ক্ষীণ অতি ক্ষীণ একটি ঢেউতোলা রেখা। তার ওপর দিকে সেই চোখ বা চোখের পাতা, যার মণি নেই, পাপড়ি নেই, মুখের রেখা নেই, দিগন্ত-ছোঁয়া এক আঁখি শুধু একটি মাত্রই এবং ক্যানভাসের বাকি অংশটা প্রায় সবটাই সাদাটে ধোঁয়াটে এক মুখ যার মধ্যে কোথাও না কোথাও কানের অস্পষ্ট রেখা বোঝা যায় আবার সেগুলো অর্থহীন তালগোল পাকানো রঙের পুঁটলিও। আবার প্যানডোরার বাক্সের মতো তার থেকে বেরিয়ে পড়ে দুধের গ্লাস, চলকে পড়া দুগ্ধ ধারা, ফিনকি দিয়ে যেন সাদা রক্ত বেরোচ্ছে, ওষুধের শিশি, প্ল্যাস্টিকের গামলা…।
ভোর রাতে ওয়াশ করে করে, ওয়াশ করে করে যেন নিজের অস্পষ্ট অনভবকে ধরে রাখতে চাইল সে। তারপর চান, পাটভাঙা জামাকাপড়, কেমন যেন অস্বস্তি লাগে না হলে। বোতলটা আজকে শেলফের এক কোণে পড়ে রয়েছে। মার্জারিন দিয়ে ছ স্লাইস পাঁউরুটি আর দুটো শুটকে কাঁটালি কলা দিয়ে বোতলটা শেষ করে মাতাল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
সঞ্জু সঞ্জু ওঠো। তোমার কাছে লোক এসেছে দেখা করতে। ওঠো। সঞ্জু।
জাহান্নমে যাও…।
প্লীজ সঞ্জু। অনন্ত ঘড়াই আর…
হুড়মুড় করে উঠতে গিয়ে সঞ্জীবন ধপাস করে পড়ে যাচ্ছিল। বউদি ধরল।
এইজন্যে তোমাকে নাম বলতে চাই না। নাম বললেই ধপাস। আশ্চর্য। …
ঘড়াই ঢুকে আসছে।
আর্টিস্টের স্টুডিয়ো আর ব্যাচেলরের ডেন এ দুটোর কোনো প্রাইভেসি নেই বুঝলেন দুনিবাবু।
তক্তাপোশ—তাতে বাসি বিছানা। শূন্য বোতল গড়াগড়ি। অ্যাশট্রে জলে ভাসছে। আধ খাওয়া চায়ের কাপ। মুখ-খোলা ফ্লাস্ক। ইজেলের ওপর ছবি চড়ানো। চোখ লাল, দাড়িয়াল, কুঁচকোনো পায়জামা গেঞ্জির শিল্পী, চোখ কচলাচ্ছে। হাই চাপছে।
বাহ—দুনিবাবু বললেন—তা এটা দুই-ই। সোনায় সোহাগা। একটা স্টিল লাইফ করে নেবেন সঞ্জুবাবু।
সঞ্জু, তোর দশাশ্বমেধটা ইনি কোন ফিলম প্রডিউসারের বাড়িতে দেখেছেন ওঁকে একটা করে দিতে হবে।
ইনি কে?
ইনি? ইনি দুনিলাল বাজাজ। চিনতে পারছিস না?
ফেমাস আর্ট-ডিলার-বউদি চৌকাঠ থেকে বলল, সঞ্জীবন কটমট করে তাকাচ্ছে দেখে তাড়াতাড়ি চলে গেল। এবার বোধহয় সেই মজা ডোবার গন্ধ-অলা চা-টা আনবে।
সাদা ভুড়ির ওপর ফিনফিনে সাদা ধুতি। মোটা সোনার চেন। মাথার দু চারগাছি পাতলা চুল ছাড়া সারা শরীরে আর কোথাও কোনো চুল নেই।
সঞ্জীবন বলল, নিজেরই ছবির কপি করতে হবে?
কপি কেন করবেন। ফ্রেশ আঁকবেন, যেমন হবে তেমনি নেব।
হয় না। দশাশ্বমেধ মুড আমার চলে গেছে।
এটা? ফিনিশড? ইজেলের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন বাজাজ।
আপনার কী মনে হয়?
