৩.
একটা পত্রিকার অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে পশ্চিম জার্মানিতে যেতে হয়। এয়ারপোর্ট থেকে একটা ঝকঝকে টয়োটা লেক্সাস ভাড়া নিলাম। বেশ কিছু ফোটো তোলা হল। তখন শেষ রাত্তির, মেয়েটা হালকা মাতাল ছিল। হাইওয়ে থেকে নেমে একটা পুরনো ধরনের গ্রামের ছবি তুলছিলাম। স্রেফ গাড়ির কাচ নামিয়ে। এমন সময়ে মাতালে-বুদ্ধিতে মেয়েটা একেবারে বিনি নোটিসে টপ গিয়ারে গাড়িটাকে হাইওয়েতে এনে ফেলল আর সঙ্গে সঙ্গে একটা বিশাল ট্রাকের সঙ্গে রাম-ধাক্কা।
মাটিল্ডার কিমাকার দেহটার দিকে চেয়ে মনে হল যাববাবা, বাঁচা গেল। পরক্ষণেই ভাবলাম, বাঁচবই বা কী করে? কে আর এই বাহাত্তুরে আধা-পঙ্গু ফোটোগ্রাফারের সহধর্মিণী হতে আসবে! আর তা না হলে কে-ই বা গাড়ি চালাবে! তারপর বোধোদয় হল। নিজের থ্যাঁতলানো মাংসপিণ্ডটাকে পরিষ্কার দেখতে পাই। এহেহে, বেচারা বুড়োটা! তবে বেঁচেই বা কী করত? তিলতিল করে মরা বই তো নয়? বড়ো চমকার মৃত্যু! বুঝতেই পারিনি কিছু! আ-হা। কিন্তু আমি তো তা হলে প্রেত! মাটিল্ডাও কি তবে প্রেতিনী! মারাত্মক ভয়ে আমি হাওয়ার সমুদ্র উথালপাতাল ফ্রিস্টাইলে সাঁতরে যাই। ব্রেস্ট স্ট্রোকে ঢু মারি আকাশ পর্দায় এবং এক সময়ে উছলে উঠি মহাকাশে।
অসাধারণ এক দৃশ্য আমার ফোটোগ্রাফার সত্তাকে টেনে বার করে। কোনো প্রেতবোধ, শূন্যতাবোধ আমার থাকে না। ফোটো তুলতে থাকি প্রাণ ভরে। যে দিকে তাকাই শুধু পিণ্ডে পিণ্ডে অগ্ন্যুৎপাত। গ্রহ তারা সৌরমণ্ডল নীহারিকা ছায়াপথ ধূমকেতু লালবামন শ্বেতবামন কৃষ্ণগহবর অ্যাস্টারয়েড। আশ্চর্য! অত্যাশ্চর্য! এই সব ফোটো যদি নেচার-এ পাঠাতে পারতাম একটা যুগান্তকারী ব্যাপার হয়ে যেত। কিন্তু এও অতি আশ্চর্য যে এই অনন্ত চলন, বিরাট গরিমা তার প্রাথমিক জাদু ক্রমশ হারিয়ে ফেলল আমার চিত্রী চোখে। বড়ো একঘেয়ে লাগতে থাকে। খুব লজ্জা পাই এই মহামহিমের সঙ্গ আর আমার টানছে না বলে। কিন্তু সত্যি কথা না বলে তো নির্ভেজাল শিল্পীর উপায়ও নেই। নামতে থাকি এবং খুঁজতে খুঁজতে টুক করে পৃথিবীর আবহমণ্ডলে একটা ওজোন-ফুটো দিয়ে গলে পড়ি।
৪.
