মিতালি বেমালুম অস্বীকার করে গেল। বলল, বাবাঃ, তোমার ছেলে ওকে যা ভালোবাসে। কাকু কাকু করে অস্থির। আমি কিছুই শেখাইনি, ও নিজের বুদ্ধিতেই ওসব করে। যা পাকা।
আমি চোখ গরম করে বললাম, আর কোনোদিনও যেন ওর সামনে এসব না দেখি। পাকা! না? একটা বাচ্চা ছেলের পরকাল ঝরঝরে করছ আবার বলছ পাকা!
যাও যাও। মিতালি বলল। তোমার মতো নীতিবাগীশদের ভেতরের কথা আমার জানা আছে। সুজিত সরকারের ছোটো বোন তো আমার সঙ্গে পড়ে!
আমার বুক হিম হয়ে গেল। কিছু বলতে পারলাম না। চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ে। পরে মনে হল চুপ করে গেলাম কেন? কড়া করে আরও দু কথা শোনাতে পারা উচিত ছিল। সুজিতের সঙ্গে যা ছিল তা চুকিয়ে বুকিয়ে তোদের বাড়ি এসেছি। সে নিয়ে কথা শোনাবার কোনও অধিকার মিতালির নেই। কিন্তু কার্যত কিছুই করতে পারলাম না।
বাড়িতে দুটো টিভি সেট। শ্বশুর শাশুড়িরটা বেশিরভাগেই মিতালির দখলে থাকে। নন-স্টপ এম চ্যানেল খোলা থাকে। মিতালি কতটা দেখে জানি না, কিন্তু তিতু দেখে, তিতু নাচে। স্বাভাবিক প্রতিভা ওইটুকু ছেলের, চমৎকার নাচে। মিতালির বন্ধুরা এসে ফরমাশ করে তিতু নেচে দেখায়। আমারও যে একটু-আধটু গর্ব হয় না তা নয়। আরও হয় মিতালির ঘরে। অ্যাকশন ছবি। এ ওকে মেরে দশতলা থেকে একতলায় ফেলে দিল। ও এর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন জ্বেলে দিল। দেখে আমি শিউরে উঠি। কিন্তু তিতু হাততালি দেয়। হাসে, বলে, মা দিস ইজ ফান। আমাদের আর একটা টিভি সেট আমাদের ঘরে থাকে। তিতুর বাবা সাতটা নাগাদ বাড়ি ফিরে চান টান করে টিভিটা চালিয়ে দেয়। হালকা করে। রঙিন ঘূর্ণি নাচ হতে থাকে। মাথায় ফেট্টি-বাঁধা খালি-গা হুমদো হুমদো ছেলেরা কাঁচুলি-পরা, ঝিলিমিলি মেয়েদের সারা শরীর চাটতে থাকে। মেয়েদের পেট নাইকুন্ডলী সুদ্ধ সাপের মতন দুলতে থাকে। মিলিত হবার নানান ভঙ্গি করে ওরা। তিতু চোখ সরাতে পারে না। ওর বাবার সামনে নীচু টেবিলে হোয়াইট হর্সের বোতল, লিমকা, মাছের কি মাংসের পকোড়া, আলগাভাবে টিভির ওপর চোখটা ফেলে রাখে সে।
আমি বিরক্ত হয়ে বলি, দেখবার কি আর জিনিস পাও না? এই একই পেট, একই কোমর দোলানো, একই ঠ্যাং নাচানো রোজ দেখতে হবে?
ঢুলুঢুলু চোখে চেয়ে তিতুর বাবা বলে, আরে বাবা দেখছি কি আর? মনটাকে অন্যমনস্ক রাখছি। ভাবতে হয় না, মাথাটা ফ্রি থাকে। সারা দিন যা যায়, জানো না। তো আর?
