হাসবে না কাঁদবে শ্রীলা ভেবে পায় না। বলল, ওরা তো সব দিদির কলেজের ক্লাবের বন্ধু, মেয়ে-বন্ধুদের সঙ্গে ওদের কোনো তফাত-ই নেই। তোর কি তাই? তুই যেটা করিস সেটা ভালো দেখায় না তো বটেই, তুই একদিন মহা বিপদে পড়বি। কী বিপদ, কেন বিপদ কিছু কিছু বোঝবার বয়স তোর হয়েছে চুনী।
চুনী গোঁয়ারের মতো বলল, সবাই মোটেই দিদির কলেজের বন্ধু নয়, দিদি তো একজন লম্বা গোঁফ দাড়িঅলা ছেলের সঙ্গেও একা একা ঘোরে। সিনেমা যায়। ইস্টিশানে একদিন ট্রেন থেকে নামল।
তুই কোত্থেকে দেখলি?
আমি জানি।
শ্রীলা স্তম্ভিত।
সেদিন সুরজিৎ ফিরলে তাকে সব খুলে বলে শ্রীলা দৃঢ়কণ্ঠে দাবি জানাল, মেয়ের বিয়ে দিতে হবে।
সুরজিৎ বলল, খেপেছো? সবে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে, পার্ট ওয়ান এসে গেল। এখনই বিয়ে? তুমিই না বলতে মেয়ে তোমার ছেলের সমান। পড়বে, যতদূর ইচ্ছে, ডক্টরেট করবে, চাকরি করবে।
সে আমার ভাগ্য আর আমার মেয়ের ভাগ্য। কপালে যদি না থাকে আমি কি করব বলল, আমার দিক থেকে তো চেষ্টার ত্রুটি ছিল না।
সুরজিৎ বলল, তুমি এখনই অত হতাশ, অদৃষ্টবাদী হয়ে পড়ছ কেন? সে ছেলেটি কে, কার সঙ্গে মিশছে, ব্যাপারটা আদৌ সত্যি কিনা এসব জানো, জানতে চাও। চুনী কি না কি বলল, তুমিও অমনি বিশ্বাস করে বসলে? তা ছাড়া সত্যিই যদি সিরিয়াস কিছু হয় মেয়েকে টেনে এনে বিয়ে দিতে পারবে? না সেটা উচিত হবে? তুমি কোনকালে আছো বল তো?
শ্রীলা গম্ভীরভাবে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ। কিন্তু আমি মা। আমাকে সব সময়ে আগামীকালে থাকলে চলে না। তুমি যত সহজে জানো, জানতে চাই। বললে আমি তা পারব না। উপেদশটা তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। এটা আমার চ্যালেঞ্জ। বাবারা সব সময়ে কথায়বার্তায় সুপার ফাস্ট। কাজেকম্মে মান্ধাতার যুগে। আমি অন্তত এ বিষয়ে এটা চলতে দিতে রাজি নই।
সুরজিৎ বলল, ঠিক আছে। চ্যালেঞ্জটা আমি গ্রহণ করলাম। সুরজিৎ চ্যালেঞ্জ নেবার দিন সাতেকের মাথায় শ্রীলা জানল, গোঁফ-দাড়িঅলা লম্বা একটি বন্ধু সত্যিই পাপুর হয়েছে। ছেলেটি হোস্টেলে থাকে। এম-ই করছে। ইউনিভার্সিটির চত্বরেই আলাপ। পাপুর গ্রুপের সঙ্গেও ওর ভালোই চেনা। তবে হ্যাঁ, পাপু দু-এক দিন ওর সঙ্গে কয়েকটা খুব ভালো ভালো বিদেশি ছবি দেখতে এসপ্লানেড পাড়ায় গিয়েছিল। বালিগঞ্জ স্টেশনে একবার ওরা কয়েকজন বন্ধুকে ট্রেনে তুলে দিচ্ছিল, নিজেরা কোথাও যায়নি। পাপু জানতে চেয়েছে কোথা থেকে সুরজিৎ এত কথা জানতে পারল। সে তো লুকিয়ে কিছু করেনি। অন্যান্য বন্ধুদের মতোই জয়ও একদিন এ বাড়িতে আসতই। ইন ফ্যাক্ট জয় পরের রবিবার নিজেই আসতে চেয়েছে।
