বাঃ। তুমি তো এসে গেছ?
গেলাম। কোনো অসুবিধে হল?
না অসুবিধে কী? ফোয়ারা দেখছিলাম।
এখানেই বসব, না কী?
এখানে আধঘন্টা বসেছি, একটু ঘোরা যাক না।
একটু বসা যাক না, সেই ব্লকম্যান স্ট্রিট থেকে এই অবধি হেঁটে এলাম।
সে কী? কেন?
এই সময়ে কি বাসে ওঠা যায়? যা ঠেসাঠেসি! গরম! ঘাম! দুর্গন্ধ!
ও মা, তুমি তো আজ চান করে এসেছ মনে হচ্ছে!
হ্যাঁ কাছে বসতে না পারো, পাশাপাশি হাঁটতে অন্তত পারো। মানে বোধহয়।
ও মা কী সুন্দর চুল পাট করে আঁচড়ানো। দাড়িতে কি শ্যাম্পু দিয়েছ? ফ্রেশ ফ্রেশ লাগছে, পাঞ্জাবিটা কি নতুন?
ইয়ার্কি হচ্ছে?
ও মা, ইয়ার্কি হবে কেন? জ্যাঠাবাবুর সঙ্গে কেউ ইয়ার্কি করে? দাদু হলেও বা কথা ছিল। তোমার বসা হয়েছে?
নাহ। তবে তোমার যখন হয়ে গেছে তখন আমার হতেই হবে।
এ কথার মানে?
মানে তো বোঝাই যাচ্ছে। কীর ইচ্ছায় কর্ম।
বাবা! বাবা! বসছি। তোমার বিশ্রাম হলে বলবে। ওমা লেবু লেবু গন্ধও তো বেরোচ্ছে? দাঁতও যেন সদ্য সদ্য মাজা।
নখও কাটা। হাতের এবং পায়ের।
যাতে হেমচন্দ্রের মতো লাথি কষালে নখের খোঁচা টোঁচা লেগে গিয়ে টেল-টেল টিট্যানাস না হয়!
টেল-টেল টিট্যানাসটা কী?
আঁচড়ের দাগটাই তো লাথির গল্পটা বলে দেবে, টিট্যানাসের কারণ নির্ণয়ের জন্যে ডাক্তারকে বেশি খোঁচাখুঁচি করতে হবে না। কবে পড়ে গিয়েছিলেন? কোথায় লাগল? কীসে কেটে গিয়েছিল? ইত্যাকার।
অফ অল থিংস হেমচন্দ্রের লাথিটাই মনে পড়ল কেন এ রহস্যটা…
এমনি। ওটা আমৃণালিনী নারীসমাজের মনের মধ্যে এমন একটা ক্ষত সৃষ্টি করে রেখেছে যে প্রেমিক দেখলেই মনে পড়ে।
অ! সঞ্জীবন টিলটিলের প্রেমিক বুঝি?
আমার তো তাই ধারণা!
সেইজন্যেই সঞ্জীবন টিলটিলের ঘনিষ্ঠ হয়ে বসুক এবার।
তা বসুক, কিন্তু দাড়ি-অলা মুখখানা অত এগিয়ে আনবার কী দরকার?
এইজন্যে যে তাক বুঝে টুক করে একটু খেয়ে নেব।
টিফিন এনেছ পকেটে করে? তা খাও না! খেতে আবার লজ্জা কী? মেয়েরাও আজকাল পাবলিকে খেতে লজ্জা করে না।
খাব? খাব?…খাই?
কী খাবে? সর্বনাশ! আমি চললাম।
টিলটিল দিস ইজ ভেরি ভেরি আনফেয়ার।
লোক দেখিয়ে খাবে?
সেটুকু সেন্স আমার আছে, ওই কর্নারটা টার্ন নেবার সময়ে এদিক ওদিক দেখে ছোট্ট একটু।
ওটা একটা সাংস্কৃতিক জায়গা, সেটাকে অশুচি করার কথা তোমার মনে এল? অশুচি? আই বেগ টু ডিফার দিদিমণি। কত সাহিত্য কত গান এই চুম্বন বেজড। সেইসব সাহিত্যের গানের চর্চা হচ্ছে এখানে…
তাই চুম্বন-চর্চাও হবে?
