.
দুই
তিতান, তিতাই এখানে এসো।
নো। তুমি দুধ খাওয়াবে।
দুধ তো খেতেই হবে বাবা।
কেন?
ছোটোদের খেতে হয়।
দাদাই কি ছোটো? দাদাই তো খায়। দাদাইকে দাও।
দাদাই তো খেয়েছেন।
তাহলে দিদাই?
দিদাইও খেয়েছেন।
তবে পিয়া?
পিয়াও খেয়েছে?
তবে বাবাই?
বাবাই খাবে, রাত্তিরবেলা।
তুমি?
আমি খেতে ভালোবাসি না তিতু। হাঙ্গামা করো না।
আমিও ভালোবাসি না।
তুমি ছোটো। চকলেট দিয়ে দিচ্ছি খেয়ে নাও।
রবিও তো ছোটো, ওরও তো জামাপ্যান্ট ছোটো, ও দুধ খেতে ভালোবাসে। কী রে রবি, বাসিস না?…
রবি আমাদের ফরমাশের ছেলে। সে চুপ করে থাকে।
দাও, ওকে দাও, ও তো রোগা, আমি তো মোটা, আমার তো ভুড়ি আছে।… আমি রাগ করে রান্নাঘরের দিকে চলে যাই। তিতু ছুটে আসছে।
দিলে না? রবিকে দিলে না?
দিচ্ছি। তাহলে তুমি খাবে তো?
আর্ধেকটা মা, ও মা, আর্ধেকটা… নেই-আঁকড়া আবদারের সুর তিতুর গলায়। এক গ্লাস দুধ অতএব দুটো কাপে ভাগ করি, হাতল ছাড়া রবির কাপ, আর তিতুর ফুলকাটা মগ।
রবি খুব কাঁচুমাচু মুখে কাপটা নেয়। এবং সেই মুহূর্তে ওর কাপটা ছিনিয়ে নিয়ে তিতু চোঁ করে দুধটা মেরে দেয়।
আমি হতভম্ব। রবির মুখ যেন অনেক টাকা চুরি করে ধরা পড়েছে।
তোমাকে তোমার কাপে দিয়েছিলাম। তুমি কেন ওরটা খেলে?
আমার কাপটায় রোজ খাই। রবির কাপটায় আজ খেতে ইচ্ছে হল।…
মস্ত বড়ো ফুটবল বগলে নিয়ে তিতু ছুট লাগায়, আর রবি, রবি আয়। রেগেমেগে বলি, রবি আবার কী? রবিদা বলতে পার না? তোমার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো।
রবি তো চাকর। চা করে। চাকরকে আবার দাদা বলে না কি? তিতু ছুটতে ছুটতেই বলে।
চাকর কথাটা আমাদের পরিবারে ব্যবহার হয় না, তিতু কোথা থেকে শিখল, আমি জানি না। চাকর বলে দাদা বলবে না। কিন্তু ছোটো বলে তাকে দুধ খাওয়াতে হবে। কী অদ্ভুত এলোমেলো বিচার!
তিতুর দিদা দুটো একরকমের মগ কিনে দিয়েছেন। একটা সাদা আর একটা হালকা সবুজ। রবি আর তিতুর সামনে রেখেছেন। বল, রবি কোনটা নিবি? তিতু কোনটা নিবি?
তিতু রবির দিকে তাকায়। রবি চোরা চোখে চায় তিতুর দিকে। রবি বুদ্ধিমান ছেলে, বোঝে সাদাটাই ওর নেওয়া উচিত। ও সাদাটা তুলে নেয়। আমার শয়তান ছেলে অমনি ছোঁ মেরে সেটা নিয়ে নেয়।
আমি রবিরটা নেব দিদা।
দিদা নিজের নৈরাশ্য চেপে বলেন, ঠিক আছে। যে যার পছন্দ করে নিলে। পরে কিন্তু পালটানো চলবে না। আমরা সবাই যে যার কাপে খাই। প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব কাপ দরকার। কেমন?…
কাপপর্ব চুকল। কিন্তু রবি পর্ব চুকলে তো!
