এত কিনছ কেন সঞ্জু? এত তো লাগবে না।
বাঃ, টিলটিল কি একা খেতে চাইবে নাকি? আপনি খাবেন, অসীমদা খাবেন, মিনি খাবে।
তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে?
মাথাটি আমার ঠিক হয়ে গেছে। এই দেখুন না দাদা বউদির জন্যেও নিচ্ছি। আপনাদের সবার কাছ থেকে তো খালি নিয়েই গেছি, নিয়েই গেছি …
উড়নচণ্ডী।
চণ্ডী নয় চণ্ডী নয়, চণ্ড, চণ্ড ভৈরব—সঞ্জীবন সংশোধন করে দেয়। আর অমনি চণ্ডভৈরব তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে থাকে। সে কী রং? কী অসম্ভব সব দেহভঙ্গি। চোখে যদি ওজঃ মুখে তবে হাসি, হাতে যদি বরাভয়, পায়ে তবে সব দলিত মথিত করবার মহামুদ্রা। কেশে তার ঝড়, বুকে তার প্রেম, উদরে ক্ষুধা, কে এই চণ্ডভৈরব? এঁকে কি কোনো শাস্ত্রে পাওয়া যাবে? দেখবে কী? পুরাণ খুলে খুলে? নাঃ চণ্ডভৈরব ভেতরে নাচছেন, উলটোচ্ছেন, পালটাচ্ছেন, তাঁকে এক্ষুনি লিপিবদ্ধ করতে না পারলে তিনি উবে যাবেন। দিদিকে বাড়ির দোরগোড়ায় নামিয়ে দিয়ে সেই ট্যাকসিতেই ছুটল সঞ্জীবন। একের পর এক চণ্ডভৈরব এঁকে যায় সঞ্জীবন। সব ভঙ্গি এক ক্যানভাসে ধরা। যায় না। সব রং কী করে এক জায়গায় উজাড় করে? অনেক আয়োজন চাই। জলে তেলে মোমে, পেনসিলে, স্টেনসিলে, এচিং-এ, অ্যাক্রিলিকে। শুধু ভৈরব তো নয়, ক্রমে তাঁর বুকের পাঁজর থেকে তৈরি হয় ভৈরবী। তাঁর হাতের মুদ্রা থেকে আসে সাঙ্গোপাঙ্গ। তাঁর লিঙ্গোত্থান থেকে আসতে থাকে শিশুভৈরব শিশুভৈরবীরা। সে বুঝতেও পারে না কবে তার ঘরে উত্তরের মহার্ঘ আলো অফুরান প্রবেশ করে, কবে পালটে যায় শয্যার আস্তরণ, ঠান্ডা ঘরে অজস্র গাছের টবের বিন্যাসের মধ্যে বসে সে অনিয়ন্ত্রিত ভৈরব-পরিবার এঁকে যায় আর আনমনে টিলটিলের গালে, অধরে উদরে চিবুকে চুমু খেয়ে যায়। এক সময়ে হাতের তুলির মতো সযতনে শুইয়ে দেয় টিলটিলকে। আর চোখে স্বেদ, টিলটিলের গালে রক্ত। ক্যানভাস ঘামতে থাকে। কেন না এখন কোনো গন্ধ নেই।
গৃপ্রকূট
বোধগয়া থেকে ছেষট্টি কিলোমিটারের মতো অ্যামবাসাডরে। তিনটি জাপযুবক, একটি বাঙালি দম্পতি। জাপানিদের তীর্থযাত্রা, দম্পতির মধুচন্দ্রিমা। বৈভার,। বিপুল, রত্নগিরি, উদয়গিরি, শৈলগিরিতে ঘেরা পাঁচ-পাহাড়ি এই বৌদ্ধ তীর্থে দু ধরনের যাত্রা কী অনায়াসে মিলে যায়।
ডিসেম্বরের দাঁত-কাঁপানো কুয়াশার ভেতর থেকে রোদ-ঝলমলে সকাল আস্তে আস্তে ফুটে বেরোচ্ছে। নরম রোদ। শালুক ফুলের মতো নম্র, নরম।
পাঁচজনের মধ্যে অন্তত চারজন কী রকম একটা ঘোরের মধ্যে ছিল। বুদ্ধে বুদ্ধে ছয়লাপ। তিববতি বুদ্ধ, থাই বুদ্ধ, নেপালি বুদ্ধ, ভুটানি বুদ্ধ, আর জাপানি বুদ্ধ মন্দিরের সেই আকাশচুম্বী বুদ্ধিমূর্তি।
বুলা জন্মেছে জুরিখে। এক পৃথিবীচর পরিবারের মেয়ে সে। বাবার সঙ্গে ছোটোবেলায় কত যে ঘুরেছে। ভারতবর্ষ তো বটেই, ভারতের বাইরেও।
নৈনিতাল, রানিক্ষেত্র, কৌশানি?
