শিখিয়েছে রীতা বউদি। ইংরেজি ঠিকানা সে পড়তে পারে, বাংলা তো পারেই। তা সে তো অবৈতনিক ইস্কুলে গেলেও শেখা যেত। বাড়ি-বাড়ি কাজ করে জলির সেখানে যাবার সময় হত না এই যা। রিক্তাকেও পড়াশোনা শিখতে ডেকে নিয়েছিল বউদি। তবে রিক্তাটা একটু মাথামোটা, তা ছাড়াও রিক্তার নাম নিয়ে খামোখা রীতা বউদি আর জলির মায়ের মধ্যে একটা মন কষাকষি হয়ে যায়। তার ফলে, রিক্তাকে পড়তে পাঠানো বন্ধ করে দেয় তাদের মা।
