সর্বনাশ! জঞ্জালের পাহাড়টা যে ওদের ওপর ভেঙে পড়ল? ক্লিক।
৫.
আমার আশেপাশে এখন বেশ কয়েকটি প্রেতশিশু। নিরবয়ব ঠোঁটে হাসি ছড়িয়ে যাচ্ছে।
১ম জন—দমবন্ধের সময়ে এটুখানি কষ্ট হয়েছিল। তোর?
২য় জন-তুই কি ওই বদবুতে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা বলছিস?
১ম জন—ধেৎ, বদবু আমাদের মা-বাপ, বদবু আমাদের ভাত দেয়, তুইও যেমন!
৩য় জন—না রে, ওই পাহাড়ের ভেতরে একশোটা হাজারটা আধা-খ্যাঁচড়া ব্যাঙাচি মেয়ে আছে। পেট থেকে বের করে টেনে ফেলে দেয় তো? দুর্গন্ধ বলে দুর্গন্ধ?
১ম জন—ওদের বেশ আর জন্মাতে হল না! যাক, আমরাও আর জন্মাচ্ছি না। ময়লা ঘেঁটে ঘেঁটে কাগজ, টিন, বোতলভাঙা বার করো রে, সর্দারকে দাও রে, পিটুনি খাও রে!
৪র্থ জন—এখন থেকে পেট ভরে ভাত খাব। আর মাংস। তারপরে সেই ঝলমলে দোকানটা থেকে সায়েবি জামাকাপড় কিনব, প্লেনে উড়ে চলে যাব অনেক দূরে, সায়েবদের দেশে যেখানে বড়ো বড়ো বাড়ির বড়ো বড়ো ইস্কুলের ছেলেমেয়েরা চলে যায়!
২য় জন—(হেসে) খাবি যে তোর মুখ, জিভ, দাঁত কই? পরবি যে তোর ধড় কই? দেখছিস না কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। অথচ বুঝতে পারছি তুই খন্তা, আমি পচা, ওটা মকবুল। ভুতো, রাজু, আসগর আর হরিশ উড়ে আসছে দ্যাখ।
এ বার আমার দিকে ওদের চোখ পড়ল, তুমি সায়েব-ভূত না?
ঠিক সাহেব নয়, আমি আমার গায়ের রং আর আদি জন্মস্থানের কথা ভেবে বলি।
সায়েবের মতো, তাই না? ওই যে নীচে একটা জায়গা আছে সেখানে অনেক সায়েবের মতো আছে, দেখবে?
আমি আমার ক্যামেরা রেডি করি। নীচে একটা বিরাট ইনস্টিটিউট বাড়ি থেকে দলে দলে বেরিয়ে আসছে প্রচুর, হ্যাঁ, তরুণ-তরুণীই তো মনে হল। সবাই একই রকম টাইট টপ আর টাইট জিনস পরেছে।
একজন আর একজনকে বলল, হাই ক্রিস, ডিসিশন নিলি?
দ্বিতীয় জন–নারে প্যাটস, আই নিড আ ফিউ ডেজ মোর, মুঝে টাইম দে বাবা, দিজ ওল্ডিজ আর সো বোরিং।
প্রথম জন—হোয়াটস দা গ্রেট প্রবলেম? তুই ক্রিস থাকবি গোমজির সঙ্গে, এর মধ্যে ওল্ড পিপল আসছে কী করে!
দ্বিতীয় জন—আরে বাবা, গোমজ এবার স্টক মার্কেটে কত হেরেছে জানিস? ফিফটিন ল্যাকস, বেবি। ইউ নিড ক্যাপস, বুড়োবুড়ি চট করে দেবে নাকি?
তৃতীয় জন—তো যা, কত লিটার অয়েল লাগবে হিসেব কর। ডিসগাস্টিং! ধরিয়ে দে না পাত্তি পুরিয়া, দিতে পথ পাবে না।
অনেকটা সায়েবের মতো, নয়? খন্তা বলল।
আমি ভাবতে থাকি, ভাবতে থাকি। ঠিক সাহেবদের মতো কি?
আরও দেখাচ্ছি, এসো।
হুশ করে নেমে পড়ি একটা আধা-অন্ধকার ঘরে। আলো জ্বলছে, নিবছে, প্রায় বিবসন তরুণ-তরুণী নাচছে। এঁকেবেঁকে, যেন ঘরময় সাপ কিলবিল করছে। ক্যামেরা সক্রিয় হয়ে ওঠে।
দ্যাখো, ওরা কী খাচ্ছে!
