মনে হচ্ছে না আমরা অনেক আগের যুগে ফিরে গেছি? বলতে বলতে শিউরে ওঠে বুলা।
…রাজগৃহ থেকে রাজগির। রাজগিরের পথে-পথে পায়ে-পায়ে ইতিহাস। গাইড বলছিল, অজাতশত্রু রাজা এই শহরের নাম দেন গিরিজ।
না তো! বুলা বলে, গিরিব্রজই আগেকার নাম। জরাসন্ধের সময়ে মানে মহাভারতের কালেই গিরিব্রজ নাম ছিল। রাজগৃহ নাম তো বিম্বিসারের সময় থেকেই।
জাপানিদের সে বুঝিয়ে দেয়। ওরা পাঁচজনে এই গাইডের শরণ নিয়েছে।
এই হল অজাতশত্রুর দুর্গা পথের আশেপাশে ভগ্ন প্রাচীন প্রাচীরের ধবংসাবশেষ দেখিয়ে গাইড বলে।
না তো! অজাতশত্রুর দুৰ্গটা পাটলিপুত্র মানে পাটনায়। বৈশালীর ঠিক উলটো দিকে স্ট্রাটেজিক পয়েন্টে দুৰ্গটা করেন অজাতশত্রু। এ দুর্গ তো মহারাজ বিম্বিসারের করা। অজাতশত্রু তাতে হয়তো কিছু যোগ করেন।
ইউ সিম তু নোলত হিসত্রি? তোসিকো শ্রদ্ধার চোখে তাকায়, ইউ স্তাদি?
বুলা হেসে মাথা নাড়তে থাকে। না না, সে কিছুই জানে না। ক-টা কথা বলেছে বলেই এরা তাকে পণ্ডিত ঠাউরে নিয়েছে।
মূল রাস্তা তো দুটো? ওমা ওই তো বেণুবন, ঢুকব না আমরা? সে ব্যস্ত হয়ে ওঠে।
গোছা গোছা বাঁশগাছ ফোয়ারার মতো আকার নিয়ে ওপরে ঠেলে উঠছে, ঠিক, ওটাই বেণুবন।
তবে যে বললে রাজগিরে আগে আসোনি?–কুমারেশ জিজ্ঞেস করে।
আসিনিই তো। হয়তো পড়েছি। হয় তো পড়িনি.মুখে রহস্য মেখে কুমারেশের দিকে তাকায় বুলা।
মস্ত বড়ো ফলকের ওপর বেণুবনের পরিচয় লেখা এই বেণুবন বা বেলুবন ছিল লর্ড বুডটাকে মহারাজ বিম্বিসারের প্রথম উপহার। জীবনের বারোটি বছর বেণুবনে দেশনা করেন লর্ড বুডটা। অনুপম সৌন্দর্যের জন্য বেণুবন ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়।
বাঁশগাছগুলো গোছা গোছা করে লাগিয়ে মন্দ দেখাচ্ছে না অবশ্য। কিন্তু এমনকী সৌন্দর্য আছে এর, বুঝলাম না—কুমারেশ বলে।
তুমি কী মনে করেছ শুধু বাঁশগাছ দিয়ে বেণুবন সাজানো ছিল? বেণুর সৌন্দর্য অনুভব করে বিম্বিসারের বনবিভাগ বেণুর একটু প্রাচুর্যই রেখেছিলেন অবশ্য। কিন্তু আরও বহুরকম গাছ ছিল এ বাগানে। ফুলের তো সীমাসংখ্যা নেই। এত সুন্দর ছিল এ বাগান যে বিম্বিসার তাঁর এক রানি ক্ষেমাদেবীকে বেণুবনের সৌন্দর্য দেখাবার ছল করেই বুদ্ধদর্শনে নিয়ে এসেছিলেন।
কেন? ছল করে কেন?—কুমারেশও বেশ কৌতূহলী হয়ে পড়েছে।
রানি ক্ষেমা যে গোড়ার দিকে বুদ্ধের ওপর হাড়ে চটা ছিলেন। ওই রানিই এই বেণুবনে বুদ্ধকে প্রথম দেখবার পর এমনই প্রভাবিত হন যে প্রব্রজ্যাই নিয়ে ফেলেন। এই যে এইখানে রানি ক্ষেমার সঙ্গে গৌতম বুদ্ধের প্রথম দেখা হয়েছিল।–নাটকীয়ভাবে বুলা একটা অশ্বত্থ গাছের দিকে আঙুল দেখায়।
সে মিটিমিটি হাসছে। সেদিকে তাকিয়ে তোসিকো বলল, ক্র? অর নো ক্র?
