ভোর থাকতে থাকতে ছোট্ট আড়াই কামরার ফ্ল্যাটটি ঝাড়াপোঁছা করে সে। জল ভরে, বাসন মাজে, প্রাতরাশ তৈরি করে, বছর সাতের মেয়ে আর বছর পাঁচের ছেলেটিকে খেতে দেয়, টিফিন তৈরি করে, রাস্তার মোড়ে তাদের স্কুলবাসে তুলে দিয়ে আসে। বাড়ির তালা খুলে এবার ভেতরে ঢোকে সে। খুব একটা ভালো দৃশ্য নেই। তবু ছোট্ট বারান্দাটাতে কীসের আশায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। সময় হলে ছেলেমেয়ে দুটিকে বাস রাস্তা থেকে বাড়ি নিয়ে আসে। খেতে দেয়। তারা ক্লাবে খেলতে যায়। সে বারান্দাতে বসে থাকে। দুর্বল মাথা, প্রাণপণে মনে করতে চেষ্টা করে কী তার নাম, কবে কোথায় প্রথম জেলে নিয়ে গিয়েছিল। আন্তর্জাতিক অপরাধী…।
রাত আটটায় হয়তো মি. দারুওয়ালা ফিরলেন। মিসেসের ফিরতে আরও দু ঘন্টা। দু-জনে খেতে বসলেন। তাঁর যা যা খান সব শিখিয়ে দিয়েছেন ভিখুকে। সে দিব্যি মাংস বানায়, মোটা মোটা তন্দুরি রুটি, লাচ্ছা পরোটা, আচার কিনে আনে, সবজি বানায়, ডালভাজি কালিড়াল সব শিখে গেছে সে। তার মনিব খুশি। মুম্বইয়ের তুলনায় অনেক কম মাইনেতে পেয়েছেন তাঁরা লোকটিকে। প্রতিবেশীরা ঈর্ষা করে। বাচ্চা দুটিও ভারি খুশি। দু-জনে দাবা খেলে, কমপিউটার গেম খেলে। শান্ত হাত পা কোলে করে ভিখু বসে থাকে। ভেতরে কেমন একটা শান্তি। বয়স হয়ে গেছে, বেশি তো সময় আর নেই, পৃথিবীর মেয়াদ ফুরিয়ে এল। এইরকম একটা খাটা-খোটা নিশ্চিন্ত জীবন ইতিমধ্যে বেঁচে নিতে খারাপ লাগে না তার। রবিবার দিন ওঁরা এক এক সময়ে বাচ্চাদের নিয়ে বেড়াতে যান। কোনো কোনো দিন নিজেরা বাড়িতে থেকে তাকেই একটু ঘুরতে পাঠান। এইভাবেই তিন-চার বছর কেটে যায়। দারুওয়ালারা ভাবেন আর কী চাই! ভিখু ভাবে এই তো বেশ।
এক রবিবার বেশ দূরে একটু ঘুরে অনেকক্ষণ ধরে সমুদ্র দেখে হাওয়া-টাওয়া খেয়ে এসে সে অবাক হয়ে দেখে বাড়ির দরজা খোলা। ভেতরে ঢুকে চক্ষুস্থির। ঘরে রক্তগঙ্গা। চারটি মৃতদেহ পড়ে আছে, মহিলা এবং তাঁর বাচ্চা মেয়েটির গায়ে কাপড় নেই। আলমারিতে চাবি ঝুলছে। একটা গোঙানির মতো আওয়াজ করে জ্ঞান হারিয়ে সেইখানেই পড়ে যায় ভিখু এবং এইভাবেই পুলিশ তাকে আবিষ্কার করে।
অনুসন্ধানে বার হয় সেই দিনই দারুওয়ালারা আঠারো লাখ টাকা বাড়িতে এনেছিলেন, কিছুর একটা পেমেন্ট। যদিও খুনের অস্ত্র বা টাকাটা পাওয়া গেল না। তবু তার ইতিহাস এবং পরিস্থিতি তাকেই খুনি বলে সাব্যস্ত করে। আশপাশে সবাই বলতে লাগল, অত কম টাকায় অত ওস্তাদ নোকর। তখনই আমাদের সন্দেহ হয়েছিল! আসলে কিন্তু মোটেই সন্দেহ হয়নি।
সরকার বনাম ভিখু মামলায় ভিখুর তরফের সরকার-প্রদত্ত দাতব্য উকিল প্রায় সারাক্ষণই মাথা ঝুলিয়ে বসে রইল। সরকারি প্লিডার বললেন, বিশ্ব হুজুগে কোনো কোনো ঘৃণ্য-অপরাধী ছাড়া পেয়ে গিয়েছিল। এ ব্যক্তিটি তাদেরই একজন। এবার অপরাধের শান্তি দিয়েই ছাড়ব। ধর্ষণ, খুন এবং জালিয়াতিও। কেননা ভিখু বলে পরিচিত সেই লোকটি আসল নাম লন্ডন জেলের আধপচা নথি পত্রের থেকে পাওয়া গেছে। ভগোয়ান পরসাদ। যে ভগোয়ান সে ভিখু সাজে কেন?
