তিতু বলে, ভ্যাট, কুমির নয় অ্যালিগেটর।
না কুমির।
তিতু এক ছপটি মারে রবিকে। আবার ভুল বলছিস। পড়াটা রবির কাছে একটু অতিরিক্ত হয়ে গেল। একদিন দোকানে জিলিপি কিনতে গিয়ে আর ফিরল না। নতুন জামাকাপড়, দু-জোড়া জুতো, নতুন ফিকে সবুজ মগ, দুধ, বই, খেলাধুলো সব ফেলে স্রেফ পড়ার ভয়ে রবি পালিয়ে গেল।
.
তিন
পারিবারিক অবস্থা ক্রমে ঘোরালো হয়ে উঠছে। কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল, কখন হয়ে গেল আমি বুঝতেই পারিনি। ঝড়ের আগে আকাশে তো লালরং দেখা দেবে? প্রকৃতি থমকাবে? কোনো সূচনাই যদি না থাকে তো মানুষ বুঝবে কী করে যে আবহাওয়াটা খারাপ হতে যাচ্ছে? কীভাবে সতর্কীকরণ করবে কূল উপকূল?… সমুদ্রগামী ধীবরদের সতর্ক করা যাইতেছে যে আগামী আটচল্লিশ ঘন্টা… কিছুই বুঝিনি। হঠাৎ যেন ঘুম ভেঙে উঠে দেখলাম একটা অপরিচিত বাড়িতে বাস করছি। দুজন অনতিবৃদ্ধবৃদ্ধা আমার সঙ্গে কথা বলেন না, বা বলেন, মেপে মেপে, কেটে কেটে। একটি তরুণী-বাড়িতে প্রায় তাকে দেখাই যায় না, রাতে শুতে। আসে, একটি অনতিযুবক অফিস এবং নিজের ঘরের মধ্যে স্বেচ্ছাবন্দি থাকে। মুখ গম্ভীর, আর আমি একটি অনতিযুবতি, আমার আবহাওয়াও খুব ভালো না, আমি। বেঁকে ঝেকে কথা বলি। যদি সামান্য হাঁ বা না বলি, তাতেও আমার ক্ষোভ, ক্রোধ ভরা থাকে।
বিয়ের পরে চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার স্বামী বারণ করেছিল। বলেছিল, ছাড়ছ ছাড়ো পরে ঠ্যালা বুঝবে। মেয়েরা যত ঘর-বসা হয় ততই প্রবলেম তৈরি করে…। আমি কিছু না বলে শুধু হেসেছিলাম, আত্মপ্রত্যয়ের হাসি। তা ছাড়া কর্মক্ষেত্রে যে সুজিত সরকার আছে সে কথা তো আমার স্বামী জানে না! তার আর দোষ কী! কিন্তু আমি একটা অন্ধ গলি থেকে বেরোতে চেয়েছি, চেয়েছি চূড়ান্ত পুরুষকারের সঙ্গে, কাজেই আমি বেসরকারি অফিসের চমৎকার চাকরিটা এককথায় ছেড়ে দিয়েছিলাম।
এখন বাড়িতে চব্বিশ ঘন্টা থাকি বলেই আমার চোখে পড়ে যায় দাদুর এঁটো চা সসারে ঢেলে তিতু চুমুক দেয়। চোখে পড়ে হাজাঅলা হাতে দিদা তিতুকে ভাত মেখে দিচ্ছেন। এবং কী সর্বনাশের কথা তিতু ছাতে গিয়ে পাশের বাড়ির মজনুকে ইশারা করছে, তার লায়লা অর্থাৎ তিতুর পিয়া অর্থাৎ আমার ননদ মিতালি তাকে ছাতে ডাকছে। মিতালি আর পাশের বাড়ির ইন্দ্রনীলের প্রণয়-কাব্যে আমার পাঁচ বছরের তিতু মেঘদূত। আরও সর্বনাশের কথা আমার স্বামী আজকাল বোজ অফিস থেকে ফিরে মদ্যপান করছে। নেশা বড়ো সাংঘাতিক জিনিস। কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনে এধার সেধার পার্টিতে গিয়ে গ্লাস হাতে ঘোরাফেরা করাটাই তো কেতা। তা সেই গ্লাসের ভেতরের জিনিস কখন ভেতরে চলে যাচ্ছে, আরও যাচ্ছে…যেতে যেতে প্রয়োজন তৈরি হচ্ছে, পিপাসা তৈরি হচ্ছে, নেশাড় তা বুঝতে পারে না। আমার স্বামীও বুঝতে পারেনি। তা ছাড়া মদ্যপান নিয়ে তুলকালাম করা আজকাল একেবারেই অচল। একটু উচ্চঘেঁষে মধ্যবিত্ত বাড়িতেই সন্ধেবেলা গেলে মদ অফার করছে আজকাল। আমার স্বামী যে চোখের বাইরে অন্যত্র খেয়ে আউট হয়ে ফিরছে না, ঘরে বসে অভিজাত ভঙ্গিতে খাচ্ছে, এবং ঈষৎ টং হয়ে থাকছে, ঈষৎ উত্তেজিত, খুশি-খুশি যেন কোনো টুর্নামেন্ট জিতেছে টেনিস কি ব্যাডমিন্টনে—এই ই তো আমার অনেক সৌভাগ্য।
কিন্তু এই সমস্ত কিছুর ফলে যা হচ্ছে তা হল বলতে পারছি না বলতে পারছি না করেও একদিন শ্বশুরমশাইকে বলে ফেলেছি, বাবা আপনি এঁটো চা-টা তিতুকে দিলেন?
