ওই দেখেই তো বুলাটা ভুলেছে।
বুলার সামনেই আলোচনা হচ্ছিল। সে এই সময়ে ফোঁস করে ওঠে, তুমি ভোলনি? মা ভোলেনি? কী চমৎকার কথাবার্তা! রাজপুত্রের মতো চেহারা!–বলোনি?
তা বোধহয় বলে ফেলেছি, আবছাভাবে হলেও মনে পড়ছে—বাবা স্বীকার করেছিলেন। মা স্মিত মুখে চুপ।
তবে? দোকানদার শুনেই চুপসে গেলে?—বুলা বেশ চোখা চোখা কথা ব্যবহার করতে ভালোবাসে।
বাবা হেসে ফেলেন, সত্যিই তোর এত পছন্দ? হাবুডুবু খাচ্ছিস? না কী?
খাচ্ছিই তো!
আর ও? ও কী খাচ্ছে?
ও বিষম খাচ্ছে। বলছে কোনোদিন যদি উন্নতি করতে পারে, আ চেন অফ শো রুমস ইন অল দা বিগ সিটিজ অফ ইন্ডিয়া, সে দিনই ও আমাকে প্রোপোজ করার কথা ভাবতে পারে!
কথাটা তো ঠিকই বলেছে। কাণ্ডজ্ঞানটা তাহলে আছে।
হয়তো বম্বে, দিল্লি, মাদ্রাজ, সরি, মুম্বই, দিল্লি, চেন্নাইয়ে দোকান-শৃঙ্খল ওর হবে বাবা। তবে তখন আর আমি বিবাহযোগ্য থাকব না। আমিও তখন তোমারই মতো রিটায়ার্ড।
মেয়ের কথার ধরনে বাবা-মা হেসে ফেলেছিলেন। একমাত্র সন্তান, কত আদরের। তার কথা কি শেষ পর্যন্ত ফেলতে পারেন?
তা জামাই দেখে সব ধন্য-ধন্যই করেছিল। বুলাও খুব জ্বলজ্বলে চেহারার মেয়ে। দু-তিন পুরুষে ধনীর ঘরে যেমন হয়। ফর্সা রং, বড়ো বড়ো চোখ, চোখা নাক। কিন্তু কুমারেশের রূপ একেবারে অন্য গোত্রের।
বেড়াতে বোররাতে ওদের একটু দেরিই হয়ে গেল। প্রথমত কুমারেশ তার বিয়ের যৌতুক পাওয়া ল্যান্সডাউনের শো রুমটা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত ছিল। দ্বিতীয়ত প্রচণ্ড গরম। ডিসেম্বরের গোড়া এখন। যখন দেখা গেল ভারতের সব বিখ্যাত রূপমহলই বুলার দেখা, তখন কুমারেশ এই চমৎকার ভ্রমণসূচিটি তার মাথা থেকে বার করে।
গিরিডি গিয়েছো? ফুলডুংরি? রাজরাপ্পা? রাজগির?
এত কাছে, অথচ বুলা যায়নি। সুতরাং সব ঠিকঠাক করে গর্বিত হাসি হেসে কুমারেশ বলে, চলো যাই বিহারে।
নির্জনতার খোঁজে সে তার বউকে নিয়ে অদ্ভুত সব রোমাঞ্চকর জায়গায় ঘুরবে। বুনো ঝোরার ধারে ছিন্নমস্তার মন্দির, শাল-মহুয়া-পলাশ-পাইনের জঙ্গলে ছাওয়া ম্যাগনোলিয়া পয়েন্ট যেখানে ভালুকের ভয় আর সূর্যোদয়ের রোমাঞ্চ দুটোই সমান উপভোগের, পাহাড়ের ঢালে পাখির কলকাকলিতে ভরা নিঃসঙ্গ লেক…
কিন্তু আশ্চর্য কথা উশ্ৰী ফলসে ওরা অভীষ্ট নির্জনতা পেলই না। ফলসটাকে ঘিরে কত যে পিকনিক পার্টি। কত যে রকম-বেরকমের পোজ আর সেই সঙ্গে ক্যাসেটের কী যে মস্তানি! তবে কুমারেশের মতো গোমড়া মুখে বুলা বসে থাকেনি। সে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে পিকনিক পার্টিদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে, উশ্রীর এলোচুলের ধারায় চান করে যথাসম্ভব মজা করে নিয়েছে। উশ্রী বড়ো ভয়ংকরী। ওখানে চানটান করা বিপজ্জনক। ওরা দেখেছিল সেই স্পটটা যেখান থেকে পা ফসকে পড়ে বোল্ডারের পর বোল্ডারের ধাক্কা খেতে খেতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ভেসে গিয়েছিল একটি বেপরোয়া ছেলে মাত্র মাস তিনেক আগে।
