চুনী শ্ৰীলাকে প্রণাম করে ছলছল চোখে বাড়ি ছাড়ল।—বাবার সঙ্গে, দাদার সঙ্গে দেখা হল না মা। পরে এসে নিশ্চয়ই দেখা করে যাব।
আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর শেষ হয়ে গেল। প্রত্যেক মাসে, প্রত্যেকবার যখন পাপু আসে, শ্রীলা অবাক হয়ে দেখে, সে প্রতিদিন আরও সুন্দর, আরও শ্রীময়ী হয়ে উঠছে। বরাবরের গোলগাল ভাবটার ভেতর থেকে কে যেন বাটালি দিয়ে কেটে বার করে আনছে ধারালো চেহারা। গেয়ার, জেদি, রাগি, ভাবটা কোমল ঝলমলে লাবণ্যে কবে মিলিয়ে গেল। সে যে আপাদমস্তক জয়দীপ নামে মানুষটার বিস্ময় দিয়ে মোড়া, এখন বুঝতে পারছে না একটা অপরিমিত আনন্দের ভাণ্ডার তার সামনে কেমন করে খুলে গেল, এ বিস্ময় কেমন করে তার নিজের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল—এ কথা শ্রীলা-সুরজিৎ বুঝতে পারে। নিজেদের মধ্যে সুখের হাসি হাসে। যা হয়েছে ভালোই হয়েছে। ডিসেম্বরে জয়দীপ চলে গেল। এপ্রিলে ফাইনাল পরীক্ষা দিয়ে পাপুও যাবে। এ কটা মাস প্রধানত মায়ের কাছেই থাকছে সে। একদিন নিজের পুরোনো আলমারি গোছাতে গোছাতে পাপু একটা প্যাকেট হাতে বলল, মা, একদম নতুন একটা চুড়িদার-কামিজ রয়েছে, দ্যাখো, কী সুন্দর পাউডার ব্ল রংটা।
শ্রীলা মুখ ডুবিয়ে ডাঁই জামায় বোতাম বসাচ্ছিল। মুখ না তুলেই বলল, যা হঠাৎ তোর বিয়ের ঠিক হয়ে গেল, এখনও কত ওরকম নতুন ড্রেস পড়ে রয়েছে দ্যাখ। স্কার্ট-টার্ট নিয়ে যা না ক-টা। বিদেশে পরতে পারবি। নতুন নতুন জিনিসগুলো নষ্ট হবে, খুব গায়ে লাগে রে!
পাপু বলল, না মা, এটা একদম নতুন। কী সুন্দর চওড়া সাদা স্যাশ! শ্রীলা এইবার ফিরে দেখল। চিনতে পারল তিন-চার বছর আগের পুজোয় কিনে দেওয়া সেই চায়না-সিল্কের পোশাক যা পাপু কোনোদিন স্পর্শ করেনি। কেন পরেনি সেটা ও বেমালুম ভুলে গেছে। সে হেসে বলল, পর না পাপু, আজই পর।
পরব? চুল দুলিয়ে পাপু বলল, আজ বিকেলে একটু লাইব্রেরি যাব মা, তখন পরব, হ্যাঁ?
সন্ধে প্রায় হয়ে গেছে। এসব পাড়ায় শাঁখ বাজে না। কিন্তু ধূপ জ্বলে। শ্রীলা ঘরে ঘরে চন্দন-ধূপ জ্বালিয়ে দেয়। ধূপের অনুষঙ্গে শাখের আওয়াজও কেমন মনে এসে যায়, মনের মধ্যে বসে—স্বৰ্গত পূর্বনারীরা শাঁখ বাজান। অমঙ্গল অশুভ দূর হয়ে যাক এই প্রার্থনা বুকে নিয়ে মধ্য কলকাতায় ভীরু কিশোরী সন্ধের শাঁখ। সে সময়ে চারপাশ ঘিরে বাবা-মা-ঠাকুমা-দাদা-দিদিরা থাকা সত্ত্বেও সন্ধের মুখটাতে পৃথিবীটাকে কেমন একটা নাম-না-জানা অপরিচিত রহস্যের জায়গা, দুঃখের জায়গা বলে মনে হত। সেই বিষাদের অনুষঙ্গও ধূপের গন্ধের সঙ্গে সঙ্গে মনে আসে। এই সময়কার নির্জনতাটুকু শ্ৰীলা খুব রোমান্টিকভাবে উপভোগ করে।
বেল বাজল। ছেলে গেছে দিঘা। সুরজিৎ আজ অফিস ফেরত পাইকপাড়ায় যাবে। তার বৃদ্ধ জ্যাঠামশাই খুব অসুস্থ। আসতে দেরি হওয়ার কথা। তবে নিশ্চয় পাপুই। দরজার ফুটোয় চোখ লাগিয়ে কিন্তু সে পাপুকে দেখতে পেল না। আধা অন্ধকারে ল্যান্ডিংটাতে পুঁটলি হাতে করে যেন চুনী দাঁড়িয়ে আছে। দরজা খুলে দিয়ে শ্রীলা থমকে দাঁড়াল—চুনীই তো!