কী করে ভাবলে তুমি কথাটা বউমা, আমার কি সামান্যতম সেনসও নেই?
চা-ই বা ওকে দেওয়া কেন?
ছেলেমানুষ বড়োদের জিনিস একটু-আধটু চাখতে চায়, থাক আর কখনও দোব।
আর দিলেনও না, আমার সঙ্গে উনি আর স্বাভাবিকও হতে পারলেন না। কেমন একটা চাপা ক্ষোভ পুষে রাখলেন।
শাশুড়িকে হাজার কথাটা কিছুতেই বলতে পারলাম না। ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করে মলম কিনে আনলাম। হাতে জল লাগানো বারণ। জল লাগলেই সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলতে হবে। দিনে রাতে তিনবার ওষুধ লাগিয়ে দিই। দেখতে পেলেই জলহাত মুছিয়ে দিই। কিন্তু জল ঘাঁটা বন্ধ করব কী করে? হাত সবসময়ে ভিজে, হাজা সেরে আসে আবার হয়। খোসা-ওঠা-ওঠা হাত। কী ঘেন্না যে করে! ফলে চাপা ক্ষোভটা আমার মধ্যে জমে থাকে। যখন তখন ঝেঝে কথা বলি। খাওয়ার সময় এলেই কাঁটা হয়ে থাকি।
তিতু নিজে নিজে খাও—
নো—দিদাই গরস পাকিয়ে দেবে…
আচ্ছা আমি দিচ্ছি।
তুমি যাও না বউমা। আমি দিচ্ছি।
আপনি গিয়ে বারান্দায় বসুন না, আমি তিতুকে খাইয়ে দিচ্ছি।
কী বললে? আমি সারাদিন বারান্দায় বসে থাকি?
উঃ তা কখন বললাম! বারান্দায় বসতেই তো বলছি।
ওই ঘুরিয়ে বলা হল।
চোখে আঁচল দিয়ে শাশুড়ি চলে গেলেন। আরও বেশি করে জল ঘাঁটতে লাগলেন। বউমা কাজের খোঁটা দিয়েছে কি না। শেষে আমি একদিন চিকার করে ফেললাম, উঃ, আমি ছেলেকে নিয়ে কোথাও চলে যাব। হাতময় যা করেছেন, সেই হাতে ওকে খাওয়াতে আপনার প্রবৃত্তি হয়?
আহত পশুর মতো আমার দিকে চাইলেন শাশুড়ি। চোখ ছলছল করছে। মুখে অপার বিস্ময়। আস্তে আস্তে চলে গেলেন। আমার নিজেকে মারতে ইচ্ছে করল। ভালোভাবে বুঝিয়ে সুঝিয়েও তো বলতে পারতাম! তবে বুঝিয়ে বললেও একই ফল হত, বিষয়টা এতোই স্পর্শকাতর।
মিতালিকে সোজাসুজি বললাম, হ্যাঁরে মিতা, তোর লজ্জা করে না পাঁচ বছরের বাচ্চাকে মাঝখানে রেখে প্রেম করছিস। ছি ছি। ওকে মিথ্যে বলতে শেখাচ্ছিস। ইশারা করতে শেখাচ্ছিস।
