অগত্যা আর বছরখানেকের মধ্যে শ্রীলা চুনীকে শাড়ি ধরায়। পাপুকে পারবে না। পাপু এখনও অনেক বয়স পর্যন্ত অনেক রকম পোশাক পরবে। চুনী তো আরও ক্ষয়া চেহারার মেয়ে, স্বাস্থ্য অনেক ভালো হলেও পাপুর কাঠামো সে পাবে কোথায়? অনায়াসেই আরও ক-বছর চালিয়ে দিতে পারা যেত। চুনীর খুব পছন্দ হচ্ছে না ব্যাপারটা, বোঝাই যাচ্ছে। ফ্রক-স্কার্টে বয়সটা বেশ ঢেকে রাখা যায়। সব মেয়েই বাচ্চা থাকতে চায়। শ্রীলাদের ঘরের মেয়েও। চুনীদের ঘরের মেয়েও। শ্ৰীলা নিজের একটা লাল শাড়ি বাছে। লাল রংটা আজকাল আর পরছে না সে। শাড়িটা দিব্যি নতুন।
চুনী, চুনী, দ্যাখ দিকি, এই শাড়িটা পছন্দ হয় কি না।
লাল টাঙ্গাইল শাড়ি, জরিপাড়। এই অসম্ভব প্রাপ্তিতে খুশিতে ঝলমল করতে থাকে চুনী।
এটা আমার, মা?
হ্যাঁ রে তোর, বেশ লম্বা হয়ে গেছিস, শাড়ি ধরে ফ্যাল এবার।
চুনী আমতা আমতা করতে থাকে, মাঝে মাঝে পরব মা। সব সময়ে পরলে কাজের অসুবিধে হবে না?
যেগুলো আছে সেগুলো পরতে থাক। এরপর যখন দরকার হবে শাড়িই দেব। সিদ্ধান্ত নেওয়ার গলায় শ্রীলা বলে। আরেকটা পরিত্যক্ত ছাপা শাড়ি এনে চুনীকে গছায়, সেই সঙ্গে আনুষঙ্গিক সমস্ত। ব্লাউজগুলো একটু ঢলঢলে করে, চুঁচ-সুতো দিয়ে তাকে মেয়ে ছোটো করে নেয় চুনী। কখনও শ্রীলা নিজেই করে দেয়। এইভাবে একরকম হঠাৎই চুনীর ফ্রক-স্কার্ট থেকে শাড়িতে উত্তরণ ঘটে যায়। পাপর সঙ্গে তাকে গুলিয়ে ফেলবার কোনো উপায়ই থাকে না। একজন জিনস টিশার্ট, অন্যজন শাড়ি। একজন লম্বা স্কার্ট, অন্যজন শাড়ি। একজন কাফতান, অন্যজন শাড়ি। শাড়ি এবং শাড়ি এবং শাড়ি।
প্রথম প্রথম কাঠিতে জড়ানো কাপড়ের মতো দেখাত শাড়ি পরিহিত চুনীকে। কিন্তু বেশ কয়েক বছর শ্রীলা সুরজিতের সংসারে থেকে তার কালো রঙে চাকচিক্য এসেছে, চুলে ঔজ্জ্বল্য। এখন শাড়ির আড়ালে হঠাৎ-ই যেন তার শরীর ভরে উঠতে থাকে। পরিচ্ছন্ন পাট পাট করে ধোপদুরস্ত, রং-মিলোনো শাড়ি ব্লাউজ পরে চনী যখন ঘোরে ফেরে দোকানের শো-কেসের কালো মডেল পতলের কথা মনে পড়ে যায় শ্রীলার। কিন্তু খুব শীগগিরই শ্রীলা অস্বস্তির সঙ্গে আবিষ্কার করে চুনী শুধু তার চোখেই নয়, পাড়ার রিকশাঅলা, বহুতলের কেয়ারটেকার, দারোয়ান, চায়ের দোকানের ছেলে, পাড়ার কিছু অকালকুম্মাণ্ড—এদের চোখেও বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। চুনীর বিকেলের ছুটির সময় ক্রমশই বাড়ছে। অন্যান্য বাইরের কাজ, যেমন দুধ আনা, বাজার করা, মিষ্টির দোকান ইত্যদিতেও সে অনেক বেশি সময় নিচ্ছে। এবং সময়টময় নিয়ে যখন বাড়ি ফিরছে তখন সারা শরীরে বেশ একটা হিল্লোল নিয়ে ফিরছে। চোখে মুখে যেন খুশি আয় ধরে রাখতে পারছে না।
একদিন পিন্টু এসে বলল, মা, চুনীটা কি ওস্তাদ হয়েছে জানো, রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটা কুলি-কাবাডি লোকের সঙ্গে যাচ্ছে তাই ইয়ার্কি দিচ্ছিল। আমি দেখেও ফেলেছি, শুনেও ফেলেছি।
শ্ৰীলা গৃহসমস্যার সব কথা সুরজিৎকে বলে না। এটা বলল, দিনকাল ভালো। এভাবে চললে বিপদে পড়তে কতক্ষণ?
