সামান্য ঘামের গন্ধের জন্যে আমাদের প্রেম আটকে থাকবে?
গন্ধকে তুমি সামান্য বলছ সঞ্জু? রক্তের গন্ধে লেডি ম্যাকবেথ যে পাগল হয়ে গেলেন। বারবার ধুয়েও সে রক্তের গন্ধ তাঁর অন্তঃনাসা থেকে কিছুতে গেল না।
সে তো আসলে রক্তের গন্ধ নয়। পাপের গন্ধ।
ঠিকই। কিন্তু পাপের চেতনা প্রকাশ পাচ্ছিল রক্তের গন্ধের ভেতর দিয়ে। সঞ্জু আমি আজ যাই। …
টিলটিল এত দ্রুত চলে গেল যে সঞ্জু তাকে নিবৃত্ত করবার উদ্যোগই নিতে পারল না। খোলামেলা পার্ক-জাতীয় জায়গায় কারও পশ্চাদ্ধাবন করাটা খুব গণ্ডগোলের দেখাবে—এটা তার খেয়ালে ছিল। কিন্তু মনে মনে সে দৌড়াচ্ছিল। মরিয়ার মতো। ওই টিলটিল চলে যায় টিয়ে রঙের বসন গায়ে। চলার তালে টিলটিলের একটা হাত দুলছে, যেন হাতির দাঁত দিয়ে গড়া। না হাতির দাঁত নয়, সে তো শক্ত ব্যাপার, ময়দা—ধুর সে তো সাদা থ্যাসথেসে। তবে? তবে? তবে? নাঃ পাওয়া গেল না। পেছন থেকে দেখা যাচ্ছে টিলটিলের দোল-খাওয়া চুল। সোজা, প্রপাতের মতো নেমে এসেছে মুসৌরির কেম্পটি ফলস। ধ্যাত কেম্পটি দুটো সরু সরু বিনুনির মতো। টিলটিলের বিধাতা কি অত কৃপণ নাকি? তবে কি উশ্রী? না বাবা উশ্রীর মধ্যে একটা বন্য উদ্দামতা আছে, যাই বলো। এ কেমন কেশ, যাকে কেশ বলে মনে হয় না? ধুনুচির ধোঁয়ার মতো! শীতের ভোরের কুয়াশার মতো! এ যেন টিলটিলের টিলটিলত্বেরই একটা নাটবল্ট।
এমন করে বুঝি টিলটিলকে কখনও দেখেনি সঞ্জীবন। যেন তার জীবনের, তার সমস্ত সত্তার, সমস্ত প্রার্থনার নির্যাস একটি আঁকাবাঁকা টিয়া রঙের রেখা হয়ে চলে যায়। ঝুলির ভেতর থেকে দ্রুত স্কেচবুক বার করে সে, বেছে বেছে একটা দশ! বারো নম্বরের নরম পেন্সিল। ক্ষিপ্র আঙুলে এঁকে ফেলে তার প্রার্থনার প্রস্থানরেখা। দুটো তিনটে স্কেচ করে। তাই টিলটিল যে পুব ফটকের কাছে দাঁড়িয়ে একবার ঘাড় ফিরিয়ে তাকে দেখল, এক ঝিলিক হাসল, সেটা সে দেখতে পেল না। পেলে হয়তো স্কেচ কয়েকটা বাড়ত। এগুলো বাড়ি গিয়ে জলরং আর ক্রেয়ন মিশিয়ে আঁকতে হবে। ক্রেয়নে জল ধরবে না। কিন্তু ক্রেয়ন আর জল রঙের সম্মিলনই হবে সেই মাধ্যম এ বিষয়ে সে নিশ্চিত হয়ে যায় বাগানের ঘাসের দিকে চেয়ে। কেন না ওই ঘাসগুলোর মধ্যে যেমন একটা খাড়া খাড়া ব্যাপার আছে, গোটা গোটা গোছা-গোছা ব্যাপার আছে, তেমনি আবার আছে একটা দ্রবীভূত ছাপকা ছাপকা ব্যাপার, যেন ব্লটিং পেপারের ওপর কালি ছেপে উঠেছে। টিলটিলের চুল জলরঙের। তার শাড়িটা জলরঙের। দুলন্ত হাতটি ক্রেয়নের কিন্তু হাতের ভঙ্গিতে জলরং কিছু নেমে এসেছে। এই আর কি?
তা এখন তৃতীয়বার সঞ্জু চান করছে। চতুর্থটা শোবার আগে করবে। চান করে সঞ্জু সাদা টার্কিশ তোয়ালে দিয়ে ভালো করে গা মুছে পাউডার ঢালে অকৃপণ হাতে। ঘাড় থেকে পাউডার মুছে নেয় সযতনে। ঘাড়ে-পাউডার-তরুণ সে দেখতে পারে না। খাদির এই পাঞ্জাবিটা নতুন কিনেছে সে, বেশ আলগা আলগা, জিনস, পায়জামা, পপলিনের, নতুন। বউদিকে অনেক খোশামোদ করে এই পোশাকটা জুটেছে, শেষ মাসে পকেটে কিছু বিশেষ ছিল না।
দাড়ি ধুয়েছিস?–বউদি।
হ্যাঁ।
আঁচড়েছিস?
আজ্ঞে।
বউদি ফট করে একটা কী যেন তার সারা গায়ে স্প্রে করে দিল। এত দ্রুত যে সে নিবৃত্ত করবার সময় পেল না।
লাইফটা হেল করে দিলে।
নিজের বুকে হাত দিয়ে বল। হেল-হেল লাগছে না হেভন-হেভন লাগছে?
