রাখালবাবু হা-হা করে হেসে বললেন, ওইটেই তো মজা বউমা, ভয়ের টিকে দেওয়া রইল ছোটোবেলায়।
এবার কড়া গলায় বলি, না। ভূতের গল্প বলবেন না, বাজে ওসব। রূপকথার গল্পও বলবেন না। রাজা-রানি যত সব বুর্জোয়া ইম্যাজিনেশেন। রাবিশ।
রাবিশ?—বোকার মতো হেসে রাখালবাবু ভেতরের ঘরের দিকে চলতে থাকলেন।
তিতু গোঁজ হয়ে গিয়ে ঘরে শুয়ে পড়ল। অনেক চেষ্টা করেও ওকে পড়াতে তো পারলামই না, খাওয়াতেও পারলাম না ভালো করে। দু-গাল খেয়েই ঘুমে ঢলে পড়ল।
.
চার
তিতুকে নিয়ে আমার ভাবনা এখন অনেকটাই কমে গেছে। তিতু প্রতি বছর ফার্স্ট হয়ে ক্লাসে উঠছে। অঙ্ক আর ইংরেজিতে নীলোৎপল ওকে মেরে দিচ্ছে। ভাইট্যাল দুটো সাবজেক্টই। কিন্তু বাকিগুলোতে তিতু অনেক মার্কস পায় বলে এগিয়ে থাকছে। নীলোৎপল যে কোনোদিন ওকে হারিয়ে দিতে পারে। ওর বাবার কাছে ভাবনা প্রকাশ করতে সে বলল, আমার পোলা অঙ্ক ইংরেজিতে খারাপ করবে? হতেই পারে না। আসলে, মন দিচ্ছে না। অঙ্কে কনসেনট্রেশন চাই। আর ইংরেজি? দেখো ওর আন্টিই কতটা জানে? নীলোৎপলের বাবাকে তো আমি চিনি। কেঁদে ককিয়ে পাস করত। ডাল মে কুছ কালা হ্যায়।–আমরা তিতুকে উৎসাহিত করি। খাটো, আরেকটু খাটো, নীলোপলকে মেরে বেরিয়ে যাও। কিলার ইনসটিংক নেই কেন তোর?
যাই হোক, তিতুর নাচের প্রতিভা দেখে ওকে আমরা নাচেও দিয়েছি। অনেকের ধারণা ছেলেরা নাচ শেখে না। ছেলেরা নাচ না শিখলে উদয়শঙ্কর, বিরজু মহারাজ এঁরা হলেন কোত্থেকে—তাদের জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হয়। তিতু দারুণ কথক নাচছে। ওকে আমরা যথাসম্ভব এক্সপোজার দিচ্ছি। একটা ট্যালেন্ট সার্চ কমপিটিশন আছে শিগগিরই, নাওয়া-খাওয়া ভুলে প্র্যাকটিস করাচ্ছি ছেলেকে। শ্বশুর, সাধারণত আমাদের কথায় থাকেন না, বললেন, ছেলেটাকে শেষ পর্যন্ত মর্কট বানাচ্ছ বউমা!