সুরজিৎ গম্ভীর মুখে বলল, আরও আদর করে শাড়ি পরাও!
কেন, কত দুঃখে শাড়ি ধরিয়েছি জান না নাকি? শ্রীলা রাগ করে বলে। সুরজিৎ হেসে বলল, যে কারণেই পরিয়ে থাক, তোমার হাত থেকে তাস এখন বেরিয়ে গেছে। এবার ট্রাম্পড় হবার জন্য প্রস্তুত থাক।
সত্যিই চুনীকে সামলানো এবার দায় হয়ে উঠল। যখন তখন খিল খিল খিল, চুনী কাজ করছে না তো, ঘরে-দোরে নদী বইছে, এত ঢেউ। চুড়ির রিনিঠিনি, বাহারি টিপের রংচং, চটির ফটাস ফটাস। মাথায় টপ নট। ক্লিপ দিয়ে দুপাশ থেকে চুল তুলে মাথার পেছন দিকে আটকানো, বাকি চুল ছাড়া পেছনে, চুনী কিছুই শিখতে বাকি রাখেনি। লাল শাড়ি পরে এইভাবে ঢেউ কাটতে কাটতে চুনী সুরজিৎকে, পিন্টুকে জলখাবার দেয়। শীলার চোখ করকর করে। নানা ছুতোয় ধমকায় সে মেয়েটাকে।
পিন্টু বলে, কী রে চুনী, আজ যে দেখছি টিকায়াম আগুনম।
চুনী দারুণ চালাক। ঠিক ধরতে পারে, বলে, বাজে বকো না দাদা। যতই অং বং চং বল ফিলিমের আসল হিরোইনরা রেখা শ্রীদেবী সব কালো, কুচকুচে কালো।
সুরজিৎ বলে, তাই নাকি রে?
শ্ৰীলা প্রসঙ্গ থামাতে এক ধমক দেয়, তুমি চুপ কর তো। চুনী চুপচাপ কাজ কর। যত্ত বাজে কথা।
চুনী দাঁত বার করে বলল, হি, আমি সত্যি জানি মা, সববাই তো আর পাপুদিদির মতো গোরে গোরে নয়।
তুই থামবি? শ্রীলা আবার বলল।
পাপু শেষ লুচিটা কোনোমতে মুখে পুরে উঠে গেল।
চুনীকে সোজাসুজি ধমকানোটা আর এড়ানো যাচ্ছে না। হেমন্তের সন্ধে। রবিবার। শ্রীলা ছাড়া কেউ বাড়ি নেই। চুনী আজ্ঞা সেরে বাড়ি ফিরল।
শ্ৰীলা গম্ভীর মুখে বলল, চুনী শোন। চটিটা ছেড়ে এসে এ ঘরে শোন।
চুনী আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে এসে দাঁড়াল।
যত রাজ্যের ছেলের সঙ্গে অত বাজে বকবক করিস কেন রে? সিঁড়ির মোড়ে দাঁড়িয়ে লিফটম্যান জালাল। নীচে দারোয়ান বাহাদুর, রাস্তার হরেকরকমের ছোকরা তাদের সঙ্গে তোর অত কলকলানি কীসের? বিপদে পড়তে চাস না কী?
চুনী আঙুলে শাড়ির আঁচল জড়াতে জড়াতে বলল, দিদি তো করে। দিদির তো অত ছেলে-বন্ধু, তারা বাড়িতে এসে যখন গল্প করে দিদিও তো হেসে হেসে ইয়ার্কি দেয়। তখন তো কিছু বল না। তা ছাড়া আমি তো শুধু রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে একটু গল্প করি, দিদি যে সিনেমায় যায়, পিকনিকে যায়, সেগুলো বুঝি কিছু না।
