আমরাও যাব মা, আমাদেরও নিয়ে চলো। আমাদেরও,–গোলাপি ঘরের স্বপ্নে কুঁদ হয়ে আমরা বলি।
কিন্তু ওখানে তো ছোটোদের, ছোটোদের কেন, কাউকেই নিয়ে যাওয়া যায় না। ও ঘর শুধু আমার, একা আমার। ওখানে কোনো ভাবনা-চিন্তা নেই, দুঃখ নেই, ভয় নেই। খালি গান, নদী, পাহাড়, জঙ্গল, সবুজ মাঠ।…
এইবারে ধরে ফেলেছি। আমাদের সঙ্গে চালাকি, না?
বলি, এই যে বললে একটা ছোট্ট ঘর। ওর মধ্যে পাহাড়, জঙ্গল, মাঠ নদী এসব ধরবে কী করে? সব মিছে কথা।…
মায়ের অঙ্গ থেকে এখন রহস্য ঝরে ঝরে পড়ছে, মুখে একটা আবিষ্ট হাসি। বললেন, বুঝতে পারছিস না মিঠু। ওইটেই তো ম্যাজিক ঘরটার। তুমি যা-যা চাও, যা-যা ভালোবাসো সব, স-ব ওখানে পাবে।
আমরা যখন বড়ো হয়ে যাব, অনেক বড়, তখনও ওখানে যেতে পারব না?
নিশ্চয়ই পারবি। কিন্তু সেটা অন্য ঘর। ঘর আকাশ-নীল, কিংবা কচি কলাপাতা বা পেস্তার মতো সবুজ, হাতির দাঁতের মতো বা খুব হালকা বেগুনিও হতে পারে। কিন্তু গোলাপি ঘরটা শুধু আমার, একা আমার। ওই রংটা, আমার নিজস্ব রংটা আর কোথাও লাগানো যাবে না। ওই ঘরটাতেও কাউকে নিয়ে যাওয়া যায় না।
ছেলেমেয়েকেও না!
না।
আমরা বিমর্ষ মুখে চুপ করে যাই। একটু পরে মিয়োনো গলায় জিগ্যেস করি, ও লোকটা কে, যার সঙ্গে তুমি কথা বলো?
কিন্তু যতবার জিগ্যেস করি, মা শুধু আমাদের বুকের মধ্যে টেনে আদর করেন, চুমো খান, উত্তর দেন না।
আজ এতদিন পর, বহু রুক্ষ বছরের ভয়ংকর লড়াই, ভয়ংকরতম যন্ত্রণা, একটা গোটা জীবন-ভরতি বিদ্বিষ্ট মুখপ্রবাহ এবং প্রাণ-অবশ-করা লাঞ্ছনার মধ্য দিয়ে পথ চলবার পর, মা যখন আর ইহজগতে নেই, যখন আমি আমার সেই নীল ঘরটা পেয়ে গেছি—আকাশের মতো নীল ঠিক যেমনটি মা বলেছিলেন, যখন জেনে গেছি এই ঘর ইচ্ছে করলেও কারও সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া যায় না, তখন অর্থাৎ এখন বুঝতে পারি মা কার সঙ্গে অমন কাতর ভরসায় কথা বলতেন। দেবতা ঠিকই। কিন্তু মৃত্যুর নয়। জীবনের।
চারপর্ব
তিতুকে আমরা অনেক পরিকল্পনা করে, অনেক অঙ্ক কষে এনেছিলাম।
বিবাহবার্ষিকীর পাঁচ বছর পরে। প্রথম বছরটা প্রোবেশন পিরিয়ড। আমার বরই বলেছিল কথাটা।—বিয়েটা টিকবে কি না বুঝতে দাও! আমার বুক কাঁপিয়ে বলেছিল আমার বর।
কী করে বুঝবে?
বাঃ, গুরুতর মতবিরোধ হচ্ছে কিনা, বাড়ির আর সবার সঙ্গে মানাতে পারছ কিনা…
মানতে না পারলে?
হাত উলটে ও বলল, কী আর করা, আলাদা সংসার ফাঁদতে হবে। আপনি আর কপনি।
আর গুরুতর মতবিরোধ হলে?