ছেলেটি–জয়দীপ—যেদিন বাড়িতে এলো সুরজিৎ, শ্রীলা তো বটেই পিন্টু সুষ্ঠু মুগ্ধ হয়ে গেল। সোজা স্বাস্থ্যবান চেহারা, দাড়ি গোঁফে দারুণ ইনটেলেকচুয়াল দেখায়। অথচ কোনো কৃত্রিমতা, কোনো দম্ভ নেই। এঞ্জিনিয়ার হলে কি হবে, কবিতা এবং ফিলম সম্পর্কে দারুণ আগ্রহ, শুধু পাশ্চাত্য সংগীত সম্পর্কে কথা বলেই সে পিন্টুকে কাত করে দিল। খাবার সময়ে খুব সহজভাবে জয় জানাল সে শিগগিরই এম আই টিতে ডক্টরেট করতে চলে যাবে। বাবা মার ইচ্ছে বিয়ে করে যায়। বউকে শিগগিরই নিয়ে যেতে পারবে। পাপুর সঙ্গে বিয়ে হলে সে খুব আনন্দিত হবে। শ্ৰীলা সুরজিৎ উভয়েই অবাক। এত তাড়াতাড়ি, এভাবে যে এমন প্রস্তাব কেউ করে ফেলতে পারে তারা ভাবতেই পারেনি। পাপুটারও মুখ লাল হয়ে গেছে। সে বোধ হয় এত সব ভাবেনি।
সুরজিৎ বলল, সে কি! তোমার বাড়ি, বাবা-মা?
জয় হাসল, বলল—বাবার বর্ধমানে নার্সিংহোম আছে। ডাক্তার। মা-ও সেসব সামলান। ওঁরা নিশ্চয়ই শিগগিরই এসে দেখা করবেন। তবে বিয়ের ব্যাপারে আমার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। পাপুর পার্ট ওয়ানের পরই বিয়েটা হতে পারে। ডিসেম্বর নাগাদ আমি চলে যাব। পাপু পার্ট টু-টা দিক। তারপর আমি এসে নিয়ে যাব। পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কোর্স ওখানেই করবে। অসুবিধে কি? স্টুডেন্টস ভিসায় বরঞ্চ এটাই যাবার সুবিধে। আমি আমার বায়োডাটা কাল পরশুর মধ্যেই দিয়ে যাব।
জুলাই মাসের এক আশ্চর্য সুন্দর বৃষ্টি-বোয়া অকালবসন্তের হাওয়া-বওয়া দিনে মাত্র উনিশ বছর বয়সে পাপুর বিয়ে হয়ে গেল। এবং জুলাই মাসেরই এক উপঝুরস্ত বাদল দিনে চুনী এসে শ্রীলাকে জানাল, সে কাজ ছেড়ে দিচ্ছে। কারণ সে বিয়ে করছে। বর রাজমিস্ত্রি। সনাতন মিস্ত্রির নাম এ দিকে কে না জানে, ঢালাই বাবদই হাজার হাজার টাকা কামায়। তাকে আর চাকরি করতে দেবে না। বর। বারুইপুরে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে থাকতে হবে। কোনো ঝাট-ঝামেলা নেই। খালি এক শাশুড়ি।
শ্ৰীলা অবাক হয়ে বলল, কবে হবে বিয়ে? কোথায়?
চুনী সলজ্জে জানাল, বিয়ে হয়ে গেছে গত পরশু। কালীঘাটে। চুলের ভেতরে সিঁদুর সে লুকিয়ে রেখেছিল।
শ্রীলা বলল, আগে বললেই পারতিস। তোর বাবা-মা নেই। আমরাই দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ে দিতে পারতুম। একটু খোঁজ-খবর নিতে পারতুম।
চুনী সলজ্জ নতমুখে নখ খুঁটতে খুঁটতে জানাল, তারও দিদির মতোই হুট বলতেই বিয়ে হয়ে গেল।
শ্রীলা মনে মনে খুব খানিকটা হাসল। কে জানে, দিদির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতেই বিয়েটা ও হুট করে করে ফেলল কি না! কিছুই অসম্ভব নয়। সে পাপুর উপহারের শাড়ি থেকে বেছে একটা রংচঙে ভালো সিল্কের শাড়ি চুনীকে দিল। নিজের একটা হালকা রুপোর সেট ছিল, সেটাও দিয়ে দিল। বলল, এতদিন চাকরি করে যা পয়সা জমালি সব পোস্ট অফিসে ভোলা আছে। এই নে পাস বই। সাত বছরে এগারো হাজারের মতো জমেছে সাবধানে রাখিস চুনী। এই এখন তোর সর্বস্ব।
