বলো কী? এনকোয়ারি করলে না? পুলিশ? নোটিফাই করেছ?
মণি প্লিজ তুমি আমাকে একটু কম প্রশ্ন করো। আমার মাথার ঠিক নেই।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। কাটল কী করে?
ও কিছু না। অন্ধকারে টয়লেটে যেতে গিয়ে…
খেয়েছিলে?
সে তো একটু…
একটু নয়, খুব। ভোগো! …মণিমালা পেছন ফিরল,এক্কেবারে নতুন গাড়িটা! ইশশশ। ওখানে থানায় ডায়েরি করেছিলে!
সেটাই ভুল হয়ে গেছে। ঠোঁট কামড়াল সত্যেন, আমার মাথার ঠিক ছিল না, তখন শান্তিনিকেতনে কনফারেন্স মাথায়, গণদেবতা ধরে…। যাই হোক, এখানে ডায়েরি করে তবে বাড়ি…ওহ মণি, আমি—হা-ক্লান্ত-হঠাৎ হাত বাড়িয়ে মণিমালার কোমর জড়িয়ে মাথা রাখল। হু হু করে কাঁদতে লাগল।
এ কী! তুমি কাঁদছ? কাঁদছ কেন?
গাড়িটা নতুন…
বদারেশন, কিন্তু ইনশিয়োর করা জিনিস…অমন উতলা হবার কী আছে। তাই বলে তুমি কাঁদবে? অপার বিস্ময় মণিমালার গলায়।
চট করে নিজেকে সামলে নিল সত্যেন। ভারী গলায় বলল, একটু চা খাওয়াবে? ঋত কোথায়?
এই তো এসে পড়বে।
মণিমালা চলে গেল। সত্যেন টয়লেট গিয়ে মুখেচোখে জলের ঝাপটা দেয়। এটা তো মারাত্মক ভুল হয়ে গেছে। বর্ধমানে চুরি যাওয়া গাড়ির ডায়েরি বালিগঞ্জ থানায়? বর্ধমানে শনিবার রাতটা রেস্ট নিয়েছিল তারা। রবিবার সকালেই শান্তিনিকেতন স্টার্ট করে গেছে। শ্রীনিকেতনের রাস্তায় চমৎকার রিসর্ট। কলকাতা থেকে এত কাছাকাছি যাওয়াটা বিপজ্জনক। কিন্তু করবেই বা কী! অত অল্প ছুটি! তবে বুকিংটা দেখলে কারও সাধ্য নেই সন্দেহ করে! সত্যেন চ্যাটার্জি একা এসেছে, আলাদা রুম। সন্তোষ গিদওয়ানি আলাদা। পরে। আলাদা রুম। স্টেশনে পৌঁছেই গাড়ি থেকে নেমে রিকশ ভাড়া করে চলে গেছে সন্তোষ গিদওয়ানি। শান্তিনিকেতনেও তাই। নামটা আবার পালটে নিয়েছে।
চা খেতে না খেতেই কাঁধে ভারী স্কুলব্যাগ ঋতম এসে গেল? পাঁচটা বাজছে টিকটিক করে। শীতের ম্যাড়মেড়ে বিকেল, সন্ধেয় মেশবার আগে বা ক্রমশই আরও আরও মন খারাপ করা হয়ে যেতে থাকে। সে সেন্টিমেন্টাল ধাতের মানুষ নয়। শীত-বিকেলের এই প্রকৃতি সে লক্ষ করেনি বহু বহু দিন। এ সময়ে সে অফিসে থাকে কাজে ব্যস্ত, মিটিংয়ে, কনফারেন্সে এ হোটেল থেকে ও হোটেলে ভ্রাম্যমাণ। ছুটির দিনে বেশিরভাগই বেরিয়ে পড়ে, হু হু করে নীল ইন্ডিকা চালিয়ে, পাশে লিজ সন্তোষ গিদওয়ানি বা মণিমালা চ্যাটার্জি যে-ই থাক। পিছনে একটি দশ-এগারো বছরের দুধ-ধোওয়া-মুখ তার নিজস্ব রক্তের ঝলক থাক বা না থাক। এ কথাটা বলত মণিমালা। সকাল সকাল কচিৎ বাড়ি ফিরলে দেখত মণিমালা বারান্দায় বসা, আলুথালু, মুখে বিষাদের ভার। ঋত খেলতে বেরিয়ে গেছে। এ-ঘর ও-ঘর খুঁজতে খুঁজতে বারান্দা।
এ কী মণি! এখানে! আলো জ্বালোনি?