রবি রান্নাঘরের মেঝেয় বসে খায়। কী মজা! টেবিলে খেতে হয় না। তিতুও মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে খাবে। খাক, তাই খাক। রবিকে টেবিলে তোলার চেয়ে তিতুকে মেঝেতে নামানো ভালো। খালি তীক্ষ্ণদৃষ্টি রাখি রবির পাত থেকে কিছু তুলে না খায়। স্বাস্থ্যের নিয়মকানুন শেখাই। রবিকে টুথপেস্ট ব্রাশ কিনে দিয়েছি। নতুন জামাকাপড়। দু-জোড়া জুতো। বাড়িতে রবি চটি পরে চ্যাটাং চ্যাটাং করে ঘুরবে কেউই সইতে পারবে না, সুতরাং তিতুই খালি পায়ে ঘোরে। শ্বশুরমশাই সান্ত্বনা দেওয়ার মতো করে বলেন, পায়ের সঙ্গে মেঝের মাটির কনট্যাক্ট ভালো বউমা, নার্ভের পক্ষে তো বিশেষ ভালো। দেখবে, প্রথম প্রথম সর্দি-কাশি হলেও পরে ইমিউনিটি গ্রো করবে।
কিন্তু তিতু ভীষণ বাড়াবাড়ি শুরু করেছে ক্রমশ। নিজের ঘর ছেড়ে সিঁড়ির তলায় রবির বিছানায় গিয়ে শুয়ে থাকবে। কী? না চায়ের দোকানের গল্প শুনবে। রবি কিছুদিন চায়ের দোকানে কাজ করেছিল। কারখানার গল্প শুনবে। কী না, রবি কিছুদিন পেলাস্টিকের কারখানায় কাজ করেছিল। ভিক্ষের গল্প শুনবে। রবি কিছুদিন নাকি ভিক্ষেও করেছিল।
একটা ন বছরের ছেলের কত ঘাটে জল খাওয়ার অভিজ্ঞতা তাই ভাবি। ওর মা বাবা কী রোগে মারা যায়, রাস্তায় ঝুপড়িতে থাকত। সেই সময়ে ভিক্ষে করত, বাবু, আমার মা বাপ মরে গেছে, পঁচিশটা পয়সা দাও বাবু, মুড়ি খাব-ও-ও।
একদিন তিতু সুর করে বলতে বলতে বলতে ঢুকল। চোখ আধবুজোনো, মুখটা জলে মাখামাখি।
কী করছ, তিতু? ছিঃ, বাবা বলল।
ভিক্ষে করছি তো? আমার বাবা মা মরে গেছে। ওলাউঠো হয়েছিল গো বাবু!
তি-তু!—জোরে চেঁচাই।
ও কি কাঁদছেও?—ওর বাবা জিজ্ঞেস করে।
জল লাগিয়েছি তো মুখে। বাবা মা মরে গেলে কাঁদতে হয়!…
তিতু জ্ঞান দিয়ে সরে পড়ে।
আমার স্বামী বলে—এসব কী?
রবি। রবির থেকে…
তাড়াও, তাড়াও, অবিলম্বে তাড়াও রবিকে।
যদি কিছু হয়?
কী আবার হবে, ও সব চরে খাওয়া ছেলে, গোটা পঞ্চাশ টাকা এক্সট্রা দিয়ে বিদায় করো।
আমি রবির কথা বলছি না। তিতু ওকে খুব ভালোবাসে। ওর যদি…
কিছু হবে না, মনকে শক্ত করো, বাচ্চারা খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যায়।
আমি তা সত্ত্বেও ইতস্তত করি। শিশু মন! কীভাবে যে কী আঘাত করে। কিন্তু রবি নিজেই একদিন চলে যায়। চলে যায় তিতুর অত্যাচারেই। রবিকে পড়তে হবে। ওর সঙ্গে। রবি একদম পড়তে ভালোবাসে না। পয়সার হিসেব করে চমৎকার। ছবি দেখতেও খুব ভালোবাসে। কিন্তু কিছু শেখাতে গেলে ওর মাথায় আর কিছু ঢোকে না। পড়াশোনার মতো বিচ্ছিরি কাজ তিতু একা করবে, রবি পার পেয়ে যাবে, এটা তিতুর পছন্দ নয়। এ ফ অ্যালিগেটর, বি ফ বেবুন, সি ফ ক্যামেল, ডি ফ ডগ। সে রবিকে পড়াতে থাকে। রবি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে, বলে, যখন মা-বাবার সঙ্গে থাকতুম, এইরকম কুমির দেখেছিলুম, সাতটা আটটা, মা বললে কাগচের। কিলবিল করে বেড়াচ্ছিল।