যাও যাও, বেশি দিক কোরো না।
বড়ো ভালো লাগছে দিনটা আজ। বিকেলটি হবার সঙ্গে সঙ্গেই ফুরফুর করে হাওয়া দিচ্ছে। অবিরল—মাইটি ট্রেড উইন্ডস ব্লোয়িং। সেই হাওয়া পাঞ্জাবির ভেতরে ঢুকে সদ্যস্নাত ত্বককে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। এত আরাম যে খলবলিয়ে হেসে উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে। একটা সিগারেট ধরায় সঞ্জীবন। প্রচুর মানুষের বিপরীতমুখী স্রোতের উজানে চলে যায় সে স্বেচ্ছায়। ঘাম, স্বেদ, রক্ত, যদিও ঘাম আর স্বেদ একই তবুও কেমন একটা জোর আসে যেন দুটোকে আলাদা আলাদা ব্যবহার করলে, এসব আপাতত তার উলটো দিকে। কে কাকে খিচিয়ে উঠল,
কী দাদা, চোখে দেখতে পান না? পেল্লাই জুতোপরা পা-টা আমার হাঁটুতে তুলে দিলেন! ছি ছি!
দেখে দেখে দিয়েছি বোধহয়? ভিড়টা এমনই যে আপনিও কাজটা করতে পারতেন।
আবার উলটো চাপ দিচ্ছেন…
সঞ্জীবন পেরিয়ে যায়। বাসে সে উঠবে না। রবীন্দ্রসদন চত্বরে সে হেঁটে হেঁটেই যাবে। তারও পা একজন মাড়িয়ে দিল। বেশ লাগল। চটিতে যথেষ্ট ধুলোও। সে শুধু বলল, এ হে হে হে।
আরে দাদা, মাফ করে দিন। বড্ড ভিড়।
সঞ্জীবন পেরিয়ে যায়—পার্কস্ট্রিটের মোড়ে তো লালবাতির জন্যে আধঘন্টা দাঁড়াতে হল। এপারে অপেক্ষারত একটা গাড়ির স্টিয়ারিং-এ হাত এক ভদ্রলোক, মানে বেশ টাই পরা ভদ্রলোক, বললেন, শ শালা! চান করেছেন কোন সকালে। বড়ো বড়ো অফিসে তো ভালো টয়লেট থাকে। শাওয়ার থাকে না? চানটা করে বেরোলেই পারতেন ভদ্রলোক, একটা চেঞ্জ রেখে দিতেন অফিসে–চান করে টাটকা জামা-কাপড় পরে এক কাপ চাফি খেয়ে নিয়ে বেরুলে এই ট্রাফিক জ্যামটার মোকাবিলা করতে পারতেন। থিয়েটার রোডের ওখান থেকে রাস্তাট ক্রস করে নিল সঞ্জীবন। ও-ফুট দিয়ে গেলে আর মোড়ে অসুবিধে হবে না। কেমন ইচ্ছে করল চার্চের পাশ দিয়ে, চার্চ নয় ক্যাথিড্রাল, অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টস এর পাশ দিয়ে যাবে। একটু ঘুর হবে-টিলটিলকে হয়তো একটু অপেক্ষা করতে হবে। তা হোক। টিলটিল সে সময়টা রাগ-টাগ না করেই কাটিয়ে দেবে এখন। অ্যাকাডেমির পাশ দিয়ে যেতে যেতে সঞ্জীবনের মনে পড়ল বছর তিনেক আগে এখানেই তাদের বিপ্লবী শিল্পী সংঘের প্রদর্শনী হয়েছিল। খুব সফল হয়েছিল সেটা। তার পাঁচটা ছবির একটা সিরিজ ছিল। সব বেনারসের বিভিন্ন ঘাট। সুষ্ঠু রঙের ফুচকি (ফুটকি বেশ গোল একটি বিন্দু, কিন্তু বিন্দুটা যদি সুগোল না হয় ব্লচ মতো হয়, ত্যাড়াব্যাঁকা বা রং ছেটকানো, তাহলে সেটা ফুচকি < সঞ্জীবন) দিয়ে আঁকা দশাশ্বমেধ ঘাটের ছবিটা খুব প্রশংসা পেয়েছিল। বিক্রি হয়েছিল সবারই দু-একটা করে, শুধু অনন্ত ঘড়াইয়ের একটাও বিক্রি হয়নি। ঘড়াই বিড়ি খেত, ভাঁড়ে চা পছন্দ করত, তার গুরু-পাঞ্জাবির কলার সদাই ফাটা। এবং বোতামপটির ফাঁকা লম্বাটে ত্রিভুজ দিয়ে তার আশ্চর্য ঘন নোম বিশিষ্ট সরু বুক এক চিলতে দেখা যেত। সেই থেকে ঘড়াই তাদের বিপ্লবের প্রতীক হয়ে গেল। হাতে চায়ের গনগনে গরম ভাঁড় নিয়ে যে চা না চলকে হা-হা অট্টহাস্য হাসতে পারে, যার পায়জামার বড়ো বড়ো ঘেরের মধ্যে পা কোথায় বোঝা যায় না, অথচ যে না-ঠো কর খেয়ে যেন শূন্যে ভেসে যাওয়ার মতো চলে যেতে পারে, সে নেতা হবে না তো কী? ঘড়াইয়ের ডেরায় ঘাম, স্বেদ, রক্ত, আবার সেই ঘাম স্বেদ, তা ছাড়া গাঁজা-বিড়ির ধোঁয়ায় একটা ক্রিয়েটিভ নরকস্বর্গ কি তৈরি হত না?
