চেকনাই আর মাছঅলার সব কথা আমি ভূত হয়েও ভালো বুঝতে পারিনি। নেহাত কৌতূহলে চেকনাইয়ের পেছু নিয়েছিলাম। তা বেরিয়েই চেকনাই একটা বিরাট মিছিলে আটকে গেল। একটু পরে দেখি লোকটা বিনবিন করে ঘামছে। ইশারায় মুটেটার কাছে জল চাইল। আমার অভিজ্ঞতা আছে, বুঝলাম লোকটার স্ট্রোক হচ্ছে। ধড়াস করে পড়ল। ছুটে এল কিছু লোক।
আধমনি কৈলাশ, আরও কজন লাগবে। এই একটা ট্যাক্সি দ্যাখ তো!
মুটেটা ততক্ষণে মোট সুষ্ঠু হাওয়া হয়ে গেছে।
ট্যাক্সিটা যদি বা পেল, মিছিল পার হতে পারল না। মিছিল যদি বা পেরোল, হাসপাতালে জায়গা হল না। হাসপাতালে যখন জায়গা হল তখন চেকনাই হুশ করে আমার পাশে এসে গেছে। একটার পর একটা এসে যেতে লাগল এর পর। বাচ্চা, ধাড়ি, বউমানুষ, আধবুড়ো… গাদা একেবারে। চেকনাই টক করে হাওয়া হয়ে গেল। বলে গেল টা টা বাই বাই!আবার যেন দেখা পাই। আলাপ করার ইচ্ছে ছিল সাহেব দাদা, দেদার ফাঁকা জমি পড়ে রয়েছে আপনাদের ওদিকে। কিন্তু মিছিল, এই মিছিলকে আমি বড্ড ভয় পাই। এই প্রেতলোকের ছবিটা আমি আগাগোড়া তুলি। এখানে কথা কম। কাজ বেশি। তা ছাড়া আমার আর অসুবিধেই বা কী!
তা যদি বলেন মিছিলে আমারও বড্ড ভয় ধরে গেছে। কোনো যুক্তি নেই, তবু ভয়। পালাতে থাকি।
৭.
ঘোর অন্ধকারে উন্মত্ত কাণ্ডের সামনে পড়ে যাই। একটা মেয়ে আর তাকে ঘিরে তাকে নিয়ে সাত-আটটা লোক, তাদের পরনে ইউনিফর্ম। মেয়েটা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় আর গলা দাবিয়ে খুন করে দেয় ওরা। ক্লিক। আলোয় অন্ধকারে এ রকম আরও দৃশ্য দেখি, গাড়ি থামিয়ে টেনে বার করছে। মোটর বাইকের পেছন থেকে টেনে নামাচ্ছে। গলিতে গলিতে ওত পেতে আছে। লাথি মেরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে নায়কোচিত দর্পের সঙ্গে গালাগাল সহযোগে ধর্ষণ ও খুনের কাজটা সম্পন্ন করছে। পাঁচটা লোক একটা লোককে জ্যান্ত অবস্থায় পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে কাটছে দেখলাম। বুলেট, ড্যাগার, স্টিক, ক্লিক ক্লিক ক্লিক।
কারা যেন প্রচণ্ড চ্যাঁচায়। এই সমস্ত কার্যকলাপের প্রতিবাদে নিশ্চয়ই। পটকা ফাটছে, রকেট উঠে যাচ্ছে আকাশে। বড়ো বড়ো করে লেখা ব্যানার, ওয়ার্ল্ড কাপ রানার্স জিন্দাবাদ। ওয়ার্ল্ড কাপ রানার্স জিন্দাবাদ। গাঁদা ফুলের পাপড়ি ছড়ানো পথে যাই, দুধারে জনতা উন্মত্তের মতো শিস দিচ্ছে, নাচছে। বাজনা বাজছে। জিতল কে? জিতল কে লাল হলুদ আবার কে? পিলপিল করে ছেলে-বুড়ো মেয়ে-পুরুষ ছুটছে—এ পথ দিয়ে মহাতারকারা যাবেন, বলিউড! বলিউড! সমস্ত উঠে যায় আমার ভূতগ্রস্ত ক্যামেরায়।
অসীম ধৈর্যে ভিড় পার হয়ে একটি মলিন চেহারার ছেলে বাড়ি ফেরে, আজ টিইশনের টাকাটা পেয়েছি মা, রাখো।
এত কম?