হ্যাঁ।
কুলু-মানালি-চম্বা?
হ্যাঁ।
মুসৌরি-দেরাদুন!
কতবার।
পূর্ণিমায় তাজমহল, মাৰ্বল রকস।
অবশ্যই।
অজন্তা-ইলোরা-ঔরঙ্গাবাদ-গোয়া?
সব। সব।
সবই বুলার যাওয়া, দেখা, কোনো কোনোটা একাধিকবার। অমন যে বিশাল দাক্ষিণাত্যের মালভূমি—তারও পুঙ্খানুপুঙ্খ তার দেখা।
তাহলে তো তোমাকে হংকং নিয়ে যেতে হয়।
হংকং তো বাজার-নগরী। বিয়ের বাজার তো ওখান থেকেই করলাম। না হলে তোমার নাইকন ক্যামেরা, লেটেস্ট মডেলের রোলেক্স ঘড়ি, অ্যামস্টারডামের হিরের আংটি, সার্জিয়ো ভ্যালেনটাইনোর শেভিং কিট, ম্যানিকিয়োর সেট কোথা থেকে আসত?
তবে কি সুইজারল্যান্ড? সে তো আমার ক্ষমতায় আর ইহজীবনে কুলোবে না!
এই জায়গায় বুলা সতর্ক হয়ে যায়। ইচ্ছা প্রকাশ করলে যে বাবা সুইজারল্যান্ডের ব্যবস্থাটাও করে দিতে পারেন এ কথাটা কি বলা যায়? এতে তো কুমারেশের অমর্যাদা! কুমারেশের হলে অমর্যাদাটা তারও হয়। এই কথাটুকু ধনীর দুলালি হলেও সে মোক্ষম বোঝে। মলম-মাখানো গলায় সে বলে—আহা! সুইজারল্যান্ড কেন? অরোরা বেরিয়ালিস দেখতে নিয়ে যাওয়াও হয়তো একদিন তোমার হাতের পাঁচ হয়ে দাঁড়াবে! কে বলতে পারে?
নাঃ—কুমারেশ মনমরা গলায় বলে।
কেন যে ও ওরকম নঞর্থক চিন্তা করে? বুলা তো সমানেই উৎসাহ দিয়ে যায়।
সে অগত্যা বলে, দূর, জায়গাটা সুন্দর হলেই হল। আর নতুন। নতুন হলেই ভালো হয়। ব্যস।
বিদেশি ইলেট্রনিক্স গুডস-এর লোক্যাল এজেন্ট কুমারেশকে তার বিয়ে করার কথাই নয়।
এ নিয়ে অশান্তি কি কম হয়েছে?
একটা স্ট্রোকের পর বাবা এখন অবসর নিয়েছেন। একটু বেশিই দুশ্চিন্তা করেন। বলেছিলেন, কী পরিচয় ওর আমি দেব?
মা বলেছিলেন, আহা, এম. কম. ডিগ্রিটা তো আছে? উদ্যমী হলে ওইখান থেকেই ও উন্নতি করবে। আমি ও দিকটা ভাবছি না। ছেলেটার আপনজন বলে কেউ নেই। কুটুম বলে কিছু থাকবে না?
ওটা একটা কথা হল? যত আপনার জন থাকবে ততই কমপ্লিকেশন বাড়বে। আপনার জন তো আমরাই হতে পারি। ছেলে তো বড়ো বংশেরই। হাটখোলার দৌহিত্র বংশ। কিন্তু আসল যে উদ্যমের কথা বললে, সেটাই ছেলেটার নেই। লোক তো কম চরালাম না জীবনে! আমরা বুঝতে পারি।
একশোবার, মা বলেছিলেন, তবে এ কথাও সত্যি যে মেয়েকে যদি কাছে রাখতে চাও তো এর চেয়ে ভালো পাত্র পাওয়া শক্ত। স্বাস্থ্য ভালো, চেহারা তো রূপকথার রাজপুত্র!
