ঠিক আছে। তুই এই কাপড়খানা পর। শ্রীলা নিজের ঘরে গিয়ে আলনা থেকে তার ঘরে পরার একখানা শাড়ি আর ব্লাউজ তক্ষুনি এনে দিল।
যা বাথরুমে যা চুনী। এরকম নোংরা হয়ে থাকিসনি। দেখতে পারছি না।
চুনী বাথরুমে ঢুকে গেল। শ্রীলা হালকা মনে পাপুর ঘরে ঢুকল।
ভালোই হল, বুঝলি পাপু। এতদিন ধরে লোক খালি আসছে আর যাচ্ছে। একটাও ভালো…
থমকে গেল শ্ৰীলা। পাপু বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে। নীল চুড়িদার পরনে। তার পিঠের দুটো তিনকোণা হাড় জামার মধ্যে দিয়ে উঠেছে নামছে। ঝুঁটি বাঁধা চুল পিঠ থেকে কাঁধের ওপর জাপানি পাখার মতো ছড়িয়ে গেছে। ছবিটা কেমন পরিচিত লাগল শ্রীলার। সে ঝুঁকে পড়ে পাপুর পিঠে হাত রাখল। হঠাৎ কী হল?
সে নরম গলায় বলল, পাপু! জয়ের জন্য মন কেমন করছে? আর ক-মাস পরেই তো দেখা হযে, কাঁদছিস কেন?
পাপু তেমনি উপুড় হয়ে ভাঙা ভাঙা বোজা গলায় বলল, মা, চুনীর কী কষ্ট…মা! কেন এমনি হবে? শ্ৰীলা ঝুঁকে ছিল। সোজা হয়ে গেল। খাটের মাথার দিকে শুভ্র দেওয়াল। সেখানে কি কোনো লিখন? অনন্ত-কারুণিক কোনো আশিস-দৃষ্টি? নিদাগ দেয়ালের সেই অলক্ষ্য চাহনির দিকে শ্রীলা তাকিয়ে রইল পরম আনন্দে, বিষাদে। কৃতজ্ঞতায়। পাপু কাঁদছে। নিজের জন্য নয়। চুনীর জন্য।
কাঁটাচুয়া
ডক্টর প্রণব নাথ একজন বছর তেত্রিশের এমবিবিএস ডাক্তার, নিজের বিচারেই তিনি সাধারণ। অল্পস্বল্প প্রাইভেট প্র্যাকটিস আর বেসরকারি হাসপাতালের সহযোগিতায় তাঁর দিনকাল ভালোই কাটে। স্ত্রী এবং চার বছরের মেয়ের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া, এক সঙ্গে টিভি দেখা, সময়মতো খাওয়াদাওয়া, আরাম-বিশ্রামের সুযোগ পান। অধিকতর সফল বন্ধুবান্ধব কি দামি ডাক্তাররা যখন পিঠ-চাপড়ানোর ভঙ্গিতে বলেন, তুমিই ভালো আছ প্রণব, একেবারে প্ল্যানড আউট লাইফ অ্যান্ড লাইফস্টাইল, আমাদের দ্যাখো মাঝরাত অবধি দৌড়োচ্ছি, সামাজিকতার তো প্রশ্নই নেই, ফ্যামিলির সঙ্গে টাইম স্পেন্ড করা কোনো অতীতের কথা, যে কোনো দিন বউ ডিভোর্স চাইতে পারে—তখন প্রণবের মনের অবস্থাটা ঠিক কী দাঁড়ায় বলা মুশকিল। বগুলোর ওপর ক্রোধ, না কি হীনম্মন্যতা, না কি বেশ আছি, তোদের রক্তবেচা কালো টাকা আমার দরকার নেই গোছের একটা মনোভাব? কে জানে, তবে সেদিন রাত নটা নাগাদ প্রণব ডাক্তার নিজের চেম্বারে তিরিক্ষি মেজাজে বসেছিলেন। সন্ধে ছ-টা থেকে ঝাঁপ খোলেন। আজ একটিও মক্কেল নেই। গত দু-দিনও প্রায় এই অবস্থাই গেছে। যে ওষুধের দোকানটার লাগোয়া তাঁর চেম্বার, তারা এমনিতেই তাঁর ওপর একটু চটা, কেননা, তিনি সবসময়ে তাদের দোকানে পেশেন্ট পাঠান না, তারা যেসব ব্র্যান্ড রাখে সেগুলোও সবসময়ে রেকমেন্ড করেন না। রোজ বেরোনোর সময়ে তারা চোখ চাওয়াচাওয়ি করে, অন্তত প্রণবের তাই মনে হয়। শীতকাল ন-টায় চেম্বার বন্ধ করার কথা। দূর হোক গে, আর অপেক্ষা করবেন না, এক্ষুনি বন্ধ করে দেবেন। উঠে চেয়ারের পিঠ থেকে কোটটা নিয়ে হাত গলাচ্ছেন, শূন্য ওয়েটিং রুম থেকে কতকগুলো বিধবস্ত, কেমন আতঙ্কিত গলা ভেসে এল।
ডক্টর আছেন?
