দুধে কেন সর রে? পাপু দুধে মুখ দিয়েই মুখ বিকৃত করে ফেলল।
মা তোমাকে কতবার বলেছি তুমি নিজে ঘেঁকে দেবে। এরকম করলে আমি দুধ খাব না।
শ্ৰীলা চেঁচাল, চুনী, দুধ ছাঁকিসনি? এত করে বলি যে…।
চুনীর খ্যানখেনে সরু গলা শোনা যাবে, ছাঁকলুম তো। কতবার ছাঁকব? আধ ঘন্টা আগে দুধ ঠিক করে রেখে এসেছি। আবার সর পড়লে কি করব? দুধ আর ছাঁকনি নিয়েই সারা দিন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় তা হলে… খরখরি বলেই যাবে, বলেই যাবে।
ও কিন্তু ঠিকই বলেছে পাপু, গরম দুধ আলগা থাকলে সর পড়বেই, যখন দেয়, তখন খেয়ে নিলেই পারিস।
ও যখন যা দেবে দয়া করে, ওর হাত থেকে সব নিয়ে নিয়ে খেতে হবে নাকি তক্ষুনি তক্ষুনি!
পাপু ভীষণ রেগে যায়, তুমি, তুমিই ওকে আশকারা দিয়ে দিয়ে এমনি করেছ।
প্রায় কেঁদে ফেলে মেয়ে, আমার একটা কথা থাকবে না। নিজের পছন্দমতো জিনিস কক্ষনো পাব না। খারাপ হলে বলতেও পাব না, যাও আমি খাবই না।
সাধাসাধি করেও মেয়েকে আর খাওয়াতে পারে না শ্রীলা। মহা জ্বালা হয়েছে তার। কোন দিকে যাবে? পাপুর নালিশও ঠিক, পাপুর দিক থেকে। আবার চুনীর সাফাইও কতকটা ঠিকই তো।
পাপু পিন্টু কেউই খাবার দিলে সঙ্গে সঙ্গে উঠে এসে খায় না। ডেকে ডেকে মুখ ব্যথা হয়ে যায়। কাজের একটা শৃঙ্খলা আছে তো?
সুরজিৎ ডাকল, পাঙ্কু, আঞ্জু উঠে পড়ো।
কাঁধটায় একটু ঝাঁকানি দিল মেয়ে। ওর গড়ন একটু দোহারা। সামান্য এদিক ওদিক হলেই মোটা হয়ে যাবার ধাত। বাবা আম্বু বলে ডাকলে খেপে যায়। খুব একটা সত্যি সত্যি নয় অবশ্য। সুরজিৎ নীচু হয়ে চুলের ঝুঁটি ধরল, উঠে পড়।
হঠাৎ একটা ঝটকা দিয়ে উঠে বসল পাপু।–না বাবা, ইয়ার্কি নয়। মা কী বলতে চায়! একটা কাজের মেয়ে আর আমি এক মায়ের কাছে? আমাকে মা যা দেবে ওকেও ঠিক তাই দেবে! পূজোর সময়ে ও আর আমি একরকম পরে ঠাকুর দেখতে যাব!
সুরজিৎ হেসে ফেলল, বলিস কী রে! একে দাদা তোর ভাগে ভাগ বসিয়ে রেখেছে। আবার আরেক শংকরা?
শ্রীলা বলল, তুমি চুপ কর তো। দাদা ভাগ বসিয়েছে আবার কী? ওকি একবারও বলেছে সে কথা? তুমি তো দেখছি আরও জটিলতা, হিংসেহিংসি সৃষ্টি করছ।
পাপু মুখ তুলে বলল, হ্যাঁ আমি বাচ্চা কি না, বাবা বলল আর অমনি দাদাকে হিংসে করতে শুরু করে দিলাম।
সুরজিৎ বলল, আরে আমিও তো তাই-ই বলতে যাচ্ছিলুম। হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করতে চললি, তুই কি একটা বাচ্চা? বেবি!