জ্বালালেই বা কী, না জ্বালালেই বা কী!
মানে?
দূর, এরকম সন্ধে হলে মনে হয় আলো আর জ্বলবে না।
ওহ তোমার সেই বেদনাবিলাস?
মণিমালার ভেতরের এই অন্ধকারকে ভালো চেনে না সত্যেন, যেমন চেনে না মণিমালাও সত্যেনেরটা। দু-জনের অন্ধকারের প্রকৃতি আলাদা।
বাবা, তুমি এসে গেছ? খুশির হাসিতে কলকলাচ্ছে ঋতম।
কেমন একটা অস্বস্তি হয় তার। জোর করে মুখে হাসি টেনে এনে বলে, কাজ হয়ে গেল, এসে গেলাম!
কী মজা!—মা খেতে দাও! …পিঠে ব্যাগ, মুখে হাসি, নাচতে নাচতে বেরিয়ে যাচ্ছে একমাত্র সন্তান কিন্তু তাকে যেন সে পুরোপুরি চিনতে পারছে না। তার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক স্থির করতে পারছে না। হাত বাড়িয়ে অনিশ্চিত ডাকছে, বালক, তুমি আমার কে? তুমি কোথায়? আমি তোমার কে? ঋতম আমি…আমি কোথায়?
সন্ধে সাতটা। ঋতম পড়ছে নিজের ঘরে। মণিমালা বারান্দায়, সত্যেন বারান্দায়, মুখে অনভ্যস্ত সিগারেট। বাড়িতে ধূমপান করে না সে। স্ত্রী-পুত্রের প্যাসিভ স্মোকিং এর কারণ হবে না, খুব সচেতন। মণিমালার চোখে প্রশ্ন। সত্যেন পড়তে পেরেছে। বারান্দায় তো! উড়ে যাবে। ভীষণ অস্থির-অস্থির লাগছে।
তাই তো দেখছি, বর্ধমানে ডায়েরির কী হবে?
আরে বাবা ওসব আমাদের লোকাল থানাই করে দেবে। জাস্ট একটা ফোন।
প্রসেসটা কি তাই? তোমার মনে নেই মেজদাদুর অ্যাকসিডেন্ট হল ল্যান্সডাউনে। ডায়েরি করানো হল ভবানীপুরে। তার পরে বলল, অ্যাকসিডেন্ট কেস সব লালবাজার।
অ্যাকসিডেন্ট কেস! অ্যা ক সি ডেন্ট…
সে বলল, কাল ফার্স্ট থিং খোঁজ করব। আজকের দিনটা, জাস্ট আজকের দিনটা আমাকে রেহাই দাও।
অন্ধকারেও মণিমালার মুখের বিস্ময়, আহত অভিব্যক্তি বোঝা যায়। চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে থাকা।
স্যরি মণি, প্লিজ।
ঠিক আছে। কিন্তু গাড়ি ছাড়াও…তোমার আরও কিছু প্রবলেম আছে মনে হচ্ছে। অফিসে কিছু গণ্ডগোল…? এত অস্থির?
ইয়েস। ঠিকই, কিন্তু এগুলো তো ডিসকাস করে কোনো লাভ নেই! লেট মি থিংক!
সাড়ে আটটা, মা!–ঋত ডাকছে।
মণিমালা উঠে গেল। এতক্ষণ চুপচাপ বসেছিল। আর অভিমান প্রকাশ করেনি। স্বামীর ভাবনায় সে যথেষ্ট ভাবিত। কিন্তু এসব বিষয়ে সে যদি ভাবনা-চিন্তা করবার সময় চায়। একা একা, তো ভাবুক। তাতে অবশ্য মণির ভাবনা কমে না। কেননা সে যে কর্পোরেট জগতের কিছুই বোঝে না এটা ঠিক নয়। তেরো-চোদ্দো বছর বিয়ে হয়ে গেছে, ঘনিষ্ঠ বসবাস। আপনা-আপনিই অনেক কিছু চুইয়ে চুইয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে।