নীলিম আকাশের নীচে নীল সুইমিং পুলের পাশে কাবাব উৎসব হচ্ছে। কাবাব মোগলাই ডিশ। আমার খুব প্রিয়। এলাহি আয়োজন।
রাজু বলল, আরও খানা আছে। পিলা, সফেদ, হর রং। কী খুশবু! আচ্ছা সায়েব ভূত, ওরা সব খেতে পারে না। তবু আমাদের দেয় না কেন বলো তো?
কালু বলল, আসল কথাটা বল না, খালি পিলা-লাল। ও সায়েব-ভূত, সায়েবদের দেশের রাস্তাটা বাতলে দেবে?
অনেক দেশ তো আছে। কী রকমটা চাও?
যেখানে মা-বাবা থাকে। বাবা মাকে ঠ্যাঙায় না। মা বাবাকে খিস্তি করে না। যেখানে সর্দার আমাকে চোর-ঠ্যাঙান ঠ্যাঙায় না। আমাদের নীল-সাদা বাসে করে ইস্কুলে নিয়ে যায়। আর যে দেশে সত্যিবাদী লিটার আছে।
লিটার?
ওই যে গো মানুষের মতো। ওরা মাঝে মাঝে দাঁড়ায় আর বলে ভাত দেব, জল দেব, লাইট দেব, পাকা ঘর দেব, কিন্তু দ্যায় না।
শিশুর দল কলবল কলবল করতে করতে মিলিয়ে যায়। সাহেবদের দেশের কথা ভুলে, জীবন্মুক্তির খুশিতে ভরপুর।
৬.
নিঃসঙ্গ আমার লেন্সে ভেসে ওঠে বাজার।
পাঁচ আঙুলে পাঁচ আংটি ধবধবে পোশক এক চেকনাইঅলা কালো ব্যক্তি টাইগার প্রন-এর ঝাঁকার সামনে দাঁড়িয়ে।
৬০০ টাকা দর কিন্তু।
আরে যা যাঃ, দর দেখাসনি, পাঁচ কেজি তুলে দে। আছে তো? তোপসে দে চার কেজি। একটি রোগা, ভুড়িঅলা নিরীহ চেহারার লোক এসে দাঁড়ায়। পরনে লুঙ্গি। বলে, মিরগেল আজ কত যাচ্ছে?
মাছঅলা তোপসে ওজন করছিল। জবাব দিল না। একরাশ কুচোমাছ একদিকে জড়ো করা ছিল। সেদিকে আঙুল দেখাল।
সসঙ্কোচে কিছু কুচোমাছ কিনে লোকটি চলে যায়। কুচোমাছের খদ্দের আর পাঁচ-ছ কেজির খদ্দেরকে যার যার সওদা সুষ্ঠু ক্যামেরায় ধরে রাখি।
মাছওলা বলল, পেনশন পজ্জন্ত পায়নি, আবার মিরগেলের দর…
চেকনাই বলল, কে ওটা?
যদুগোপাল ইস্কুলের মাস্টার।
তা পেনশন পেল না কেন?
হেডমাস্টার আর পেনশন আপিসের বাবুদের খাওয়ায়নি। আবার কী? ওরা কাগজপত্তর সব গোলমাল করে রেখে দিয়েছিল। পাঁচ বছর জুতোর সুকতলা খুইয়ে এখন বলচে পেনশন হবে না।
বলিস কী রে? তা তুই এত জানলি কী করে?
আমার ছেলে দুটো তো ওই ইস্কুলের। আবার ওই মাস্টারের পাইভেট ছাত্তরও ছিল। বড়োটাকে বি কম পজ্জন্ত পাস করাল। ঢুকিয়ে দিয়েছি সরকারি আপিসে। সিডিউল কাস্টোর খাতায়। ছোটোটা ঘষটে ঘষটে একটা পাস দিয়েছে। ধরেছে প্রোমোটারি করবে।
হাঃ হাঃ বলল কী হে? আমার ভাত মারবে?
সসম্ভমে মাছঅলা বলল, আপনি প্রোমোটার নাকি? এ দিকে তো দেখিনি!
এ বার দেখবে। রূপসায়র-এর বোর্ড দেখেছ তো? জলাটা বুজোতে মেলা। ঝামেলা গেল। পাকাঁপাকি থাকব তেরো তলায়। শিগগির আসছি।