কুমারেশ বলল, শিজ জাস্ট কিডিং।
কিদিং? কিদিং?–ওরা তিনজনেই তিরস্কারের চোখে বুলার দিকে তাকাল।
পরে কুমারেশ বুলাকে সাবধান করে দেয়, দেখো, ওরা কিন্তু বৌদ্ধ। বুদ্ধকে ওরা ভগবান বলে মানে। ওদের সামনে ওভাবে বুদ্ধকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা কোরো না।
তুমিই তো ঠাট্টার কথা বললে। আমি তো ঠাট্টা করিনি। বুলা অবাক হয়ে বলল, একটু পরে বলল, আমি যদি বলি ওইখানেই সেই স্পট যেখানে ক্ষেমা এসে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমে দেখেছিলেন বুদ্ধকে, এর বিপক্ষে তুমি কোনো প্রমাণ দিতে পারবে?
আড়াই হাজার বছর আগে কোথায় কী ঘটেছিল সে প্রমাণ আবার কেউ দিতে পারে না কি? কুমারেশ বলল বেশ অবজ্ঞার সঙ্গেই।
প্রমাণ না পেলে আর ইতিহাস রচনা হচ্ছে কী করে?
তা অবশ্য। কিন্তু বুলা, তুমি যে বৌদ্ধযুগের ইতিহাস এত জানো সেটা আমি জানতাম না।
জানিই তো!
জেদি মেয়ের মতো বুলা বলে, ধরো যদি বলি আজ যেখানে এই ট্যুরিস্ট বাংলো সেইখানেই বিম্বিসার রাজামশায়ের কোষাধ্যক্ষর কোয়ার্টার্স ছিল। যদি বলি এইখান দিয়ে, এই করিডর দিয়ে নূপুরের নিক্কণ তুলে হেঁটে যেতাম তখন গরবিনির মতো! বুলা তখন নূপুর মেঝেতে ঠুকে ঠুকে বাজায়। ছুন ছুন ছুন শব্দ হয়।-যদি বলি এক ভীষণ দস্যি আবদেরে মেয়ে ছিলাম আমি, বাবা-মা আমাকে সামলাতে পারতেন না! যখন যা ধরব, তা-ই চাই।
সে তো এখনকার কথাই বলছ। এর জন্যে আড়াই হাজার বছর আগে যেতে হবে কেন?—কুমারেশ হেসে বলল।
দু-জনে বারান্দায় দুটো চেয়ার টেনে বসেছিল। সামনে বিস্তৃত লন। ধারে ধারে ফুলগাছ। সন্ধের ছায়ায় এখন সব আবছা হয়ে এসেছে। বুলা বলল, ওই তো সেই জানলা, যেখান দিয়ে পথের দিকে তাকিয়ে একদিন তোমায় দেখতে পেলাম। লভ অ্যাট ফাস্ট সাইট। কিছু একটা শয়তানি করেছিলে, বুঝলে? তোমাকে তখনকার পুলিশে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল।
বুলা হেসে উঠল। কুমারেশ বলল, তখন পুলিশও ছিল?
ছিল বইকি, নইলে একটা রাজ্য চলে?
তো তারপর?
তারপর আমি আবদার ধরলাম, তোমাকে আমার চাই। তখনও নিশ্চয়ই এখনকার মতো লালটুস দেখতে ছিলে। বাবা বলে-কয়ে জরিমানা দিয়ে তোমাকে রাজরোষ থেকে উদ্ধার করলেন। তারপর ঘটাপটা করে বিয়ে হল।
তারপর কাল শুনো এখন ভীষণ খিদে আর ঘুম পাচ্ছে, বুলা হাই তুলল একটা, মুখে হাত চাপা দিয়ে আলগা করে, চোখে জল এসে গেছে।
এরই মধ্যে ঘুম?
বাঃ, কত হেঁটেছি, কত পাহাড় চড়েছি বলো তো? ব্রহ্মাকুণ্ড দেখে পুরো জরাসন্ধ কা বৈঠক পর্যন্ত উঠে গেলাম। সপ্তপর্ণী গুহা তো তারপর ঘুরে, আবার নেমে যেতে হয়। তুমি তো গেলেই না!
