আর্যদা না? কেমন আছেন?
হাসি মুখে ভদ্রলোক বললেন, আরে চেনা-চেনা লাগছে খুব, প্লেস করতে পারছি না তো ঠিক…..।
আমি ওতুল! সদর বকশির ওতুলকৃষ্ণ গুইন।
ওতুল! ওতুলকৃষ্ণ? ওহো, সেই লাইব্রেরি করতে তেত্রিশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন না? বড়ো বড়ো চোখ করে সপ্রশংস দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকেন আর্যশরণ। আত্মগত বলতে থাকেন, টাকার অ্যামাউন্টটাই বড়ো কথা নয় ওতুলবাবু, দেবার ইচ্ছের মূল্যটা টাকার মূল্যের থেকে অনেক বেশি। আমি আজকের পথনাটকে এটাকেই আমার থিম করেছিলাম। গ্রামের লোকে বেশ নিল কিন্তু! ভারি এনজয় করল, দেখি আবার আমার ট্রপের ছেলেমেয়েগুলো কোথায় গেল… আসছি।
ওতুল দেখল, আর্যশরণ ঘোষ তাকে এবং তার সঙ্গে জড়িত সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিগত ঘটনাবলি বেমালুম ভুলে গেছেন!
করুণা তোমার
ঠাকুরমার ঝুলি-র ছোটোরানি আছাড় খাইয়া পড়িলেন-এর মতো দৃশ্যটা। পাপু মেঝের ওপর শুয়ে পড়েছে। উপুড় পিঠটা নিথর। কাঁধের তলায় পিঠের ওপর দুদিকে দুটো ত্রিভুজ। একটু একটু উঠছে নামছে। ছোটো চুল। বব-ছাঁট ছিল। একটু বড়ো হয়ে গেছে। তাই আগাগুলো মেঝেতে লুটোচ্ছে।
পাপুর বাবা ঘরে ঢুকেই অবাক।
একি? পাপুর কী হল? কোথাও কোনো জবাব নেই।
পাপুর বাবার পুনরুক্তি, বলি, হলটা কী?
পাপুর মা অর্থাৎ শ্ৰীলা উল বুনছিল। উলের থলি টেবিলের ওপর রেখে গম্ভীরভাবে বলল, তুমি কি চা পান করবে?
হতভম্ব সুরজিৎ অর্থাৎ শ্রীলার স্বামী ওরফে পাপুর বাবা বলল, চা তো আমি রোজই এ সময়ে পান করে থাকি। হঠাৎ প্রশ্ন? প্রশ্নের জবাব এড়াতেই প্রতি-প্রশ্ন নাকি?
বোঝ তো বেশ। বুদ্ধি ভালোই। আরেকটু বাড়লে যেটা বুঝেছ সেটা মুখে বলে বোকা-বুদ্ধির পরিচয় দিতে না।
বুদ্ধিও বুঝি। বোকাও বুঝি। বোকা বুদ্ধিটা কী?—সুরজিৎ তরল গলায় প্রশ্ন করছে। যদিও চোখ দুটো অনড় পিঠটার ওপর স্থির। মেয়ে সুরজিতের প্রাণ।
ঘরে ঢুকে পড়েছে পাপুর পিঠোপিঠি দাদা পিন্টু।
বাবা জানো, আসলে… পেছন থেকে তার মুখের ওপর হাত চাপা দিয়েছে শীলা।
চা খাওয়া শেষ। চা এর সঙ্গে টা। পিন্টু খেলতে বেরিয়ে গেল। রান্নাঘরে চায়ের বাসন ঠুনঠুন করে ধুচ্ছে বোধ হয় চুনী। শ্রীলা বলল, চুনী, যা ঘুরে আয়। বেশি দেরি করবি না। ঠিক এক ঘন্টার মধ্যে তোর আড্ডা শেষ হওয়া চাই।
কাচের চুড়ির আওয়াজ। চুনী বেরিয়ে যাচ্ছে। অন্য দিন মুখে খই ফোটে। আজকে দিদির মেজাজ খারাপ। অবহাওয়া থমথমে। চুনী তাই চুপচাপ বেরিয়ে গেল।
শ্ৰীলা বলল, মেয়েকে ভালো শিক্ষা দিচ্ছ না।
যা বাব্বা, আমি আবার কখন শিক্ষা দিলুম, ওসব তো তুমি আর তোমার কনভেন্টের মিসের এক্তিয়ার।