সুতরাং একদিন নির্বিঘ্নে ভিখুর ফাঁসি হয়ে গেল। জল্লাদ এই সুযোগে নিজের মজুরি বাড়িয়ে নিল। পুলিশ অফিসারের প্রমোশন হল, দপ্তরের সবাইকে একদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারি খরচে ভূরিভোজ খাইয়ে দিলেন। ভিখুর লাশটাতে জল্লাদ সুদ্ধ থুথু ফেলল—বেইমান!!
স্মৃতিভ্রষ্ট বেকুব ভাগোয়ান পরসাদের ফাঁসি হয়ে গেল। কিন্তু প্যান্ডোরার বাক্স থেকে ছাড়া পাওয়া শয়তান-পরসাদগুলি চতুর্থণ প্রতাপে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াতে লাগল।
গন্ধ
দূরে সরে বসলে কেন?
এমনি।
এমনি? আমায় ভয় করো? আমার স্পর্শ বাঁচাচ্ছ? অচ্ছুত আমি?
না তো।
তাহলে কি আমি উঠে যাব?
প্লিজ না।
তাহলে? কাছে এসে বোসো। দেখছ না কী সুন্দর সবুজ জল টলটল করছে, জলের ভেতর পদ্মপাতা, পদ্মপাতার মধ্যে পদ্মের নাল, তার ওপর পদ্ম ফুটেছে, লাল পদ্ম, যাকে বলে কোকনদ!
তার ভেতরে মধু, মধুতে ভোমরা, ভোমরায়…
ঠাট্টা করছ? ঠাট্টা করে আসল কথাটা এড়িয়ে যেতে চাইছ।
আসল কথা আবার কী?
ওই—এমন দিনে কাছে আসা যায়।
আচ্ছা, সঞ্জু তুমি কি সত্যিই জানো না কেন তোমার কাছে বসছি না?
না সত্যিই না, কেন? জিজ্ঞেস করছি তো?
কস্তুরীমৃগ তো শুনেছি আপন গন্ধে পাগল হয়।
হঠাৎ? কস্তুরীমৃগ?
সঞ্জু সঞ্জু। ডোন্ট মাইন্ড, তুমি এই টেরিলিনের শার্ট পর কেন? ভয়ানক দুর্গন্ধ বেরোয় ঘামের। তুমি কি সত্যিই পাও না?
এই কথা? টিভির বিজ্ঞাপন? ঘামের গন্ধ পৌরুষের গন্ধ তা জানো?
তুমি কি তাই ভেবে সান্ত্বনা পাও? ঘাম, রক্ত, স্বেদ, এইসব এইভাবে ভাবো?
আমি কিন্তু ওভাবে ভাবি না। পৌরুষ হল নিজেকে শুদ্ধ সুরভিত করা।
অর্থাৎ আফটার শেভ লোশন। চামড়ায় গন্ধঅলা পারফুম, ও ডি কোলন…
না সঞ্জু, নিজেকে শুদ্ধ সুরভিত করা মানে এই গরমের দিনে অন্তত চারবার অ্যান্টিসেপটিক সাবান দিয়ে চান, সুতির পোশাক পরা, গায়ে কষে প্রিকলি হিট পাউডার…
আবার টিভির বিজ্ঞাপন? স্বাস্থ্য ও সৌন্দর্য রক্ষায় লিভোসিন, ট্রিংলিং।
সঞ্জু, ঘামের গন্ধ মানে কিন্তু সত্যিই ব্যাকটিরিয়ার সংক্রমণ! সত্যিই কিন্তু তার থেকে বাঁচতে হলে চান চাই, সাবান দিয়ে, লেবু-গন্ধ-অলা হলে ভালো হয়।
