ওদের প্রিন্সিপ্যাল মি. মাথুর পুরো ব্যান্ডের জন্য একটা দেড় হাজার টাকার পুরস্কার ঘোষণা করলেন। তিতুর জন্যে বিশেষ পুরস্কার ঘোষণা হল—কে অঞ্জলি দেওল দেবেন।
ওর বাবা বলল, দেখো, তোমার ছেলেকে তুমি স্কলার করতে চাইলে, আমি চাইলুম, ট্রেইনড ম্যানেজার হোক, ও হয়ে গেল শোম্যান। নেভার মাইন্ড। শোম্যানদেরই তো যুগ পড়েছে।
আমি বললাম, আহা হতাশ হচ্ছ কেন? বারো বছর তো মোটে বয়স। স্কলার হবার সময়ও চলে যায়নি। এম.বি.এ. দিগগজ হবার সময়ও যায়নি।
ছেলে আসতে হ্যান্ডশেক করল বাবা। চাপা গলায় ছেলে আমাকে বলল, এখানে যেন বাচ্চার মতো আমাকে ফল করো না। আমি হাসতে লাগলাম।
বড়ো শান্ত, নিবিড়, সুখ-সমুদ্র ঘুম ঘুমোই আজকাল। ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যে দিয়ে জীবনটা আরম্ভ হয়েছিল। ছা-পোষা বাবা-মা, ভাইটা মিডিয়োকার, আমি নিজেও তাই, কিন্তু বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছিঁড়ে একটা ভালো চাকরি জুটেছিল। তা সেখানে গিয়ে একটা বিবাহিত পুরুষের ফাঁদে পড়লাম। অনেক করেও যখন পুরোনো সংসারকে সে গুডবাই জানাতে চাইল না, তখন চোখের সামনে অন্ধকার সমুদ্র দুলছিল। প্রাণপণে চোখ বুজে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে ভুল করছি। এ লোক আমার নয়। কেটে তো গেল আঠারো বছর। শ্বশুরবাড়ির পরিজনদের সঙ্গে শীতল যুদ্ধও একসময়ে অসহ্য হয়ে উঠেছিল। আমার স্বামী অফারও দিয়েছিল আলাদা সংসার করার। আমি শুনিনি। হেরে যাব কেন? জীবনে সব সমস্যার মুখোমুখি হয়ে বীরের মতো তার সমাধান করবার চেষ্টা করেছি। বুড়োবুড়ি যে আমাদের সঙ্গে আছেন, এতে সামাজিক দিকটা কি কম সহজ হয়ে গেছে? ওদিকে কোনো টেনশনও নেই। এক পিসশাশুড়ি তো একদিন বলেই ফেললেন, তোমার বউমা লক্ষ্মী বউমা বউদি। দু-যুগ তো কাটিয়ে দিলে তোমাদের সঙ্গে। আর আমার বউগুলো দেখো! একটা ছেলে পড়াবার নাম করে বালিগঞ্জে বাসা নিলে। একটা বিধবা মায়ের দোহাই দিয়ে বাপের বাড়িতেই বছরভর পড়ে থাকে। আর ছোটোটা তো একেবারে সাগরপার হয়ে গেল। যতই নিন্দে করো বউ তোমার ভালো।
মনে মনে বলি—কম আত্মত্যাগ করিনি। চাকরি ছেড়েছি। উদ্দাম প্রণয় তা-ও ছেড়েছি। দিনগত পাপক্ষয়, আবেগহীন সংসার জীবন মেনে নিয়েছি। মানিয়ে নিয়েছি রক্ষণশীল শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে, উচ্ছল, স্বার্থপর, রুচিহীন ননদিনির সঙ্গে। ছেলের জন্যে যা করেছি—তার হিসেব আমার মনে নেই। সে করা বহু আনন্দের করা।
ডিং ডং ডিং ডং… এই দুপুরে আবার কে এল? ফুটোয় চোখ লাগিয়ে দেখি তিতুদের স্কুলের প্রিন্সিপ্যালের গাড়ি। ভেতরে উনি বসে আছেন। ড্রাইভার এসে বেল বাজাচ্ছে। বুকটা ধক করে উঠেছে।
কী হল? তড়িতের কিছু হয়েছে?
