মা কিছু বলেন না, শুধু আমার পিঠের ওপর মার হাতের উষ্ণ চাপটা অনুভব করি। আর তখনই বুঝি-মা আর তার সন্তান, এই-ই সব। আর যা কিছু শুধু আয়োজন। শুধু ভূমিকা। শুধু নান্দীমুখ। আমার নিজের নতুন উপলব্ধি নিয়ে পৃথিবীর দিকে, সংসারের দিকে তাকাই। গোপন অনুভবের তাড়সে হাসি। উষ্ণ, প্রসন্ন, সব বোঝার, সব মানার হাসি। হয়তো শ্বশুর-শাশুড়িরা দুজনে গল্প করছেন। রাস্তায় সন্ধে, ধূসর তারারা আকাশে, আমি তিতুকে খাওয়াচ্ছি। শরীরের মধ্যে থেকে একটা গভীর তরল আনন্দের স্রোত উঠে আসছে। শ্বশুর-শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে মনে মনে বলি, যতই বল আর যতই কর, তোমাদের প্রাসঙ্গিকতা
একজোড়া ভূতপূর্ব জনক-জননীর, যারা নাকি আরও একজনকে জনক হওয়ার জন্যে পৃথিবীতে এনেছিল।
আমার বর অফিস থেকে ফিরে কফি খায়, আরামে চোখ বুজে বলে, আরও একটু ওপরে উঠলাম।
আমি ভাবি—তোমার ভূমিকা অর্ধেকের ওপর পালন করা হয়ে গেছে মহাশয়, এখন তুমি অবান্তর। তবে হ্যাঁ। তোমার উপার্জিত অতিরিক্ত টাকাটা, হয়তো অবস্থানটাও তিতুর কাজে লাগবে।
ননদ বলে, ওঃ বউদি, কী সর্বক্ষণ বাচ্চা নিয়ে লটপট করো বলো তো! চলো একটা ছবি দেখে আসি। ওকে মার কাছে রেখে চলো।
আমি রাজি না হতে ও বিরক্ত হয়ে বন্ধুকে ফোন করতে চলে যায়। আমি বলি, আর কদিন? তৈরি হচ্ছ, তোমার জমিও তৈরি হচ্ছে। কত নাচনকোঁদন এখন, ভাবছ তুমি একটা তুমি। ভীষণ আলাদা। ভীষণ একটা ভিন্নতা তোমার। অহম। জানো না, তুমি তিতুর জন্য পূর্ব হইতেই বলিপ্রদও। বলি কথাটা শুনতে খারাপ লাগে। কিন্তু বলি মানে কি? ভাগ। তুমি তিতুর ভাগে। তোমার জন্ম একজন তিতুর জন্যে। সারা পৃথিবী জুড়ে এই তিতুদের আনবার খেলা অনন্তকাল ধরে হয়ে চলেছে। তুমি নিমিত্তমাত্র। কিন্তু নিমিত্ত, শুধু নিমিত্ত হওয়ারও কী স্বস্তি! কী আনন্দ।
তিতু হামা দিচ্ছে, বাঘের মতো, বাঘের বাচ্চার মতো। কিছুটা গিয়ে তিতু গ্রুপ করে বসল। কোমর মুচড়ে পেছন ফিরে তাকিয়েছে আমার দিকে। হাসছে। চোখ দুটো? চোখ দুটো কী? আকাশ? সমুদ্র? না। না। আকাশ সমুদ্রের মধ্যে কেমন একটা রহস্যময় গভীরতা আছে। শিশুর চোখে সেসব থাকে না। শিশুর চোখ ভাবায় না। শুধু ভেতরটা গলিয়ে দেয়। শিশুর চোখ বিশুদ্ধ আনন্দ। তিতুর এই ভঙ্গি ও এই হাসি এই চাউনির দিকে তাকিয়ে আমার সুজিত-সংক্রান্ত ব্যথার কথা মনে পড়ে হাসি পেয়ে যায়। খুব অবান্তর লাগে তিতুর যাবার যত ভয় পাওয়ানো কথাবার্তাও।
তিতুর বাবা বলে, কী ব্যাপার? আজকাল তো তুমি আর নালিশ করো না?
কীসের নালিশ?