তুমি একটা উচ্চশিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ার মানুষ, তোমার মাথা ফ্রি রাখতে এই অখাদ্য জিনিস দরকার হয়? তিতু পড়তে বসবে চলো।–আয় কোনো ঘর আমাদের নেই। শ্বশুর-শাশুড়ির ঘর, মিতালির ঘর, আমাদের ঘর, আর একটা বসবার ঘর। বসবার ঘরে লোক আসে, বারবার দরজা খুলতে হয় বলে ওখানে বসতে আমি পছন্দ করি না। কিন্তু কী আর করব? ওখানেই বসি। তিতকে পড়াই। মিতালির ঘরের দরজা, মিতালির দাদার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিই।
দেখাও তিতু, আজকে কী হোম-টাস্ক আছে, এ কী! তোমার আঙুলে এমন কালশিটে পড়ল কী করে?
ক্লাসে বাংলা বলেছিলুম বলে আন্টি স্কেল দিয়ে মেরেছে।
চমৎকার! বাংলা বলেছিলেই বা কেন?
আমার যে দাঁত কনকন করছিল মা, আমি যে দাঁত কনকনের ইংলিশ জানি না, উস উস করছিলুম, আন্টি বকল, তাই তো আমি বললুম, আমার দাঁত কনকন কচ্ছে।
আর উনি তোমাকে মারলেন? দাঁত কনকন করা সত্ত্বেও?
ডি-সুজা আন্টি হেভি খচ্চর মা!
তিতু, কী বলছ?
রাজু তো বলে…
রাজু বলুক, তুমি বলবে না, খারাপ কথা। রাজুকেও শিখিয়ে দেবে খারাপ কথা না বলতে।
মা, বাংলা বললে মারে কেন মা? বাংলা বলা খুব খারাপ? বাংলাটা খারাপ কথা মা, খচ্চরের মতো? তোমাদেরও আন্টি মারে! পেরেন্টস ডে-তে?…
আমার পিত্তি জ্বলে যায়। আমার, সত্যি বলছি, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে হয় —হ্যাঁ হ্যাঁ তোদের ডি-সুজা অ্যান্টি হেভি খচ্চর, কুত্তি একটা, বেজন্মা কুত্তি।
কিন্তু এই নামজাদা প্রেপ-স্কুলে না পড়লে তিতু তো কোনও ভালো স্কুলে ভরতিই হতে পারবে না!
ডিং ডং ডিং ডং।
দরজার ফুটোয় চোখ রাখি। শ্বশুরমশাইয়ের বন্ধু রাখালবাবু।
আসুন কাকাবাবু-বিনয়ের প্রতিমূর্তি আমি।
বা বা বেশ বেশ, নাতিবাবু, পড়ছেন?
আর পড়ব না। রাখালদাদু এসছে, ভূতের গল্প বলবে।–তিড়িং তিড়িং নাচতে থাকে তিতু।
আর সয় না আমার। সারাদিন ধরে চাপা রাগ পুষছি। এক থাপ্পড় মারি তিতুর গালে।—পড়বি না? ইয়ার্কি পেয়েছিস?
তিতু বিরাট চিৎকার করে কাঁদতে থাকে।
রাখালবাবু বলেন, এ হে বউমা মারলে ছেলেটাকে? তুমি পড়ো দাদা। আমি আছি, ভূতের গল্প ভাবতে থাকি, যাবার সময়ে তোমায় ঠিক বলে যাব।
ভূতের গল্প রূপকথার গল্প এসব আমি পছন্দ করি না। অযথা ভয়ভীতি ঢোকে ছেলেদের মনে। আর রূপকথার গল্প মানেই তো যত গাঁজাখুরি। রাখালবাবুর আবার অভ্যাস আছে সব গল্পই দাদুভাইয়ের ঠিক রাজকন্যের মতো টুকটুকে বউ আসবে দিয়ে শেষ করার। একটা পুঁচকে ছেলের মধ্যে বউ-টউ ঢুকিয়ে দেওয়া একেবারে কুরুচির একশেষ বলে আমার মনে হয়। তা ছাড়া বাস্তবের সঙ্গে সম্পর্কহীন কতকগুলো গল্পকথা ছোটো থেকে শুনে শুনেই আমাদের বাঙালি জাতটা এমন হাঁদা ক্যাবলা উটমুখো হয়েছে।
আমি অনুযোগের সুরে বলি, কাকাবাবু, ভুতের গল্পগুলো ওর মাথায় আর নাই ঢোকালেন। এ ঘর থেকে ও ঘরে যেতে পারে না রাত্তিরে।