না, ইয়ার্কি নয়। পুজোর কেনাকাটা করতে গিয়ে সেদিন পাপুর স্কাই ব্লু রঙের চাইনিজ সিল্কের চুড়িদার সেটটা কিনেছিলুম মনে আছে? সাদা স্যাশের মতো আছে।
তোমরা যে কেনাকাটা করতে গিয়ে কী কেনো, কত কেনো আর কতরকম কেনো…
আচ্ছা, আচ্ছা হয়েছে। দয়া করে পুরোটা শোনো। চুনী সেটা দেখতে পেয়ে গেছে। ধরল ওকেও পুজোয় ঠিক ওই রকমই কিনে দিতে হবে। ওর খুব পছন্দ। ঠিক ওই রং, ওই ডিজাইন। এসব জিনিস তো ডুপ্লিকেট হয় না। দামও অনেক। আজকে ঠিক ওই জিনিসটাই দোকানো ঝুলছে দেখে কী মনে হল কিনে ফেললুম। মেয়েটা তো বরাবর পুরোনো, রং জ্বলা জিনিস নিয়েই তুষ্ট আছে। বড়ো মুখ করে বলল। তা সেই থেকেই তোমার কন্যে অমনি পেছন উলটে শুয়ে আছে।
কেন? সুরজিৎ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
কেন বুঝতে পারছ না তো! যাক, তোমার সম্পর্কে ভাবনা ছিল সেটা অন্তত ঘুচল। বুঝতে পারছ না? তোমার কন্যা চুনীর সঙ্গে একরকম জিনিস পরবে না।
ও হো হো। তা পালটে দিলেই তো হয়। চাইছে না যখন।
বাঃ চমত্তার। মেয়ের জেদ বজায় থাকবে! হৃদয়বৃত্তি কোনোদিন ডেভেলপ করবে না এমন করলে। দয়া করে একটু তলিয়ে বোঝবার চেষ্টা করো।
সুরজিৎ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, তা হলে একটু টাইম দাও। তলিয়ে বুঝি।
শ্ৰীলা রাগ করে সামনে থেকে উঠে গেল।
পাপুটার সঙ্গে চুনীটার যে কী রেষারেষি! অনেক লোক বদলে বদলে অবশেষে এই মেয়েটাকে পেয়েছে সে। বছর পনেরোর মেয়ে, পাপুর থেকে সামান্য ছোটোই। দেখতে তো ছোট্টখাট্ট। একটু খরখরি। কিন্তু বেশ কাজের। অন্ততপক্ষে কথা বললে শোনে। বেশ চটপটে। মুখে হাসি লেগেই আছে, কথাও আছে সাতকাহন। একটু বড়ো হয়ে গেলেই এরা যেমনি সেয়ানা হয়ে যায়, তেমনি হয় বদমাশ। চুনী এসে শ্রীলার মনে শান্তি এনেছে। যেমন যেমন শেখায়, তেমন তেমন করে মেয়েটা। নিমেষে বুঝে ফেলে। ঘষর ঘষর বাটনা বাটছে, খচখচ আনাজ কুটছে, ফটাফট জামাকাপড় কেচে ফেলছে। কিন্তু কী যে নজর মেয়েটার। পাপুর সঙ্গে সব কিছুতেই ওর পাল্লা দেওয়া চাই। ঠোঁটে রং, নেল পালিশ, জরিঅলা জুতো, চকচকে ঝলমলে জামা—এসব নিয়ে গোড়ায় গোড়ায় খুশি ছিল। এখন আর এ সব মনে ধরে না। পাপুর ফেলে দেওয়া প্লিটেড স্কার্ট, জাম্পার, দর্জি দিয়ে তৈরি করানো সালোয়ার কামিজ এই সব মোটামুটি পায় ও। এইগুলো পরে পরে ওর রুচি ঘুরে যেতে শুরু করেছে। ড্রেসিং-টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে পাপুর হেয়ার-ব্যান্ড মাথায় দিয়ে দেখছিল একদিন। পাপুর সেই থেকে ওর ওপর রাগ। শ্ৰীলা পরদিনই ওকে একটা হেয়ার-ব্যান্ড কিনে দিয়েছে। কিন্তু ও ঠিকই বুঝেছে দিদির জিনিসটার মহিমা আলাদা। মুখ গোঁজ করে থাকে। কথায় কথায় পাপুর সঙ্গে ওর লেগে যায়।