না, তা আমি বলছি না। অতটা বলতে পারা যাবে না। তাহলে আরও অনেক রকম চর্চাও হবে। তা নয়, অশুচি কথাটাতে আমার আপত্তি।
অশুচি কথাটা তুলে নিচ্ছি, আসলে আমি বলতে চেয়েছিলাম অনৈতিক, অসামাজিক।
প্রত্যেকেটা শব্দই বেশ প্রগাঢ় তর্কের মধ্যে এসে যাচ্ছে। ও পথে হেঁটে কাজ নেই। তার চেয়ে বরং চলো তোমায় পৌঁছে দিই। একটি নির্জন ট্যাক্সি করে।
তার চেয়ে চলো একটা হোটেলে ঘর বুক করি।—রাগে, শ্লেষে, ক্ষোভে কষকুটে শোনাচ্ছে টিলটিলের গলা।
দিস ইজ ভেরি ভেরি অনফেয়ার টিলটিল। আমি যদি ওই লোকেদের দলে পড়তুম, তুমি তাহলে অনেক আগেই টের পেতে। আ অ্যাম আ ম্যান অব অনারেবল ইনটেনশনস।
তা হলে চলো ট্যাক্সি করো।
তোমার কাছে কত টাকা আছে টিলটিল?
আমার কাছে? আমার কাছে টাকা থাকবে কেন?
ট্যাক্সির জন্যে।
তুমি আমাকে ট্যাক্সি করে পৌঁছে দেবে, তার জন্যে টাকা দেব আমি? কী বলছ। সঞ্জু? আমার তো…আমার তো মনে হবে তুমি আমার একজন রক্ষিত।
আমি ভাড়া দিলেই তা হলে তুমি রক্ষিতের স্ত্রীলিঙ্গ?
না, কখনোই না, কখনো না। ছেলেদের দায়িত্ব হল মেয়েদের নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া। চিরদিনের সামাজিক দায়, নটউইথস্ট্যান্ডিং নারীমুক্তি। আমি চললাম। বাসে মিনিবাসে। ন্যাচর্যালি।
খুব ক্ষিপ্রপদে টিলটিল চলে যায়। অন্ধকারে তার শাড়ির হলুদ সামান্য চমকায়। রেখা আপাদমস্তক দেখা যায় না যেন একটা ঝিলিক, তারপর অন্ধকার। মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে নন্দন। চারপাশে সংস্কৃতি-সচেতন মানুষের ভিড়। প্রাকৃতিক অন্ধকারের সঙ্গে বৈদ্যুতিক আলোর মেশামেশিতে বেগুনি কুয়াশা।
সঞ্জীবন দৃশ্যটির দিকে মুখ করে স্থাণু থাকে।
রাত।
সিগারেটের টুকরোর পর টুকরো জমে যাচ্ছে। পায়চারি করে করে চটির তলা ক্ষয়ে গেল। অন্ধকারে জ্বলছে নিভছে ও কী? সিগারেটের মুখ? না সঞ্জীবনের চোখের আগুন?
আমি যেমন আমাকে তেমনিই নিতে হবে।
আমি স্বেদে স্বেদে দুর্গন্ধ
রাজপথ ছেড়ে বেছে নিই খানাখন্দ
দাড়িতে দাড়িতে দাড়িয়াল
আমি কাটি না নখর রাখি স্বাক্ষর
কাদাতে মাটিতে মাটিয়াল
আমি চলি না কারুর মতে
হাত বুলোই না নিজেরও হৃদয়ক্ষতে
আমি ধি ক্কার হানি, ধিক! ধিক!
বিদ্রোহী আমি নির্ভীক
আমার দাড়ি ওড়ে ঝোড়ো বাতাসে
আমি পড়েছি এবার সাতাশে
আমি শ্রেণি-সংগ্রাম মানি
পাতিবুর্জুয়া মাস্টারদের ঘোরাবই আমি ঘানি
যাব না তোদের মঞ্চে
আমার ক্যানভাস গ্রামে গঞ্জে
আমি যেমন আমাকে পারলে তেমনই নিক
শত টিলটিল গারদের
আমি পালাব বাঁকায়ে শিক।
একদম শেষরাতে যখন সন্ধ্যাতারা ভোরের শুকতারা হয়ে জানলা দিয়ে উঁকি মারছে তখন ইজেলে ক্যানভাস চড়ায় সঞ্জীবন। টেম্পারায় অন্ধকার। অন্ধকারে বেগুনি আভাস, কেমন আভাসিত অন্ধকার। অন্ধকারে নন্দনের সত্যজিৎকৃত অলংকৃত পাপেন্ডিকুলার। ফ্রস্টেড লাইটের আয়োজন সব যেন ইউফোর মতো ঘুরছে। তাদের ডাঁটি নেই। অন্ধকারে ভূতেদের আনাগোনা, কালোর মধ্যে আরও কালো, কিংবা ছাই-ছাই, কিংবা ধুপছায়া, কিংবা বেগুনির মধ্যে অতিবেগুনি বিন্দু সব। খালি একটা হলুদ বিদ্যুৎ চমকাতে চমকাতে যাচ্ছে। সাত দিনের একটু বেশি লাগল শেষ হতে। সোয়া সাত দিন ধরো। এ কদিনে চৰ্য্য শুধু পাঁউরুটি আর ডিম, চোষ্য শুধু নিজের হাতের আঙুল, লেহ্য সিগারেট, পেয়—চা এবং দিশি।