কী বলব এঁদের। পুরাতাত্ত্বিক ধারণা নিয়ে বসে থাকবেন, কোনো ইসথেটিক সেন্সই নেই।
তিতু বলল, মা, হোয়াট ইজ মর্কট, ইজ ইট রিলেটেড টু মার্কেট? একবার ভাবলুম মিথ্যে বলি। তারপর কেমন একটা পৈশাচিক আহ্বাদে বললুম, তোমার দাদু তোমাকে বাঁদর বলে গেলেন। মর্কট মানে বাঁদর।
সিলি ওল্ড ফুল।–তিতু বলল।
বড়ো আনন্দ হল। বহুদিন ধরে চেপে রেখেছি এঁদের বিরুদ্ধে একটা অসন্তোষ, ক্রোধ, এঁরা আমার সঙ্গে স্বাভাবিক ব্যবহার করেন না, নিন্দেমন্দ করেন আত্মীয়স্বজনের কাছে, কিন্তু তিতু এঁদের যথেষ্ট ভালোবাসে। ভালোবাসুক। তাতে আমি বাদ সাধতে চাই না। কিন্তু বুঝুক ও-ও বুঝুক এঁরা অচল। বুঝুক—এঁরা ওর মাকে শুধু শুধুই অবজ্ঞা হেনস্থা করে চলেছেন।
মিতালির বিয়ে হয়ে গেছে। বেঁচেছি। ইন্দ্রনীলের সঙ্গে নয়। ওর বিয়ে হল এক এন আর আই ডাক্তারের সঙ্গে। ওর বাবা-মা, এন আর আই-এর সঙ্গে দিতে চাননি। একমাত্র মেয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার হয়ে যাবে। কিন্তু মিতালি নিজেই জেদ ধরল। ইন্দ্রনীলকে এড়াতে চায় আর কি! এ পাত্রর সঙ্গে ইন্দ্রনীল তুলনায় আসে না। মিতালি গদগদ একেবারে। আমার কী? আমার কিছুতেই কিছু যায় আসে না-ইন্দ্রনীলই হোক আর চন্দ্রনীলই হোক। কিন্তু তিতু ওইটুকু ছেলে কী রকম মুখ শুকনো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রথমে ভেবেছিলুম-পিয়া চলে যাবে তাই বোধহয় মন খারাপ। কিন্তু সে কথা বলতে ছেলে ঝটকা মেরে চলে গেল। তারপরেই দেখলম ইন্দ্রনীলের সঙ্গে ঘরছে। তখনই বঝেছি। ইন্দ্রনীল আবার ওর কানে কী মন্ত্র দিচ্ছে কে জানে? আমার হয়েছে জ্বালা।
বউভাতে যাব বলে তৈরি হচ্ছি। তিতু বলল, যাব না।
সে আবার কি? ড্রেস করো।
শী ইজ আ চীট—তিতু বলল, ইন্দ্রনীল শুড কিল হার। আমি বললাম, কী বাজে বকছিস তিতু? পিয়া কাকে বিয়ে করেছে তাতে তোর কী? ওদের মধ্যে কী হয়েছে না হয়েছে তুই জানিস? এসব বড়দের ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামিয়ো না। জীবনে এ রকম কত হয়। সবচেয়ে যাতে ভালো হয়, সেটাই বেছে নিতে হয়।
আমার দিকে কটকট করে তাকাল ছেলে। বারো বছরের ছেলে, কী পাকা। পরিপক্ক একেবারে! আজকালকার ছেলেমেয়েরা অন্য ধাতের হয়। তোক বারো বছরের, তার সঙ্গে যে জীবন ও আচরণ সম্পর্কে একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করতে পেরেছি, এতে আমার মনটা প্রসন্ন হয়ে আছে। খুব শিগগিরই ও বড়ো হয়ে যাবে। আমার, আমাদের বন্ধু হয়ে যাবে। ভাবতে খুব আনন্দ লাগে। এখন থেকে ওর সঙ্গে একটু একটু করে সমানে সমান ব্যবহার করব। এতে ছেলেদের চিন্তাশক্তির বিকাশ হয়। দায়িত্ববোধ বাড়ে, জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা জন্মায়। নানারকম ঝামেলার মধ্যে দিয়ে হলেও ছেলেটা আমার মানুষ হতে চলেছে।
ওর যে কত কল্পনাশক্তি, কতটা স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস তৈরি হচ্ছে, সেটা আরও একটা ব্যাপার থেকে বোঝা গেল। ওদের স্কুলের অ্যানুয়াল কনসার্ট হল। পেরেন্টস ডে-তে আমরা দুজনেই গিয়েছিলাম। ঘোষণা করল, নতুন একটা দল এবার নেচে গেয়ে আসর মাতাবে, দল বা ব্যান্ডের নাম কী? না ভ্যাগাব্যান্ড। একদফা হাসির হররা উঠল। তার পর সাইকেডেলিক আলো জ্বলতে নিভতে আরম্ভ করল। দেখলুম গানে ওদের ক্লাসের রচপাল সিং, পাকাশনে জমির আলি, ক্যাসিও বাজাচ্ছে টুম্পা হাজারিকা, মাউথ অর্গ্যান নীলোৎপল আর নাচ তিতু, আমার তিতু। জ্যাকসনের মুনওয়াকিং করছে দেখলুম আমার ছেলে। ব্রেক করছে কী, একদম প্রভুদের মতো। মাতিয়ে দিল। হাততালি পড়ছে তো পড়ছেই। পড়ছে তো পড়ছেই।
