কিন্তু, কী বারতা রেখে গেল ও? বি. এ. অনার্স, এম. এ., ছাত্রছাত্রী? ভালো টাকা? সত্যিই তো? প্রচুর ভালো নোটস আছে। রয়ে গেছে। চাকুরি যখন হচ্ছে না, উপার্জন করতে দোষ কী? এটা কেন এতদিন মাথায় আসেনি?
অতঃপর নটরাজ দিনের পাখি। রাতের পাখি। পুরাতন সাইকেলটা কাজে লাগছে, কাঁহা কাঁহা মুলুকে চলে যাচ্ছে নটরাজ। মাস গেলে পকেটে কড়কড়ে কাঁচা নোট। মাস গেলে বউদির হাতে সেভন হানড্রেড হোক।
দাদা মুখ ধুচ্ছে।—খ খি?
বিশেষ কিছু নয় দাদা, টিউশনি।
বউদি বলল, তা হোক। লক্ষ্মীর আবার জাত কী? মা সদাই মা।
আপন খাঁচায় ফিরে এসে এবার নটরাজের খি-খি করার পালা। হাতের নোটগুলো সাজায় আর হাসে, মা? অ্যাঁ? তোরা শেষ পর্যন্ত মা বনে গেলি? যা ববাবা।
ক্রমশ দশ হাজারি হয়ে তবে দম নেয় নটরাজ। সেবন্তীর বাড়ি জনা দশ একত্রে পড়ে। নিয়াজ হাসানের বাড়ি আরও দশ। রাজিন্দর সরানার ঘরটা আরও বড়ো। ওদের সব ঘরই হলঘর। ওখানে একসঙ্গে বারো জন। আর নটরাজের মাটি ভাপাবার সময় নেই। কে বলল খ, কে বলল খা, শোনার সময় নেই। লাইব্রেরি যাচ্ছে রেগুলার। জিরক্স করছে তাড়া তাড়া। বিতরণ হবে। মোটর সাইকেল কিনেছে, লাল হেলমেট, কোচিং যাবে। ফেল্টপেনের সেট। খাতা কারেকশন করবে। নটরাজ একাই একখানা চলমান ইউনিভার্সিটি।
ভালো উপরিও আছে প্রফেশনে। রেজাল্ট বেরোলে উপহার আসতে থাকে নানান কিসিমের। চিত্রাংশু দিয়ে গেল মিথস অ্যান্ড লেজেন্ডস, সুমনা এনেছে বিদেশি কলম, মাইকেল জ্যাকসন নিয়ে হাজির সুশোভন, মিতারা দশজনে মিলে কিনে এনেছে এনসাইক্লোপিডিয়া ছ-ভলুম। সুরানা রবীন্দ্র রচনাবলী রাজসংস্করণ।
ফুরফুরে চুল সাবধানে আঁচড়ে তাম্রলিপ্ত জিনস আর ক্রিম টি শার্ট পরিধান করে অতএব নটরাজ সেবন্তীর বাবার বাড়ি যায়। শ্রেষ্ঠ উপহারটি তিনিই দেবেন। দশহাজারি টিউটরের লালচে গাল, কালচে চুল, চকচকে খোলনলচে, ধুন্ধুমার মোটর সাইকেল, কথাবার্তায় সাবলীল দখল সেবন্তীর মতো সেবন্তীর বাবাকেও টানে। নামি বিজ্ঞাপন কোম্পানির দামি চাকরি তাঁরই সৌজন্যে হাঁকড়ায় নটরাজ। এবং শেহনাই বাজে।
নটরাজ সিনহা, যে একদিন নিজের পা খুঁজে পাচ্ছিল না, বাম্পার ড্র-এর ফার্স্ট প্রাইজখানাই সে পেয়ে গেছে লটারিতে। সে এখন শ্বশুরপ্রদত্ত সুবিশাল যোধপুরি ফ্ল্যাটে থাকে। মামাশ্বশুর প্রদত্ত কনটেসা হাঁকায়। ঘরে ঘরে অত্যাবশ্যক ভোগ্যপণ্য শীতাতপ নিয়ন্তাগুলি পিসিশাশুড়ি মাসিশাশুড়িরা যুক্তি করে উপহার দিয়েছেন। সেইখানে চিনে মিস্ত্রির তৈরি সেগুন কাঠের ফার্নিচারে অঙ্গ রেখে অফিসান্ত কাজকর্ম সাঙ্গ করেন বাদশাহ। চেহারায় আরও চেকনাই। চুলে আরও গ্লেজ। চলনে আরও উড়ান। বলনে আরও পালিশ।
কোনো কোনো উইক-এন্ডে বাদশা-বেগম সামাজিক হয়ে যান। বেলিয়াঘাটার পুরোনো পাড়ায় যান। পুরোনো বাড়ির চটা ওটা ফাটা-চাতালে দুটি চাতক পক্ষী। চাতক? না গায়ক?