গ্লোবটার আলো-অন্ধকার আমার চোখের সামনে ঘুরে যায়। ভালো কথা, চোখ, ক্যামেরা এ সব কথা ব্যবহার করছি বটে, কিন্তু এ সব কিছুই আর নেই আমার। শুধু অভ্যাসটা আছে। সর্বসত্তা দিয়ে দেখতে পাচ্ছি তবু বলি চোখ। অনুরূপভাবে নাক, কান, মুখ হাত, পা…
আরও নীচে নামি। উত্তাল সমুদ্র, উত্তুঙ্গ পাহাড়, নিচ্ছিদ্র বনানী। নদীনালা, শহর, গ্রাম, মানুষজন। ছবি তুলে যাই কিন্তু বুঝতে পারি এগুলোর সনাতন রূপে কোনো মৌলিকত্ব আনতে পারছি না। ঢেউ উঠছে তত উঠছেই। ভাঙছে তো ভাঙছেই। সব নদী সমুদ্রের দিকে যায়। সব পাখি উড়ান শেষে নেমে পড়ে নীড়ে। মেরু অঞ্চল থেকে ক্রান্তীয় ও ক্রান্তীয় থেকে নিরক্ষীয় অঞ্চল পর্যন্ত ক্যামেরার লেন্স ঘুরে ঘুরে আসে। সোনালি বালু, মাসাই যোদ্ধা, রেন ফরেস্ট, সেকুইয়া ফরেস্ট—এ সব কত বেরিয়েছে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক-এর পাতায়। সুতরাং লেন্স ঘুরতে থাকে তৃপ্তিহীন। আর এই ভাবেই এক কৃষ্ণনীলিম রাতে ধরি আলোর ফুটকি দিয়ে আঁকা এক অসম্পূর্ণ গ্রাফিকস! বিন্দুর বিন্যাসে ঢেউ। কিন্তু নিউ ইয়র্ক নয়। গোল গম্বুজ রয়েছে। কিন্তু একাধিক। ওয়াশিংটন নয়। কতকগুলোর চারধারে মিনার, কোনোটার মাথায় পরি। কোনোটার মাথায় নিশান। দৈর্ঘ্যে বড়ো প্রস্থে ছোটো এক মুঠো এক শহর। উড়ালের ডানায় গাড়ির আলোর রেখা, নীচে গাড়ির ভিড়। আশ্চর্য হয়ে দেখি সেই সিগন্যাল সবুজ হয়, সব রকমের গাড়ির মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায় কে আগে যাবে। রেস নয়, অথচ ভয়ানক প্রতিযোগিতা। কী আশ্চর্য জাদু জানে এদের চালকরা। এ ওর পাশ কাটিয়ে এতটুকু জায়গা দিয়ে দিব্যি চলে যাচ্ছে। তিন চাকার এক রকম গাড়ি তো মনে হল সার্কাসি কসরত দেখাতে দেখাতে ছুটছে। নতুন রকম বটে। ক্লিক।
পেভমেন্টে জমাট জনতা। কোনো উৎসব নাকি? মনে তো হচ্ছে না। তা ছাড়া মানুষ ছাপিয়ে জেগে থাকে গম্বুজ, মিনার মন্দির। আরও সব বিল্ডিং-এর উদ্ভাসিত বডি। হালকা কুয়াশায় মোড়া চুমকি বাহার। এই চুমকিস্তান আমার খাসা লাগে। আরও নেমে যাই সুতরাং। দেখি এক কালো গুহা থেকে ছত্রভঙ্গ মানুষ-পিঁপড়ের দল উঠে আসছে। যেন কোনো মহাভয় থেকে পালাচ্ছে। নির্ঘাৎ এখানে কোনো সন্ত্রাসবাদী হানা…ও হো, এটা পাতালরেলের সুড়ঙ্গ! লজ্জা পেয়ে দিক পরিবর্তন করি। রাস্তায় রাস্তায় সুদৃশ্য লম্বা বাড়ি, পাশে ভ্যাটে ছড়ানো পাকার জঞ্জাল। নাক নেই তবু গন্ধ বুঝি। তারপর গন্ধ চিনে চিনে পৌঁছে যাই জঞ্জালক্ষেত্রে। ঘুরে বেড়াচ্ছে অজস্র কীট। না, কীট তো নয়, ময়লা শিশু সব জঞ্জাল খুঁটে খুঁটে কী জানি কী থলিতে পুরছে। পাশ দিয়ে হুশ করে চলে গেল নীল-সাদা বাস, বাস ভরতি চকচকে ঝকঝকে বাচ্চার দল কলকলাচ্ছে। শিশু-কীটগুলি জঞ্জাল খুঁটে খায়। বাস ভরতি শিশুগুলি কলকলিয়ে যায়। বুঝে যাই এখানে আসলে দুটো শহর আছে। গরিব শিশুর শহর আর সচ্ছল শিশুর শহর। আর গরিবরা গরিব হলে কী হবে, তাদের বাচ্চা জন্মানোর কামাই নেই। জন্মানো বাচ্চাগুলোর দেখভাল কিন্তু কেউ করে না। বেশ স্পার্টান ব্যবস্থা। পারলে বাঁচো, নইলে ময়রা!