কী রে চুনী?
চুনী হঠাৎ ল্যান্ডিংটার ওপরেই বসে পড়ল। হাঁউ মাউ করে কেঁদে উঠে বলল, মা আমার তোমার কাছে আবার কাজ করতে দাও মা। তোমার কাছে আমায় ঠাঁই দাও মা!
আলোটা জ্বেলে দিল শ্রীলা। পেছনে পাপু এসে দাঁড়িয়েছে। হালকা নীল চুড়িদারে দেখছে চুনীকে। চুনীর সেই কালীঘাটের কালীর মতো চকচকে কালো কোথায় গেল? আপাদমস্তক খসখস করছে। এই ক-মাসে সে অমন হাড় জিরজিরেই বা হল কী করে? পরনের শাড়ি ব্লাউজ দুটোই চিট ময়লা। চুলে জট, যেন হাওড়া-শেয়ালদার সারাদিন ধরে বেগুন-ঢ্যাঁড়স-বেচা শহরতলির ফেরিওয়ালি। কিংবা সোজাসুজি ভিখারিনি। কোলে একটা পেট ফুলো, ন্যাংটাপুটো বাচ্চা ধরিয়ে দিলে মানাত।
শ্ৰীলা বলল, কাজ করবি তো বেশ কথা। কাঁদছিস কেন? সনাতনের কী খবর?
ও মিনসের নাম কোরো না মা, এ ক-মাসে চুনীর মুখের ভাষারও অনেক অবনতি ঘটেছে, ঠগ, জোচ্চোর, আমার জমানো টাকাগুলো তুইয়ে বুইয়ে নিয়ে নিয়েছে, শাউড়িতে আর ওতে মিলে মেরে মেরে আমায় উচ্ছন্ন করে দিয়েছে মাগো! এই দ্যাখো। ছেড়া ব্লাউজের ভেতর থেকে কালশিটের দাগ দেখায় চুনী, বলে, তারপর পরশুদিন কোত্থেকে ছেলেপুলে সুদ্ধ একটা বউকে নিয়ে এসে বললে, এই আমার আসল বউ। তুই দূর হয়ে যা—চুনী আবার হাঁউমাউ করে উঠল।
শ্রীলা এক মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর নিঃশ্বাস ফেলে বলল, কাঁদিসনি চুনী। ওরা ওইরকমই হয়। তুই তো আমাদের কথা শুনিসনি। ঘরে আয়। কাপড় দিচ্ছি, সাবান দিচ্ছি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে নে। সে আবার এসে গোলমাল করবে না তো?
ইস, গোলমাল করলেই হল? নিজেই তো বলল, কালীঘাটের বিয়ে আবার বিয়ে! এই বাড়িতে তোমার কাছে থাকতে পেলে আমি আর কোথাও কখনও যাবো না মা!
শ্রীলার এত দুঃখেও হাসি পেল। তার শাশুড়ি একবার বলেছিলেন, পেটের খিদে মিটে গেলে, গায়ে-গতরে একটু শাঁসজল লাগলেই এদের অন্য খিদে চাগাড় দিয়ে উঠবেই। তখন মিষ্টি কথাই বলো আর টাকাই দাও, কিছু দিয়েই বশ মানাতে পারবে না।
চুনী পুঁটলি খুলে বলল, তোমার দেওয়া সিল্কের শাড়িখানা খালি আনতে পেরেছি মা, গয়নাগুলো সুদ্ধ গা থেকে খুবলে খুবলে নিয়েছে।