বাঃ, ওই যে তুমি বলতে আমার নাকি হৃদয় নেই, মন নেই, মনের খবর তো কই আর নিতে দেখি না।
তোমার মনের খবর তুমিই রাখো বাবা, আমার কাজ নেই—আমি হেসে উড়িয়ে দিই।
সে কী? আচ্ছা ধরো, মনটা যদি আর কাউকে দিয়ে ফেলি?
তিতুকে কোলে নিয়েছিলাম। সে দু হাত বাড়িয়ে বাবার কাছে যায়। আর কাউকে মন দেওয়ার কথা জনক বেমালুম ভুলে যায়। কী খেলা! কী খেলা! হাম দিতে গিয়ে তিতু বাবার গাল কামড়ে ধরছে। দাঁত উঠবে, মাড়ি সুড়সুড় করছে বোধ হয়। বাবা হেসে অস্থির।
এই আমার কাতুকুতু লাগছে। কাতুকুতু দিচ্ছিস কেন?
যত অবোধ হাসি ছেলের। তত হাসি বাবার। অর্থাৎ কি না যে মন ছিল না, ফোকলা ছিল মনের জায়গাটা, সেখানে কচি একটা মন গজিয়েছে, মনটা অন্য আর কাকে দেবে? বাবা তিতু সোনাকেই দিয়ে দিয়েছে। কখনও কখনও তিতুর বাবা বলে, আমাকে হয়তো বছর দুয়েকের জন্যে বাইরে পাঠাবে। তুমি, তোমরা যেতে পারবে তো?
তিন বছরে তিতুকে স্কুলে ভরতি করতে হবে, তার আগে হলে পারব, নইলে…
হুঁ, ওর বাবা চিন্তিত হয়ে পড়ে। আমি হাসি। যাও এবার কোথায় যাবে!
শ্বশুরমশাইয়ের সঙ্গে আমার খুব জমে। মানুষটা দার্শনিক প্রকৃতির। একটু শুদ্ধ করে কথা বলবার বাতিক আছে। সেটা ওঁর ছেলেমেয়ের কাছে হাসির জিনিস। স্ত্রীর কাছে বিরক্তিকর। আমার খারাপ লাগে না। সব সময়ে তো বলছেন না। মেজাজ এলে বলছেন।
উনি বলেন, আচ্ছা বউমা, এই যে তিতু আসাতে সংসারের মধ্যে একটা পরিবর্তন এসেছে, এটা টের পাও?
আমি কিছু বলি না, হাসি খালি।
উনি নিজের বলার আনন্দেই বলেন, তোমরা ধরো, আর আগের মতো নেই। খুব গৃহকেন্দ্রিক হয়ে গেছ। বা তিতুকেন্দ্রিক হয়ে গেছ। সে কী বাচ্চাটার তোমাদের প্রয়োজন বলে? কক্ষনো না! আসলে শিশুর মধ্যে দিয়ে আমরা নিজেদেরই নতুন করে পাই। রিনিউ করি। নিজেদের প্রতিচ্ছবি, নিজেদের পুনরাবৃত্তি, নিজেদের চিরায়ণ এটাই গোপন সত্য।—উনি তো আমার মতামত চান না। নিজের কথা, নিজের উপলব্ধির কথাই বলে চলেন। আমার মত যদি চাইতেন তো বলতাম—প্রতিচ্ছবি, পুনরাবৃত্তি ওসব বাজে কথা। এই যে তিতুটা হয়েছে, ও কি আমার মতো? ওর বাবার মতো? কোনোখানটাও নয়। ওর মধ্যে মাঝে মাঝে আমার ভাই টুলুর আদল দেখতে পাই, মাঝে মাঝে আমার শাশুড়ির আদল দেখতে পাই। শ্বশুরমশাই বলেন তিতু নাকি ওঁর বড় ছেলে, তিন বছর বয়সে যে মারা যায় তার মতো দেখতে। তা সেই তিন বছরের পুচকে ভাসুরের আমার কোনো ছবিই নেই। তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশ বছর আগে মৃত একটি শিশুর মুখ কী ওঁদের সত্যিই মনে আছে? আসল কথা, তিতু তিতুর মতো। সব শিশুর যা যা সাধারণ লক্ষণ থাকে সেই লক্ষণগুলো মিলিয়ে তাকে অন্য কোনো শিশুর মতো লাগতে পারে, কিন্তু ও নতুন। ও আলাদাও।