দাদা ডাকেন, কুহুঃ।
বউদি ডাকেন, পিউ কাঁহা।
প্লেটে খাবার সাজাতে সাজাতে ডাকেন, খাবার তুলতে তুলতে ডাকেন, চা করতে করতে ডাকেন, সেই একই বউদি, যিনি অসামান্য প্রতিভায় টাকাকে মা বলেছিলেন। পাড়ার জ্যাঠামশাই এসে যান। এসে চেঁচিয়ে বলেন, তিনি বরাবর জানতেন নট এলেমদার ছেলে। খাটো গলায় আবার বলেন, অন্তত হাজার পাঁচেক যদি…বাড়িটা বড্ড আটকে গেল কি না…।
পাড়ার ঝগড়াটি ধনেশগুলো কী মন্ত্রে সব শিস দেওয়া বুলবুল-দোয়েল হয়ে গেছে। গেরস্থ পায়রাগুলো যারা নিজেদের থাকত, কদাচ গণ্ডির বাইরে পা ফেলত না, তারা সব কুতূহলী শালিখ হয়ে কদম কদম বেঢ়ে আসছে। নটরাজের অভিমুখে।
শুক-শারিকে ব্যাটবল নিয়ে মাঠ থেকে ফিরতে দেখে দপ করে মনে পড়ে গেল।
তোরা আজকাল টিউটরের কাছে পড়িস না?
পড়ি তো! টিউটোরিয়্যাল হোমে।
বউদি বলল, এক-এক সাবজেক্টের এক-এক টিচার রাখবার সংগতি নেই ভাই আমাদের। অগত্যা টিউটোরিয়াল।
কোথাও কোনো প্রতিশ্রুতি দেওয়া নেই। কারুর মনে কোনো সন্দেহ, ঘুণাক্ষরেও দানা বাঁধেনি। তবু…তবু জিজ্ঞেস করা গেল না। কেমন বাধো বাধো ঠেকল।
বউদি নিজেই কী ভেবে বলল, তা ছাড়া আলোকে দিয়ে হায়ার ক্লাসটা ঠিক হয় না। ওর তো দাদাটি আবার মারা গিয়ে বসে আছে। বাপের সংসার, দাদার সংসার সমস্ত ওর ঘাড়ে। অগুনতি টিউশনি করে।
দেখা হবার কথা নয়। অগুনতি টিউশনি করে যখন। তবু একদিন দেখা হয়ে গেল। বাই-পাস ধরে এসে বিজন সেতু দিয়ে গড়গড়িয়ে নেমেছে কনটেসাটা, বালিগঞ্জ স্টেশনের মুখে দু নম্বর থেকে নেমে এল আলো। মোটা ফ্রেমের চশমা। পুরু কাচের ওধারে চোখ গলে গেছে। শিটোনো। কেমন কালিঝুলি মাখা। শাড়িটা যেন বড্ডই বড়ো হয়েছে। কাঁধের ওপর দিয়ে সামনে এসে অর্ধেক আলোকে ঢেকে দিয়েছে। কেমন উড়োখুড়ো।
এ কি আলো? এখানে? চিনতে পারো?
চশমাটা বারবার ঠিক করে অবশেষে ঘাড় ঝাঁকিয়ে এক চোখে তাকিয়ে রইল আলো।
বলল–ক্কঃ।
আমি নটরাজ। নটরাজ সিনহা।
ক্কঃ, ক্কঃ, হক্ষ।
এ কী? এত কাশছ? ওষুধ খাও!
খাই তো! চলি, খুব দেরি হয়ে গেছে।
আলো আঁটসাঁট করে বড়ো কাপড়টা জড়িয়ে পরেছে। চটিটাও বোধহয় বড়ো। কেমন ঘষতে ঘষড়াতে চলে গেল।
অনেক রাতে সেবন্তী ঘুমে, বাড়ির কাজের লোকগুলি ঘুমে, সেবন্তীর ছেলে ঘুমে। কা! কা! কা! বিস্মিত, ব্যথিত, বিপন্ন ডাকাডাকি চরাচরে। ঘুম চটে যায় নটরাজের। জানলা থেকে ফিকে জোছনার প্রপাত দৃষ্ট হয়। অগত্যা নিশি ডাকে বারান্দায়। সৌর প্রকৃতির জাদুদণ্ড জোছনার গায়ে ভোরালো আলো-আঁধারি ছুঁইয়ে দিয়েছে। আর, বুঝি দুখনিশি ভোর—এই বিভ্রমে পাগলের মতো ডেকে ডেকে ফিরছে কাকেরা। সেই কাকই তো? ছরকুটে পা…কালিঝুলি…উড়োখুড়ো…?