কোথাও কিছু একটা বাকি আছে। ছোট্ট কিছু। এই স্যাডনেসের কারণ যদি লিউকিমিয়া হয়, সুষ্ঠু লিউকিমিয়া—তা হলে কেমন ক্লিনিক্যাল হয়ে যায় ছবিটা।
লিউকিমিয়া নয়, লিউকিমিয়া কেন? হিট ফিভার…মাথার চুল আঁকড়াতে আঁকড়াতে সঞ্জীবন বলল।
কিছুক্ষণ তার দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে থাকলেন বাজাজ। তারপরে বললেন, আই সি, পার্সন্যাল লাইফ? তা আরও কিছু আছে?
বাকিগুলো সে বার করে দিল।
গোটা চারেক বেছে নিলেন দুনিলাল। দশ হাজার করে এক একটা।
ইনি আমাদের বিপ্লবী শিল্পী সংঘকে প্রোমোট করছেন।
বউদি ভারী বুদ্ধিমতী। চা আনেনি।
ক্যাশ চল্লিশ হাজার কোলে নিয়ে বসে রইল। বউদি ঢুকতে বলল, নাও।
সমস্ত নিয়ে নেব?
আমাকে হাতখরচটা দিয়ো।
টিলটিল যে রাগ করবে?
টিলটিল রাগ করে একমাত্র গন্ধ পেলে—বলতে যাচ্ছিল সঞ্জীবন, সামলে নিল।
বলল, আপাতত তুমিই আমার টিলটিল, তুমিই আমার ক্যাশ, আমার ক্যাশিয়ার। বউদির গালে একটা চকাস করে চুমু খেল সঞ্জীবন।
তারপর তাড়াতাড়ি চান, তাড়াতাড়ি দাড়ি গোঁফ ছাঁটা, তাড়াতাড়ি পাউডার, তাড়াতাড়ি পায়জামা পাঞ্জাবি। সাতবার করে মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচি। এবং দৌড়।
না লিউকিমিয়া নয়। না লিউকিমিয়া নয়। না…
টিলটিল স্কুলে গেছে। বাঁচা গেল। তবু একবার থরো চেক-আপ।
দিদি, টিলটিলের ফ্যাকাশে ভাবটা গেছে?
নাইন্টি পার্সেন্ট বাঙালি মেয়ে অ্যানিমিক সঞ্জু, ফ্যাকাশে ভাব কি চট করে যায়?
কী কী যেন খেতে হয়?
মাটন লিভার, বিটরুট, গাজর, বেদানা, অভাবে ডালিম, লিভার এক্সট্র্যাক্ট ইঞ্জেকশন, চিকেন স্যুপ, টনিক আয়রন-অলা। খিদে বাড়াবার কিছু। হাওয়া বদল মনের স্ফূর্তি।…
মাটন লিভার থেকে খিদে বাড়াবার কিছু পর্যন্ত দিদি আপনি ব্যবস্থা করবেন, বাকি দুটো আমি দেখছি।–বলে পাঁচশো টাকার দুটো নোট দিদির হাতে খুঁজে দিতে যায় সঞ্জু।
এ কী? এ কী? আমার হাতে কেন?
তবে কি আপনার পায়ে দেব?
ইয়ার্কি হচ্ছে? খুব যে ফুর্তি? চাকুরি পেলে? না ছবি বিক্রি হল?
চাকুরি তো আগেই পেয়েছি দিদি, ও চাকুরি হামি করবে না।
তবে ছবি?
আবার কী?
হাতে পেয়েই সব খরচ করে দেবার ধান্দা? উড়নচণ্ড একেবারে।
উড়নচণ্ডী নয় দিদি উড়ন শিব, মানে নটরাজ, মানে শিল্পী। …
ধাঁ করে বেরিয়ে যাবার চেষ্টা করে সঞ্জীবন।
দিদি তাড়াতাড়ি পথ আটকায়।—না, না সঞ্জু আমার কাছে টাকা দেবে না। তোমাদের অসীমদা ভীষণ রাগ করবেন তাহলে। তুমি এগুলো কিনে এনে দিয়ো বরং।
আমি যে চিনি না, দিদি।
চিনতে তো হবেই একদিন না একদিন সঞ্জু—
তাহলে আপনি চলুন সঙ্গে।
আচ্ছা চলো, বারোটার সময়ে মিনি ফিরবে। তার আগে কিন্তু ফিরতে হবে।
ওরে বাবা, এখনই তো সাড়ে দশ। শিগগিরই চলুন।