বেবি হলে এগুলো মনে হত না বাবা। মা লোকজন নিয়ে বড্ড বাড়াবাড়ি করে। মা-র সঙ্গে তো আর কিছু করবে না। তোমার সঙ্গেও না। মা মাথায় চাপাচ্ছে। আমাদের মাথায় উঠে নাচবে। তোমরা ফল ভোগও করবে না, বুঝবেও
শ্ৰীলার ভীষণ রাগ হয়ে যায়, সেই সঙ্গে হতাশা। কাজের লোক তো দূরস্থান। অন্য কেউই যে কখনও ছেলেমেয়ের সমান হতে পারে না, তা কী করে ওকে বোঝাবে! সে বলল, একটা, মাত্র একটা পোশাক তোমার মতো দিলেই, তোমার মনে হয়, ও আর তুমি আমার কাছে এক? চমৎকার!
তুমি অন্ধ মা, তুমি বুঝবে না। যেভাবে সবসময়ে ওর হয়ে ওকালতি করো। আমি হাল ছেড়ে দিচ্ছি। তোমাকে আমি বোঝাতে পারব না।
পিন্টু এসে ঢুকল। হাতে ঝুলছে ব্যাডমিন্টন র্যাকেট। বলল, এখনও তোমাদের সেই এক নীলজামা প্রসঙ্গ চলছে? আরে বাবা এটা বুঝছিস না কেন, তোর মতো জামা পরলেই কি চুনী তুই হয়ে যাবে? চুনী চুনীই থাকবে।
সুরজিৎ যেন হালে পানি পেল, বলল, রাইট। দুজনে এক রকম জামা পরে বেরোলেও, কখনও দুজনকে একরকম দেখাবে না রে পাপু।
পাপু গম্ভীর হয়ে বলল, ঠিক আছে।
সপ্তমীর দিনে চুনী সেজেগুঁজে নীল রঙের চুড়িদার পরে একগাল হেসে শ্রীলাকে প্রণাম করল, বলল, পাপু দিদি, তুমি এই জামাটা কবে পরবে?।
পিন্টু বলল, আরে এ চুনী, তু যে শাঁকচুন্নি বন গিয়া রে!
চুনী বেশ কথার পিঠে কথা শিখেছে বলল, আমার শাঁকচুন্নিই ভালো বাবা, কটা ভূত হয়ে কাজ নেই।
পাপু নীল পোশাকটা আর কোনোদিনই পরল না। অথচ খুব পছন্দ করে নিজে উদ্যোগী হয়ে কিনেছিল জিনিসটা।
জটিলতা এখানেই থেমে থাকল না। একদিন ওর বাতিল করে দেওয়া স্কার্ট ব্লাউজ পরে চুনী পেছন ফিরে কী করছিল ঘরে, সুরজিৎ তাকে পাপু বলে ডেকে ফ্যালে। সেই থেকে পাপু আরও গম্ভীর হয়ে গেছে। ইদানীং ওর পুরনো জামাকাপড়গুলোর শ্রীলা হদিস পাচ্ছে না। নিজের মেয়ের বয়সি কাজের মেয়ে থাকলে জামাকাপড়ের খাতে খরচটা কমে। লোক রাখবার সময়ে এ হিসেবটাও মনে মনে করে নিতে হয়। জামাকাপড়ের খরচ কি কম? দিনকে দিন বেড়েই যাচ্ছে, বেড়েই যাচ্ছে। একদিন পাপুর অনুপস্থিতিতে তার আলমারিটা ভালো করে খুঁজে দেখল, তাকের পেছনের দিকে পুরনো তোয়ালে মোড়া বাতিল জামাকাপড় গুছোনো রয়েছে। কাউকে দেবে? না নিজেই কিছু ভেবে রেখে দিয়েছে? মেয়েকে হালকা গলায় জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁরে তোর কালো স্কার্টটা তো আর পরিস না, কোথায় গেল রে?
পাপু উদাস গলায় বলল, কী জানি?
অথচ একটু আগেই শ্রীলা দেখেছে কালো স্কার্ট তোয়ালে-মোড়া সযত্নে রাখা রয়েছে। নিজেই রেখে দিয়েছে, অথচ অনায়াসে বলে দিল কী জানি! মেয়েকে কিছু বলতে আর সাহস পায় না শ্ৰীলা। আসল কথা ওগুলোও চুনীকে দিতে দেবে না। এইভাবে নীরবে ওগুলো সরিয়ে রেখে সে কথাই ও জানাতে চাইছে। এখন শ্ৰীলা কী করে?