একটু ভাবনার কথা হবে। লাঠালাঠির পর্যায়ে চলে যাবার সম্ভাবনা থাকলে বা পরস্পরের কম্প্যানি তেতো বড়ির মতো লাগতে থাকলে, চটপট গাঁটছড়াটা খুলে…
থাক থাক, চুপ করো—আতঙ্কে শিউরে উঠি আমি।
ও হাসছিল। কিন্তু নিশ্চিন্ত নিরাপত্তার ভাবটা আমার সেই দিনই উবে গিয়েছিল। কত কষ্ট করে, চোখের জল সামলে, মা-বাবাকে চোখের জলে নাকের জলে করে এই নিরাপত্তাটুকুর জন্যেই তো বিয়ে করা! নিজের ওপর যদি ভরসা থাকত সুজিতদার সঙ্গে ব্যাপারটাই তো চালিয়ে যেতে পারতাম। সুজিত সরকার আমার কলিগ। সব দিক থেকে আমার পছন্দ, আমার উপযুক্ত। চেহারায়, স্বভাবে, গুণে। দোষ শুধু একটাই। মানুষটি বিবাহিত।
যেদিন বাবা-মাকে বললাম বিয়ে করব, পাত্র দেখো। দুজনেরই তো আনন্দে কাঁদবার অবস্থা। কোনোদিন মুখ ফুটে বলিনি, কিন্তু সুজিতের ব্যাপারটা ওঁরা জানতেন, কাঁটা হয়ে থাকতেন।
বলেছিলাম, যাকে-তাকে কিন্তু বিয়ে করব না। শতকরা শত ভাগ সলভেন্ট হওয়া চাই। আমি যদি চাকরি করি নিজের ইচ্ছেয় করব, প্রয়োজনে নয়। বাড়ি আধুনিক হবে। দেওর-ননদে আপত্তি নেই।
আসলে আমি হইচই করে বাঁচতে চেয়েছিলাম। সব সময়ে একটা হালকা বাতাস বইলে আকাশে মেঘ জমতে পায় না। এমনই আমার বিশ্বাস। বড়ো চাকুরে ইঞ্জিনিয়ার জোগাড় হল। মা-বাবা এবং একটি বোনের সংসার। বাবা এখনও চাকরিতে আছেন। বোন বি এসসি পড়ছে। আলাপ করে ভালো লেগেছিল। মা বাবা সাধ্যাতীত দিয়েছিলেন। প্রোবেশনের কথায় আত্মারাম আমার খাঁচা ছাড়া। তখন থেকেই আমি তিতুর জন্যে হন্যে হয়ে উঠেছিলাম।
আমার বর কীরকম আড়ো আড়ো, ছাড়ো-ছাড়ো। কাজের কথা ছাড়া কথা নেই। মন বা হৃদয় যে ওর দেহের কোনখানটায় থাকে আমি খুঁজে পাইনি। অথচ মানুষটা দেখতে ভালো, হাসে, হাসাতে পারে, মিশুক। সবই। তবু তবু কেমন যেন। সুজিত সরকারের আমার জন্যে সেই আর্তি! নাঃ, সুজিতই আমার প্রত্যাশা বাড়িয়ে দিয়েছে হয়তো। হয়তো এমনিই হয়। দেখে-শুনে বিয়ে মানেই তো ম্যারেজ অব কনভিনিয়েন্স।
চার বছর আমরা উড়ে উড়ে বেড়ালাম। হংকং, জাপান, মরিশাস, ব্যাঙ্কক, ম্যানিলা…।
বাচ্চাকাচ্চা থাকলে কী আর ওর সঙ্গে এভাবে স্বল্প নোটিসে ঘোরাঘুরি করতে পারতাম।
কিন্তু পঞ্চম বছরে আমি একেবারে মরিয়া হয়ে গেলাম। এবং দেখা গেল চিকিৎসা ছাড়া তিতু আসার বাধা আছে। তো চিকিৎসা করানো গেল। এবং তিতু এল। আমার কোল আলো করে। মন ভালো করে। কেউ জানে না আমি জানি তিতু, তিতুই এখন আমার সব। আমার মনের ভাব আমি ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করি না। কিন্তু নিজের মনের মধ্যে তিতুকে নিয়ে বুদ হরে থাকি।
আমার মা আলো-আলো মুখে বলেন, কী রে, এবার সুখী হয়েছিস তো?
আমি মাকে জড়িয়ে ধরি, তুমি এরকম সুখী হয়েছিলে মা? আমাকে পেয়ে? টুলুকে পেয়ে?
