হ্যাঁ, ডিটেলে নানান তফাত। বিশ্বের এক অজ্ঞাত জেলে এক অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি অজ্ঞাত অপরাধে অজ্ঞাতসংখ্যক বছর বন্দি আছে–এরকম তো খবর হয় না। এত অজ্ঞাত দিলে পাবলিক কান মলে দেবে। কাজেই যে যার প্রতিভার পুঁটলি খোলে। কোনো কাগজে বলে লোকটা আছে ইংল্যান্ডের জেলে। কেউ বলে কুখ্যাত সাইবেরিয়ায়, কেউ বলে খোদ আমেরিকান যুক্তরাষ্ট্র, কেউ বলে করাচির যে জেলে জুলফিকার আলি ভুট্টোকে রাখা হয়েছিল সেখানেই, কেউ আবার বিস্ময় প্রকাশ করল—আমাদের এই ভারতের মহামানবের দেশে, একেবারে নাকের গোড়ায় তিহার জেলেই নাকি লোকটি শুষছে। ফলাও তর্কবিতর্ক, চিঠি কাউন্টার চিঠি চলতে লাগল। টেলিভিশনের সব চ্যানেলে থিকথিক করছে এক নিউজ, এক বিতর্ক। বি.বি.সি এ বাবদে মার্গারেট থ্যাচার, ব্লেয়ারের বিবৃতি নিল, সি. এন. এন নিল দুই বুশ, ক্লিন্টন, কলিন পাওয়েলের, এখানেও সব প্রাইভেট চ্যানেলে জোর যুক্তি-তক্কো-গপ্পো চলতে লাগল।
আপামর বাঙালির (রাজনৈতিক নেতারা বাদে) বিশ্বাস জায়গাটা সাইবেরিয়া এবং বন্দিটি নেতাজি সুভাষচন্দ্র বোস। না-ই যদি হবে তো রেনকোজির ভস্মর ডি. এন. এ টেস্ট করালি না কেন? কেউ খুঁতখুঁত করে, সে বললে তো তাঁর বয়স একশোরও অনেক বেশি হয়ে যায়। লোকটি সে রকম বুড়ো-অথর্ব বলেও তো শোনা যাচ্ছে না! নেতাজি-গরবে গরবি বাঙালি জ্বলন্ত চোখে বলল, মহামানবদের ক্ষেত্রে এমনটাই হয়ে থাকে। আবেগের চোটে বাংলা ভুলে বাঙালি স্লোগান দিতে লাগল—আওয়ার নেতাজি অমর রহে, যুগ যুগ জিও সুভাষচন্দর, নেতাজি সুভাষ জিন্দাবাদ, অবিশ্বাসী মুর্দাবাদ।
আপামর আরববাসী, সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক-বাসী (বুশ-ব্লেয়ার বাদে) আনন্দে নৃত্য করতে লাগল, এই হল আসলি মসিহা, ওসামা বিন-লাদেনের স্পিরিচুয়াল গুরু। কেউ বললে, এটা সাদ্দাম, তেল-সংক্রান্ত চুক্তিটা ফাইনাল না করে আমেরিকা ছাড়বে না। ইজরায়েল বাদে মধ্যপ্রাচ্য কট্টর পান-ইসলামিক পৃথিবীর স্বপ্ন দেখতে লাগল।
লোকটির নাম নাকি আন্তর্জাতিক অপরাধীর তালিকায় ছিল। দেশ থেকে দেশান্তরে জেল থেকে জেলান্তরে বদলি হয়েছে সে। কিন্তু কী যে তার সম্ভাব্য অপরাধের চরিত্র কেউ বলতে পারে না। যুদ্ধবন্দি? এই তো সেদিন হিন্দি-পাকি ভাই-ভাই-এর আবেগে প্রথম কাশীর যুদ্ধের কিছু ভারতীয় বন্দি ছাড়া পেয়ে বর্ডার পেরোল। যে যুবক ছিল, সে অবশ্য এখন অতি বৃদ্ধ, বেশির ভাগেরই পরিবারের সব মরে-হেজে গেছে। কেউ কেউ যুবক নাতির গলা জড়িয়ে কাঁদবার সৌভাগ্য সুযোগ পেয়েও কাঁদতে পারল না। কান্না শুকিয়ে গেছে। তবে? কনসেনট্রেশন। ক্যাম্পের কোনো ধাঙড়-মুফরাস না কি? না কি রাজনৈতিক অপরাধী–স্তালিনের সময়ে গুইগাঁই করেছিল বলে চালান হয়ে গেছে পোল্যান্ড থেকে পূর্ব জার্মানি, পূর্ব জার্মানি থেকে উত্তর কোরিয়ায়। স্পাই সন্দেহে আটক হয়েছিল, হচ্ছে বহু লোক, তাদের কেউও হতে পারে। কিছু প্রমাণ করা যায়নি। নথিপত্রও সব ব্যাখ্যাতীতভাবে হারিয়ে গেছে।