প্রণব ডাক্তার দাঁড়িয়ে গেলেন। তারপর পেশাদার গলায় বললেন, আসুন।
একটি রক্তাক্ত ছেলেকে ধরাধরি করে আনল আরও দুটি ছেলে, তাদেরও শার্ট প্যান্টে ছোপ।
কী ব্যাপার? অ্যাকসিডেন্ট! হাসপাতালে চলে যান স্ট্রেট।
না, ঠিক অ্যাকসিডেন্ট বলা যায় না স্যার, আগে প্লিজ একটু দেখুন, একটা ফার্স্ট এড যদি…
ছেলেটির বাহারি টিশার্ট, তার তলায় বহু বিজ্ঞাপিত গেঞ্জি একেবারে রক্ত মাখামাখি হয়ে গেছে। আর্তনাদ করছে ছেলেটি। কিন্তু উধ্বাঙ্গের জামাকাপড় তো খুলতে হযেই। খুলে বড়ো আশ্চর্য জিনিস দেখলেন ডাক্তার। ছেলেটির সারা গায়ে সমান দূরত্বে কতকগুলো ফুটো ফুটো ক্ষত। কাঁটার মতো ছোটো নয়, গুলির মতো বড়ো নয়। রক্ত পড়ছে ঝুঁঝিয়ে। বেশ গভীর…..চটপট ডিসইনফেকট্যান্ট দিয়ে ক্ষত পরিষ্কার করে, ওষুধ লাগিয়ে ড্রেসিং করে দিলেন তিনি। প্রেসক্রিপশনের ওপর কলমটা স্থির, একটু গেরেম্ভারি চালে বললেন, কিছু ফুটেছে। কী করে হল?
অন্য দুই তরুণের চোখে হঠাৎ একই সঙ্গে ভয় আর সতর্কতার লালচে-কালচে আলো জ্বলতে দেখলেন তিনি। বললেন, কী করে হল ঠিক করে বলো!
এতক্ষণে তিনি হৃদয়ংগম করেছেন, ছেলেগুলি বাইশ-তেইশের মধ্যে। জামাকাপড়, হেয়ার স্টাইল, মোবাইলের মহার্ঘতা এবং মুখের চেহারা দেখে মনে হয় হয় এরা পয়সাঅলা, কিন্তু নিম্নরুচির পরিবারের ছেলে। যেমন এখন চারদিকে প্রচুর হচ্ছে। হিন্দি সিনেমায় নগ্নিকারা সুইটহার্ট, নায়করা এদের রোল মডেল, হঠাৎ গজিয়ে ওঠা ভোগ্যবস্তুর প্রাচুর্যের দিকে এরা লঙ্গরখানাগামী ভিখারিদের মতোই আদেখলা চোখে ছুটে যায়।
কী করে হল—তিনি আবারও কড়া গলায় বললেন, বাড়িতে কি কোনো বন্যজন্তু পোষা হয়?
সেটাই তো!–একটি ছেলে বলে উঠল, বাইপাসের দিকে বেড়াতে গিয়েছিলাম মানে এই আমরা তিনজন। মেন রাস্তা ছেড়ে একুট পাশের দিকে নেমে, মানে নেচারস কল। আমাদের এই বন্ধু…
নাম কী?
নাম মানে ইয়ে মানে আদিত্য আগরওয়াল…
হ্যাঁ, তারপর বলো…
ও-ই নেমে যায় আগে। কিছুর ওপর ও হুমড়ি খেয়ে পড়ে চিল্লাচ্ছিল। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে এসেছি।