প্রিন্সিপালের মুখ ভাবলেশহীন। বললেন, না, কিন্তু একটা দরকার আছে, আপনি চট করে রেডি হয়ে আসুন মিসেস সিনহা। সম্ভব হলে আপনার হাজব্যান্ডকেও তুলে নেব।
ওকেও? কেন? কী হয়েছে? বিপদ? তড়িৎ?
তড়িৎপ্রভ ইজ অল রাইট মিসেস সিনহা। বাট দেয়ার হ্যাজ বিন আ ন্যাস্টি অ্যাকসিডেন্ট ইন দা স্কুল।
আমি আতঙ্কে বোবা হয়ে যাই। কী বলছেন এঁরা তিতুর কিছু হয়নি, অথচ নাস্টি অ্যাকসিডেন্ট হয়েছে? তিতুর কিছু না হলে ওঁরা কেন আমার নিতে এসেছেন? এতই জরুরি যে ওর বাবাকেও নিতে চাইছেন।
পুলিশ। স্কুল-কমপাউন্ড ঘিরে প্রচুর পুলিশ। আমরা দুজনে যাচ্ছি ভিড় ঠেলে। প্রিন্সিপ্যালের সঙ্গে। একজন ইন্সপেক্টর। ইন্সপেক্টরই হবেন, আমি অত কাছ থেকে পুলিশ ইনসপেক্টর কখনও দেখিনি। বললেন, মিসেস সিনহা—আপনার ছেলের মধ্যে কোনও ক্রুয়েলটি লক্ষ করেছেন? এ স্ট্রীক অফ নিয়ার ম্যাডনেস?
না তো! না!
ও গুমরে থাকত না? ভিনডিকটিভ নয়?
কী করে বলব? সেরকম কিছু কখনও দেখিনি। কেন, কী হয়েছে? বলবেন তো? কী আশ্চর্য, বলবেন তো কিছু।
প্রিন্সিপ্যাল ধীরে ধীরে বললেন, তড়িৎপ্রভ একটা হার্ড-পেন্সিল সরু করে কেটে লম্বা করে দাঁড় করিয়ে রাখে সীটের ওপরে। ফেভিকল দিয়ে আটকে। ঠিক নীলোৎপলের বসার জায়গায়। নীলোৎপল না দেখে বসতেই পেনসিল আমূল ঢুকে গেছে ওর রেকটামে। শকে মারা গেছে ক্লাসের সেকেন্ড বয়। সঙ্গে সঙ্গে।
আতঙ্কে নীল হয়ে আমরা ওর বাবা-মা বলি, কী সর্বনেশে খেলা। ছি ছি। ছেলেটা একেবারে মারা।
ইনসপেক্টর বললেন, নো মিসেস সিনহা, ইটস নট জাস্ট এ প্র্যাঙ্ক! ইটস মার্ডার। প্রি-মেডিটেটেড। ক্লাসের ছেলেরা সাক্ষ্য দিয়েছে ফার্স্ট প্লেস নিয়ে দুজনের মধ্যে বিটার রাইভ্যালরি ছিল। তা ছাড়াও টুম্পা হাজারিকা নামে একটি মেয়েকে নিয়ে দুজনে কিছুদিন ধরেই লড়ছিল।
আমার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। অস্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি প্রিন্সিপ্যাল মি. মাথুরের মুখটা ঝুলে পড়েছে।
আমার স্বামী হঠাৎ খ্যাপার মতো চেঁচিয়ে উঠল, এই জন্য? এই জন্য আপনাদের স্কুলে কুড়ি হাজার টাকা ডোনেশন দিয়ে ছেলেকে ভরতি করেছি? এই শিক্ষা দিয়েছেন তাকে? এই শিক্ষা?
ঝোলা মুখটা সামান্য তুলছেন প্রিন্সিপাল। থেমে থেমে বলছেন, ওই একই প্রশ্ন আমিও তো আপনাদের করতে পারি মি. সিনহা?
জোলি চেপ
এদিকটায় মারোয়াড়ি এসে কপালখানা স্রেফ খুলে গেছে জলি দাসের। শুধু জলিই বা কেন? বিজলি, রেণু, ঝুমা, কাজলি, টুনটুনি… জলির যত বন্ধু আছে সববারই।