প্রশাসনের এই অদ্ভুত অবিচারের বিরুদ্ধে সব দেশের জনগণই খেপে উঠল। লোকটিকে মুক্তি দিতে হবে অবিলম্বে। ইংল্যান্ডে কালো পতাকা, ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউজ ঘেরাও, ফ্রান্সে ছাত্র-আন্দোলন, রাশিয়ায় প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিচ্ছিদ্র, চিনে তিয়ানানমমেন মেন স্কোয়্যার সিলড। ইরাকে ফটাফট গাড়িবোমা, কিছু মার্কিন ও ভূরি ভূরি ইরাকি ছিন্নভিন্ন। বেশি কথা কি, ভারতেই জেলে জেলে খুনজখমের আসামিরা অনশন ধর্মঘটে শামিল হল। আমাদের আটক রাখো, পরোয়া নেই, নির্দোষী ঠাকুরদাদার মুক্তি চাই। মানবাধিকার কমিশন, অ্যামনেস্টি ইনটারন্যাশনাল, ইউ. এন. ও সব নড়েচড়ে বসল। এরই মধ্যে ইজরায়েল ঘোষণা করল, সব বন্দি ছাড়তে পারি, প্যালেস্টিনীয় ছাড়ব না। সুইজারল্যান্ড বলল, আমরা বিদেশি টাকা ব্যাংকে রাখি, বন্দি রাখি না, স্ক্যান্ডিনেভিয়া বলল, আমরা নোবেল পুরস্কারে পর্যন্ত অবিচার করি না, আর বন্দির বেলায় করব? এই তালে ইন্ডিয়ার যত প্রাক্তন ও অধুনাতন মুখ্য ও প্রধানমন্ত্রীরা জেড প্লাস প্লাস নিরাপত্তা চাইতে লাগল। বিধায়ক, সাংসদরা নিরাপত্তার জন্য ঠেলাঠেলি শুরু করলেন। কে জানে খ্যাপা পাবলিক খ্যাপা মোষের মতো, কখন যে কার ভুঁড়ি ফাসিয়ে দেবে কেউ জানে না। দুগগা, দুগগা! ফলে কোনো থানাতেই আর পুলিশ রইল না। সাংসদ মশাইরা করবা চৌথ-এ স্ত্রীর পুজো পেতে যাচ্ছেন—ব্ল্যাক ক্যাট, অজ গাঁয়ের বিধায়ক মশাই মাঠ সারতে চলেছেন—ব্ল্যাক ক্যাট। চোর-জোচ্চোর বাটপাড়দের মহাফুর্তি। হাই-ফাই অপরাধীরা করুণা করে আই, পি, এসদের সঙ্গে আড্ডা দিতে লাগল। জলকর বসছে না বসছে না, হকার উঠবে কি থাকবে, গঙ্গা মহানন্দার পাড় ভাঙল কি ভাঙল না, জলে আর্সেনিক কমানো হবে কি হবে না, পারমাণবিক বর্জ্য কোথায় জমছে, ওজোন স্তরের ফুটো কতটা বাড়ল, মেরু বরফ কত ইঞ্চি গলল—এসব নিয়ে আর কারও মাথাব্যথা নেই।
অবশেষে চাঞ্চল্যকর খবর বেরোল—লোকটির নামের আদ্যক্ষর জানা গেছে। ভিপি বা ভি-ভি। হিন্দি বেল্ট বলল, এ নির্ঘাৎ আমাদের ভানপ্ৰতাপ ভুয়ালকা সমাজসেবক মানুষ, কী একটা স্ক্যাম নিয়ে চিরুনিতল্লাশির সময়ে উবে গিয়েছিলেন আহা! পূর্বাঞ্চল বলল, এ হল গিয়ে ভবদেব ভট্টাচার্য, আদি নিবাস ভাটপাড়া, শেষের দিকে ত্রিপুরা-আসামে বরো জঙ্গি আলফা জঙ্গিদের অহিংসাধর্মে দীক্ষা দিতেন, জঙ্গি ধরবার সময়ে পুলিশে একেও ভুল করে বদমায়েশি করে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। কেউ বলল, লোকটা আদৌ ভারতীয় নয়, কোন দেশি কে জানে, ওর নাম ভিভিয়ান পাস্ক্যাল ভারমন্ট। এরকম আরও কত নাম। কে কোন দেশি কেউ বলতে পারে না। রিফিউজি ছড়িয়ে পড়েছে ভুবন জুড়ে! কেউ আর সীমারেখা মানছে না। এ দেশের ভুখা মানুষ ওদেশে, এদেশের শুখা মানুষ এদেশে। যেখানে রুটিরুজি, যেখানে শান্তি, নিরাপত্তা সেখানেই ঠেলে উঠছে মানুষ। পারাপারি করতে গিয়ে মরুভূমিতে, তুষারভূমিতে প্রাণ দিচ্ছে কত মানুষ, যে জাহাজের সাগরে যাওয়ার কাল কবেই শেষ, তাইতে চড়ে মরিয়া মানুষ সলিলসমাধি পাচ্ছে।
