শেষ হয়ে গেলে চান করে, ভাত খেয়ে, ঘুম।
ঘুমের মধ্যে কোন দূর বিদেশ থেকে যেন আই, এস. ডি এসেছে। বউদি ডাকছে সঞ্জু, সঞ্জু, ফোন, ফোন।
খুনখারাবি চোখ মেলে সঞ্জু বলে—আহ!
কী মুশকিল, ফোনটা তোমার, টিলটিল।
ঘুমের মধ্যে আমরা অতীতে থাকি। কিংবা ভবিষ্যতে। সেই অনাগত বিধাতার দেশ থেকে এক ঝাপটা আকুলতার বৃষ্টির মতো টিলটিল নামটা এল।
আধঘুমন্ত সঞ্জু লাফিয়ে উঠতে গিয়ে ধপাস করে পড়ে যায়। বউদি উঠতে সাহায্য করে। গা হাত-পা যেন প্যারালাইজড হয়ে ছিল।
কে?
বউদিকে তো বললাম আমি টিলটিল। তোমার গলা এত ভারী কেন? আবার গাঁড়ি খাচ্ছ?
গাঁড়ি হল গাঁজামেশানো বিড়ি।
দুম করে অন্ধকার ভেদ করে টর্চলাইটের মতো বর্তমান ফিরে এল। ফোনটা রেখে দিতেই যাচ্ছিল সঞ্জীবন কিন্তু ওদিক থেকে ভেসে এল, কতদিন তোমায় দেখি না।
ব্যস্ত ছিলাম।
তা তো থাকবেই। নতুন কিছু কাজ হল?
হচ্ছে।
আমাকে একটুও সময় দিতে পারবে না?
সময় চিনেবাদাম বা ঝালমুড়ি নয়।
সে তো জানি। আসলে আমার ভীষণ হিট ফিভার হয়েছিল। এখন জ্বরটা গেছে কিন্তু খুব দুর্বল। তাই।
ব্লাড-প্রেশার কত?
ষাট-একশো।
যাঃ।
অন গড। সুগার সত্তর। পুরো এক মাসের ছুটি নিয়েছি।
আচ্ছা রেস্ট নাও, আসছি। …
বিদ্যুৎ আর নেই। আকাশ থেকে নেমে এসে এখন মাটিতে দাঁড়াবার চেষ্টা করছে। করুণ বিভঙ্গে। মাচা নেই, কোনো বনস্পতি নেই যার খাঁজটাঁজ আশ্রয় করে দাঁড়াবে। আরামচেয়ারে সেই ছিন্নভিন্ন আলোকলতা রক্তহীন, তেজহীন, নিঃস্ব পলকা পড়ে রয়েছে। আরামচেয়ারের হাতলে এক কাপ দুধ।
সঞ্জু তুমি দেখো তো যদি খাওয়াতে পায়। কখন নিয়েছি। এখনও যেমন কে তেমন।-অনাথা লতার দিদি বলছেন।
খেতে কি আমার অসাধ? বমি পায় যে!
একটু একটু করে খাও।–সঞ্জীবন কাপটা মুখের কাছে ধরে।
চুমুক দেবার একটা মৃদু শব্দ হয়। পেটের মধ্যেটা কেমন শিরশির করে সঞ্জীবনের সেই শব্দে। একটু দুধ যে চলকে পড়ল? যাঃ গলার কাছে ছাপা কাফতানের বেশ খানিকটা ভিজে গেল।
ওই যে কুঁজো রয়েছে, গেলাসে করে জল আনো, এখুনি এটা ধুয়ে ফেলি, নইলে চটচট করবে।
জ্বরের ওপর জল?
এ তো হিট ফিভার? জলেই তো নিরাময়।
তুলো নাও, হ্যাঁ তুলোটা ভিজিয়ে দাও। … তুলো ভিজিয়ে সঞ্জীবন নিজেই দুধেভেজা কাফতানের গলা মুছে নেয়।
ওয়ার্ক, ওয়া, ওয়াক—
মুখের ওপর ঝুঁকে পড়েছিল সঞ্জীবন, সোজা হয়ে যায়।
কী হল?
দাও, শিগগিরই।
প্লাস্টিকের একটা গামলা দেখতে পায় সঞ্জীবন। ধরে মুখের কাছে।
হোয়াক, হোয়া হোয়ক।
নাঃ, কোঁতানিই সার, বড়ো ভয় হচ্ছিল দুধটা না বেরিয়ে যায়। তা বেরোল না।
দুধ খেলেই কি তোমার এমন হচ্ছে?