ভাইরাল ফিভারে কামাই হয়ে গেল, কেটেছে।
দুটি মেয়ে পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতে বলতে ভিড় বাসে উঠে গেল। বুটিকটা শুরু করবার টাকা জোগাড় করতে হবে বুঝলি? গোলি মারো কনট্র্যাক্টের চাকরিকে! এবং কোথা থেকে ধোঁয়ার মতো কবিতা ওঠে, গান ওঠে, ঝমঝম করে বাজনা বাজে দিগন্ত থেকে দিগন্তে। সুন্দর সুন্দর প্রেক্ষাগৃহ। গান হচ্ছে, চটুল গান, গভীর গান। কবিতা হচ্ছে, গল্প হচ্ছে, নাটক হচ্ছে। প্রেমের কবিতা, প্রতিবাদের কবিতা, গ্রামের গপ্পো, শ্রমজীবীদের গপ্পো, ষড়যন্ত্রের নাটক, কিস্তুত নাটক। মেলা দেখি, অজস্র মেলা। আর তার পরেই একটা বিশ্রী ঘটনা ঘটে। অলিগলিতে ঘুরে বেড়ানো কুকুররা আমার প্রেত দেখতে পেয়ে যায়। ছুটে আসতে থাকে লক্ষ লক্ষ ঘেয়ো কুকুরের পাল, লম্ফঝম্প, কেউ কেউ, ঘোট ঘোউ। কাকেরা গলা মেলায়। শকুন ঘুরতে থাকে হাসপাতালের আস্তাকুঁড়ে। জিঘাংসায় মৃত, ধর্ষণে হত, দুর্ঘটনায় থ্যাঁতলানো শবরাশির ওপর। ক্রমে এই সমস্ত শব শকুন হত্যা হস্তশিল্প কুকুর ও কবিতা ছাপিয়ে উঠতে থাকে কাকের আওয়াজ, আজানের সুর, গ্রন্থপাঠ, ধর্মগুরুদের স্বস্তিক সদানন্দ মুখনিঃসৃত শিবনেত্র উপদেশামৃতের গমগমে আওয়াজ। মাথা তুলে উঠতে থাকে সুপার মার্কেট, বিশাল বিশাল বিলাসবহুল সব পেয়েছির দোকান। চরম হতাশায় বুঝতে পারি দেখনসুন্দর, মাখনহাসি, গহন-পচা মাটিল্ডার প্রেত এখন বিছিয়ে আছে গোলার্ধের এই অক্ষাংশ এই দ্রাঘিমায়।
আমার সারা জীবন-মরণের সবচেয়ে অ্যাবসার্ড ছবিটি আমি পাঠাতে থাকি তরঙ্গে তরঙ্গে যতক্ষণ না কোনো লেক রোডের কোনো অম্বুজ শ্রীনিবাসন তার অ্যান্টেনায় পুরোটা নির্ভুল ধরতে পারে। কেন না প্রেত হলেও শেষ বিচারে তো আমি শিল্পীই।
প্রকাশ না করে আমার উপায় কী!
ক্যালভেরি
বাজারে জোর গুজব এক নির্দোষ ব্যক্তিকে জেলে বন্দি করে রাখা হয়েছে। কী অপরাধ সন্দেহে তাকে ধরা হয়েছিল, কত বছর সে বন্দি আছে সে খবর কেউ জানে না। এমনকি কোন দেশের জেলে সে পচছে সেটাও ঠিক করে কেউ বলতে পারে না। শুধু বিশ্ব গুজব। গুজব কানাকানিতেই ছড়ায়। তা এখন তো কানাকানি শুধু রামে-শ্যামে, টমে-ডিকে হয় না, হয় ইংল্যান্ডে-আমেরিকায়, চিনে-ফ্রান্সে, ভারতে-রাশিয়ায়…। মিডিয়া যখন খবরটা কবজা করল তখন সেটা প্রায় বাসিই হয়ে গেছে। তবে বিশদ বৃত্তান্ত তো পাবলিক জানে না। এইখানেই কাগুঁজে কেরামতি। মজা হচ্ছে সব দেশের প্রধান কাগজই ভেবেছে এটা তার স্কুপ, শেষ রাত্তিরে কোনোক্রমে পাতা করেছে সব। সকালবেলা গরমাগরম বিকোবে। হায় কপাল! সকাল হতেই সব চক্ষু চড়কগাছ। তবে ওই যে ডিটেল? ডিটেলেই রকমারি মশলা।