তবু বুলা তাকে নামিয়েছিল, নিজে তো নেমেছিলই। একবার নামবার পর কুমারেশেরও নেশা ধরে গিয়েছিল। আর একটা, আরও একটা পাথরে যাবার জন্য ছটফট করছিল সে।
এই সময়ে একজন পেছন থেকে চেঁচিয়ে ওঠে, অনেক হয়েছে দাদা, খুব বীরপুরুষ আপনি, আর এগোলে নিজে যদি বাঁচেনও, বধূহত্যার দায়ে পড়বেন নির্ঘাত।
কুমারেশ ভয় পেয়ে যায়, প্লিজ বুলা এবার ফেরো।
ওঃ, তুমি এক ভীতু!–বুলা ঝাঁকিয়ে ওঠে। কিন্তু বুদ্ধগয়ার সেই অশোকের-আরম্ভ-করা কানিংহানের-শেষ-করা মন্দির, শ্রীলঙ্কা থেকে আনা বোধিবৃক্ষের ছায়া আর আকশেছোঁয়া বুদ্ধমূর্তি দেখে ও কেমন ঘোরে আছে। জাপানি ছেলেগুলির মধ্যে তোসিকোই একমাত্র একটু ভাঙা ভাঙা ইংরেজি বলতে পারে, দু-দিন বোধগয়ার আই.টি.ডি.সি-র হোটেল অশোকে থাকাকালীন বুলা ওর কাছে থেকে বৌদ্ধধর্ম সম্পর্কে অনেক জাপানি জ্ঞান সঞ্চয় করছিল এবং ওকে তথ্য দিচ্ছিল।
ওই দেখো ওই গৃধকূট—ভীষণ উত্তেজিত হয়ে বলল বুলা।
ড্রাইভার বলল, বহি গৃধকূট, মেমসাবনে ঠিক বোলি।
তুমি চিনলে কী করে?—কুমারেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। বুলা হাতটা মাছি ওড়াবার ভঙ্গিতে নেড়ে বলল, দেখলেই তো বোঝা যায়। শকুনের পিঠের ঢালটা তার পর মাথার গোল আর বাঁকানো ঠোঁটের শেপ দেখলেই চিনতে পারা যায়। লম্বা গলাটা নেই।
তোসিকোদের যতই দেখায় সে, তারা চিনতে পারে না, কুমারেশ তো নয়ই।
রাজগিরের টুরিস্ট বাংলোয় বুকিং ছিল। পা দিয়েই কুমারেশ খুশি হয়ে উঠল। সারা দোতলাটায় এক বৃদ্ধ অস্ট্রেলিয়ান দম্পতি ছাড়া কেউ নেই। জাপানি তিনজন নীচে। ব্যাস।
এই নাও তোমার নির্জনতা।–কুমারেশ হেসে উঠল।
আমার নির্জনতা মানে? লোকজন হইচই আমার সবসময়ে ভালো লাগে। নির্জনতা তোমারই বেশি দরকার মনে হচ্ছে। এমন করছ যেন কোনোদিন আর
আমাকে একা পাবে না।
ভ্রূভঙ্গি করে বুলা কুমারেশের কাছে ঘেঁষে আসে। তার মাথা কুমারেশের কাঁধ ছাড়িয়ে, মুখটা উঁচু করে সে আয়নার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, দেখো দেখো!
আসল তোমাকে দেখব, না তোমার ছায়া দেখব?
আমাকেও না, আমার ছায়াও না, খাজুরাহোর ওই মিথুন-মূর্তি দেখো আয়নার
এমন একটা মুগ্ধ আকুলতার সঙ্গে সে কথাগুলো বলে যেন সত্যিই কোনো শিল্পকৃতি দেখছে, যেন এক দম্পতির ক্ষণ-মিলনের দৃশ্য থেকে সত্যিই সে শাশ্বত মিথুনের কোনো দর্শনে পৌঁছে গেছে।