কাঠ-বমির কষ্টে চোখ দুটো ছলছল, টিলটিল বলল, সব সময়ে না। এখন তো নাই-ই।
তবে?
কী জানি, এমনি।—বড্ড দুর্বল গলা। চোখ বুজে আসে টিলটিলের। কিছুক্ষণ পর করুণ চোখের পাতা খুলে যায়। কাঁপা-কাঁপা গলায় বলে, তুমি কি…তুমি কি গাঁড়ির সঙ্গে তাড়িও— আর বলতে পারে না, চুপ করে যায়, চোখ দুটো আবার বুজে আসে।
আমি কাছে এলেই যদি এত গন্ধ লাগে টিলটিল তাহলে…
টিলটিল চুপ।
কাজ করার সময়ে এগুলো তো আমার খেতেই হবে টিলটিল।
টিলটিল চুপ।
আর খেলে তো গন্ধ আসবেই, যতই চান করি আর পাউডার মাখি আর এলাচ চিবোই।
হোয়াক—একটা তীব্র বমির শব্দ কোনোক্রমে ঠেকায় টিলটিল। তারপর কোনোমতে বলে, সরি সঞ্জু। বমি একটা বিশ্রী ব্যাপার। এই অসুখবিসুখ এসব বিশ্রী, তুমি যাও। তোমার সামনে আমার কেমন লজ্জা করছে।—এতটা কথায় সে হাঁপায়।
আমি কিন্তু বাস্তবকে ঘৃণা করি না টিলটিল। অসুখ আমাদের সবারই করে। অসুখ করলে বমিটমি খারাপ ব্যাপার থাকেই। সেগুলো থেকে পালাবার মুখ ফিরিয়ে থাকবার বিন্দুমাত্র কাপুরুষতা আমার নেই। এগুলো জীবনের মৌলিক কষ্ট। মৌলিক বিপদ।
কিন্তু তোমার গন্ধগুলো তো তোমার মৌলিক গন্ধ নয় সঞ্জু।
আচ্ছা আমি যাচ্ছি।
এবার অন্যরকম প্রস্থানপর্ব। যে সাধারণত প্ৰস্থিত হয় সে শুয়ে আছে, তার অসুখে রোগা সাদা শরীরে একটা আতুর সমর্পণ, একটা ঘুমন্ত জেহাদ, আবার একটা বাধ্যতামূলক আত্মত্যাগের উদ্যোগ। যে যাচ্ছে সে পুরুষ, তার জীবনের প্রয়োজন অপ্রয়োজনগুলোর একটা সঠিক হিসেব-নিকেশ সে এইমাত্র পেশ করেছে। সেই ঔদ্ধত্য, সেই রিলিফ তার চলায় ফেরায়। শুধু একটু ভুল হল। ঘরটা পার হবার পর সঞ্জীবন একবার, একটিবার মাত্র মুখ ফিরিয়ে তাকাল।
টিলটিল তাকিয়ে আছে। তার দিকে। অপলক। দু চোখ দিয়ে সরু ধারা।
আলো জ্বলছে। সারারাত। এ বিলাসিতা তাদের মানায় না। সঞ্জীবন জানে। দাদা কয়েকবার দেখে গেছে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চলে গেল শেষবার। বউদি একটা ফ্লাস্ক দিয়ে গেছে তাতে চা।
একটা দীর্ঘ গাঁড়ি ধরাল সঞ্জীবন। ক্যানভাসের দিকে চাইল। অমনি ক্যানভাসের ওপর একজোড়া বোজা চোখ ফুটে উঠল। গাঁড়িটা টিপে নিবিয়ে দিল সঞ্জীবন। জল ঢেলে দিল অ্যাশট্রেতে। ফ্লাস্ক থেকে অস্থির হাতে চা ঢালল। কাঁপছে আঙুলগুলো। ভেতরের কী একটা ছবির আবেগ তাকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে, এক চুমুক চা, আর এক চুমুক, গুল পাকানো চায়ের কেমন একটা বদ্ধ ডোবার গন্ধ, তার মধ্যে মাদার ডেয়ারির দুধ ভেসে আছে। না মাদার ডেয়ারি না, বহু চর্চিত বহু বিজ্ঞাপিত এভরি-ডে-টে হবে। তেলে জলে যেমন মিশ খায় না তেমনি। তৃতীয় চুমুকের পর চায়ের কাপটা সরিয়ে রাখল সঞ্জীবন। প্রথম টান—সুদীর্ঘ এক চোখের ওপরপাতা। লাইফ সাইজকে অন্তত দশ গুণ করে দিলে যতটা হয়।
