কা? কা? কা?
কাকের গলায় এমন আর্দ্র, সুদূর, মন-শূন্য করা জিজ্ঞাসা আগে কখনও শোনেনি সে। কাক না ঘুঘু। তফাত করা যায় না।
ক্যালকাটা মকটেল
২০০৩-এর আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ফোটোগ্রাফটি সর্বদেশীয় বিচারকমণ্ডলীর দৃষ্টি আকর্ষণ করল তার নাম ক্যালকাটা মকটেল। চিত্রী অম্বুজ শ্রীনিবাসন। কারিগরি আছে ছবিটাতে। কোলাজ, সুপার ইমপোজিশন, নেগেটিভ ইত্যাদি অদ্ভুতভাবে ব্যবহার করে ছবিটি যেন স্টিল ফোটোর সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কেউ বললেন স্টিল হয়েও এ চলচ্চিত্র, কেউ বললেন এ কবিতা, কেউ বললেন, এর মধ্যে খুব জটিল ছোটোগল্পের গুণাবলি দেখা যাচ্ছে। মোট কথা, ছবিটি সকলকে আশ্চর্য ও মুগ্ধ করল। বলা বাহুল্য, দেড় লাখ ইউ এস ডলারের প্রথম। পুরস্কারটি শ্রীনিবাসনই পেল। পৃথিবীতে আলোকচিত্র-প্রেমীর অভাব নেই। শ্রীনিবাসনের ফ্যান মেলটি বেশ পুরুষ্টু হতে লাগল। অনেক গুণমুগ্ধ জিজ্ঞেস করতে লাগল—এই অদ্ভুত ছবিটি সে কী ভাবে ভাবল।
দেখুন, শিল্পী মাত্রেই জানেন কত অর্থহীন এই প্রশ্ন এবং কত প্রত্যাশিতও। শিল্পী কি সব সময়ে সত্যিই জানেন কী ভাবে কী ঘটে তাঁর মাথার মধ্যে? কোথাও তিনি মানবসীমা ছাড়িয়ে যান। মিস্টিক, একটা অতীন্দ্রিয়ের হাতছানি তাঁকে নিশি ডাকে ডেকে নিয়ে যায়।
অম্বুজ জানে, অথচ জানে না। সে ফোটো-জার্নালিস্ট। পেশাদার। এর নাড়ি নক্ষত্র তার জানা। কিন্তু এ ছবির আইডিয়াটা একটা হঠাৎ ঝলক, তারপর ক্রমিক ঝলক। যখন কাজটা শেষ হয়ে গেল সে বুঝতে পারল এতক্ষণ সে একটা ঘোরের মধ্যে ছিল।
২.
পশ্চিম জার্মানির এক অটোবানে মারাত্মক গাড়ি দুর্ঘটনায় আমি মুক্তি পাই। মৃত্যু বলে মুক্তি কথাটা কেন বললাম, তার একটা বিশদ কারণ আছে। আমি মাটিল্ডার পাল্লায় পড়েছিলাম।
যা উপার্জন করতাম তাতে বেশ আরামে থেকেও মোটের ওপর চলে যেত। দু বার স্ত্রী বদলে ঘাড়মোড় ভেঙে যার প্রেমে পড়লাম সে পঁয়ত্রিশ। আমি সত্তর। যতই বয়স হয়, ততই কিছু কিছু মানুষ তরুণী-লোভে পাগল হয়। আমিও হয়েছিলাম। চিকনচাকন বাদামি চোখের ধোঁয়াটে চুলের মাটিল্ডা আমাকে চুম্বন টানে টেনে নিয়েছিল। আধা ব্রুনেট ঝলমলে এক কপর্দকহীন ডিভোর্সি। পঁয়ত্রিশ কি পঁচিশ বোঝা শক্ত। সময় কাউকে কাউকে ছোঁয় না। আমার চোখ আর বাকি সব ইন্দ্রিয়ও তো তখন সত্তর পার! তা এই আধাব্রুনেট সুন্দরীটি আমাকে কী কারণে পাত্তা দিল? আসলে মেয়েটা ছিল ডাকসাইটে বেজন্মা। কোন দেশের কোন জাতির কোন ধর্মের রক্ত যে তার ধমনিতে ছিল না, তা জানতে লাইব্রেরি-ভরতি বিজ্ঞান আর সমাজবিদ্যা লাগবে। বিজ্ঞান অবশ্য বলে থাকে এ রকম মিশ্রণে উন্নত ধরনের মগজ তৈরি হয়। কিন্তু এ মেয়েটা অদ্ভুত। নিজেকে নাস্তিক বলে গ্যাদা দেখায় আবার বিপদে পড়লেই বুকে ক্রশ আঁকে, দুষ্টু বুদ্ধির শিরোমণি অথচ কিছু শিখতে পারেনি। ফলে আকাট মুখ, মিথ্যেবাদী আর বিচ্ছিরি রকমের সুযোগসন্ধানী। ব্যালে ও বেলি-ডান্স দুটোই শিখতে গিয়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলে অবশেষে একটা নাটকের দলে ড্রেসগুছোনির কাজ করছিল। এদিকে আমি এক তীক্ষ্মনাসা, উজ্জ্বল চোখ, গ্রানাইটের তৈরি সন্ত-সন্ত চেহারার অতি স্মার্ট মোটামুটি বিখ্যাত ইনটেলেকচুয়াল, যাকে ঠিক অতটা বৃদ্ধ বলে বোঝা যায় না। আমার মনোযোগে ও অহংকারের সপ্তম স্বর্গ তো পেলই, উপরন্তু আমাকে সমাজে ওঠার একটি সোনার সিঁড়ি ঠাওরাল।
কিছুটা সময় অবশ্যই রূপ-রস-স্পর্শঋদ্ধ এক অবিশ্বাস্য মৈথুন স্বর্গে বাস করি, তারপর মোহভঙ্গ হয়। আরে ধ্যাত্তেরি, আমার আয় অনিয়মিত, বুঝে খরচ করলে যথেষ্টর বেশি, না করলে পপাত। আজ এই ডিজাইনার ড্রেস চাই, কাল ওই মুক্তোর ছড়া চাই, পরশু চাই কমল-হিরের ব্রুচ। সীমাসংখ্যা নেই আবদারের। না রাঁধবে বাড়িতে, না যাবে সস্তার জায়গায় খেতে। তার ওপর মদ্যপ। নির্জলা। হুইস্কিতে হুশ করে পৌঁছে গেল। সন্দেহ হয় বার থেকে, লোকের বাড়ির সেলার থেকে বোতল হাতাত। বাধা দিলে তুলকালাম। গালিগালাজ, জিনিসপত্র ভাঙচুর। পার্টিতে পার্টিতে আমাকে ধরে বিশিষ্ট মানুষদের সঙ্গে পরিচয় করত। প্রথম পাঁচ মিনিটে সম্মোহন, দ্বিতীয় পাঁচ মিনিটে বিদ্যে জাহির। তৃতীয় পাঁচ মিনিটে পরিষ্কার হয়ে যেত ওর মূর্খামি। ওর এই হ্যাংলাপনা, ইতরামি ক্রমে আমার অসহ্য হয়ে উঠতে লাগল। তৃতীয় বিবাহ-বিচ্ছেদের কথা ভাবছি, এমন সময়ে বছর দুইয়ের মাথায় আমার সেরিব্রাল স্ট্রোকটি হল।
গেল মোটর নার্ভগুলো। চিকিৎসা। অজস্র ফিজিয়োথেরাপি। তার পর আস্তে আস্তে হাত-পা নাড়ি। টলে টলে উঠে দাঁড়াই। হাতে ওঠে লাঠি। প্রাণপণ মনের জোরে নিজেকে একটা মোটামুটি কর্মক্ষম অবস্থায় নিয়ে আসি। রোজগারপাতি কমে গেল। মাটিল্ডা উঁচু ডালে মই বাঁধবার চেষ্টা করল কয়েক বার, কিন্তু টিকতে পারল না। দায়ী ওর সেই আকাটমি। শরীর দেখানো, চুরিচামারি আর ঝগড়া করা ছাড়া আর কিছুরই তো চর্চা করেনি। ককেশীয় রক্তের এই একটা সুবিধে। গায়ের রং, উচ্চতা, গঠন, চোখ-মুখের সৌন্দর্য জিনগত ভাবে পেয়ে থাকে। একটু যত্নআত্তি করলে, ফ্যাশান-ট্যাশন জানলে দাসীকে দাসী বলে চেনা যায় না। মা মেরির দিব্যি বড্ডই নীচু স্তরের। মজা হল আমরা পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম এই সময় থেকেই। পার্ট টাইম বেশ্যাগিরি আর পার্ট টাইম দাসীগিরি করে ও-ই আমার থেকে বেশি রোজগার করত। তার ওপর পেশার প্রয়োজনে একটু না ঘুরলে আমার চলে না। কে গাড়ি চালাবে মাটিল্ডা ছাড়া? ওকে ছাড়া আমার উপায়ও রইল না। হয়ে গেলাম ওর রাখনা। ওর দিক থেকে মাঝে মাঝে এক লপ্তে যখন অনেক টাকা রোজগার করতাম, তাই দিয়ে বড়োমানুষি করবার লোভ ছিল। তা ছাড়া বোধহয় একটা ভদ্রস্থ পরিচয়ের আড়াল ওর খুব দরকার ছিল। সুতরাং বিচ্ছেদটা মুলতুবি হতে হতে তামাদি হয়ে গেলই বলা চলে।
